বাংলাদেশে বর্তমানে স্বাস্থ্যসেবা নিতে গিয়ে মানুষ কেবল রোগশোকের সঙ্গেই লড়ছে না, বরং চিকিৎসার আকাশচুম্বী ব্যয়ের ভারে রীতিমতো পিষ্ট হচ্ছে। একটি সুস্থ জীবনের প্রত্যাশায় হাসপাতালে গিয়ে দেশের প্রায় অর্ধেক মানুষ এখন চরম আর্থিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, চিকিৎসা খরচ জোগাতে গিয়ে দেশের ৪৪ শতাংশ পরিবার গভীর আর্থিক সংকটে পড়ছে, এমনকি অনেকে বাধ্য হয়ে নামছে দারিদ্র্যসীমার নিচে।
এমন এক কঠিন বাস্তবতার মধ্যেই আজ শুক্রবার, ১২ ডিসেম্বর বিশ্বব্যাপী পালিত হচ্ছে ‘সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা দিবস’। এবারের দিবসের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে—‘অসাধ্য স্বাস্থ্য ব্যয়ে ক্লান্ত রোগীরা’, যা বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষার (ইউনিভার্সাল হেলথ কাভারেজ-ইউএইচসি) মূল লক্ষ্য হলো কোনো নাগরিক যেন অর্থের অভাবে চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত না হয়। কিন্তু পরিসংখ্যান বলছে ভিন্ন কথা। স্বাস্থ্য অর্থায়ন কৌশলপত্রে ২০৩২ সালের মধ্যে চিকিৎসার নিজস্ব ব্যয় বা ‘আউট অব পকেট এক্সপেন্ডিচার’ ৩২ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য ছিল। অথচ বাস্তবে তা কমেনি, বরং জ্যামিতিক হারে বেড়েছে। ২০১২ সালে রোগীরা পকেট থেকে ব্যয় করত ৬৪ শতাংশ, যা ২০২২ সালে বেড়ে ৬৯ শতাংশে পৌঁছায়। বর্তমানে এই ব্যয় ৭০ শতাংশও ছাড়িয়ে গেছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ এ বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি জানান, স্বাস্থ্য খরচ মেটাতে গিয়ে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর একটি বিশাল অংশ অর্থাভাবে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নেওয়া থেকেই বিরত থাকছে। যারা চিকিৎসা নিচ্ছেন, তাদের অনেকে সঞ্চয় ভেঙে, ধারদেনা করে কিংবা শেষ সম্বল বিক্রি করে ব্যয় মেটাচ্ছেন। ফলে তারা এক দীর্ঘমেয়াদী আর্থিক বিপর্যয়ের চক্রে আটকা পড়ছেন।
পরিসংখ্যানের পাতায় সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা সূচকে বাংলাদেশের অগ্রগতি অত্যন্ত ধীরগতির। ২০১৫ সালে যেখানে বাংলাদেশের স্কোর ছিল ১০০-তে ৪৫, ২০২১ সালে তা সামান্য বেড়ে ৫২ হয় এবং ২০২৫ সালে এসে দাঁড়িয়েছে ৫৪-তে। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অনুযায়ী ২০৩০ সালের মধ্যে এই স্কোর ৭৪-এ উন্নীত করার কথা থাকলেও বর্তমান গতিতে তা প্রায় অসম্ভব।
এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আবদুল হামিদ বেশ হতাশা প্রকাশ করেছেন। তিনি মন্তব্য করেন যে, বর্তমান পরিস্থিতিতে ইউনিভার্সাল হেলথ কাভারেজ অর্জন বাংলাদেশের জন্য ‘মঙ্গল গ্রহে’ যাওয়ার মতোই কঠিন কাজ। তাঁর মতে, এই লক্ষ্য অর্জনে না আছে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি, না আছে কোনো শক্তিশালী আইন বা নীতি, আর না আছে পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ।
অন্যদিকে, দরিদ্র মানুষের সুরক্ষায় দীর্ঘদিনের অবহেলার কথা তুলে ধরেন স্বাস্থ্য সংস্কার কমিশনের সদস্য ও আইসিডিডিআর,বি-র বিজ্ঞানী আহমেদ এহসানুর রাহমান। তিনি বলেন, চিকিৎসা করতে গিয়ে মূলত দরিদ্র জনগোষ্ঠীই সবচেয়ে বেশি আর্থিক সংকটে পড়ে। অথচ গত ৮-১০ বছরে এই দরিদ্র মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য সরকারের কোনো কার্যকর প্রোগ্রাম বা আলাদা কোনো তহবিল ছিল না।
রোগ ও মৃত্যুর পরিসংখ্যানেও উঠে এসেছে উদ্বেগজনক চিত্র। গ্লোবাল বারডেন অব ডিজিজ-২-এর তথ্যমতে, দেশে সবচেয়ে বেশি ৩৬ শতাংশ মানুষের মৃত্যু হয় হৃদরোগে। এরপর ফুসফুসের সংক্রমণ ও যক্ষ্মায় ১৯ শতাংশ, দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসতন্ত্রের রোগে ৯ শতাংশ এবং ক্যানসার বা টিউমারজনিত সমস্যায় ৮ শতাংশ মানুষ মারা যায়। এই মরণঘাতী রোগগুলোর চিকিৎসা অত্যন্ত ব্যয়বহুল, যা সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে।
সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবার মূলমন্ত্রই হলো আর্থিক বোঝা ছাড়া সবার জন্য মানসম্মত সেবা নিশ্চিত করা। কিন্তু অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ, অধ্যাপক ড. সৈয়দ আবদুল হামিদ এবং বিজ্ঞানী আহমেদ এহসানুর রাহমানের মতো বিশেষজ্ঞদের মতামত ও বর্তমান পরিসংখ্যান স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে, সেই লক্ষ্য অর্জনে বাংলাদেশকে এখনো অনেকটা পথ পাড়ি দিতে হবে।