ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক ও ঢাকা-৮ আসনের সম্ভাব্য প্রার্থী শরীফ ওসমান হাদির ওপর হামলার ঘটনাটি ছিল অত্যন্ত সুপরিকল্পিত। রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা তৈরির উদ্দেশ্যেই কয়েক মাস ধরে ছক কষে গত শুক্রবার (১৩ ডিসেম্বর) এই হামলা চালানো হয়। হামলার মাত্র ১২ ঘণ্টার মধ্যেই মূল ‘শুটার’ ও চালক ময়মনসিংহের সীমান্ত দিয়ে ভারতে পালিয়ে গেছেন বলে ধারণা করছে পুলিশ।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, এ ঘটনায় জড়িত হিসেবে এখন পর্যন্ত তিনজনকে শনাক্ত করা হয়েছে। তারা হলেন—মোটরসাইকেলের পেছনে বসে গুলি চালানো ছাত্রলীগের নেতা ফয়সল করিম মাসুদ ওরফে রাহুল, চালক আলমগীর শেখ এবং তাদের সহযোগী স্বেচ্ছাসেবক লীগ কর্মী রুবেল।
১২ ঘণ্টার মধ্যে সীমান্ত পাড়ি
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ধারণা করছে, ঘটনার দিন রাত দেড়টা থেকে দুইটার মধ্যে মূল শুটার ফয়সল ও চালক আলমগীর ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট সীমান্ত দিয়ে ভারতে পালিয়ে যান। তাদের পালাতে সহায়তা করার অভিযোগে সঞ্জয় চিসিম ও সিবিরন দিও নামের দুই মানব পাচারকারীকে আটক করা হয়েছে।
শনিবার রাতে ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট ও ধোবাউড়া সীমান্ত এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাদের আটক করে ঢাকায় আনা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে সঞ্জয় চিসিম স্বীকার করেছেন যে, শুক্রবার দিবাগত রাতে তিনি দুজন বাংলাদেশি নাগরিককে ভারতে পাচারে সহায়তা করেছেন।
ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার এস এন নজরুল ইসলাম জানান, আটক দুই ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে পলাতক ফয়সল ও আলমগীরের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে।
কে এই ফয়সল ও আলমগীর?
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, শুটার ফয়সল করিম মাসুদ ওরফে রাহুল নিষিদ্ধঘোষিত সংগঠন ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ও ঢাকা মহানগর উত্তরের সহ-সভাপতি ছিলেন। ৫ আগস্টের পর তিনি নিজেকে ‘দাউদ খান’ নামে পরিচয় দিতেন। সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের ছেলে সাফি মুদ্দাসির খান জ্যোতির সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা ছিল। এছাড়া আওয়ামী লীগ নেতা জাহাঙ্গীর কবির নানকের এপিএস বিপ্লব এবং শীর্ষ সন্ত্রাসী জোসেফের ভাতিজা আসিফ আহমেদের সঙ্গেও তার সখ্য ছিল।
অন্যদিকে, মোটরসাইকেল চালক আলমগীর শেখ আদাবর থানা যুবলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। হামলার আগে হাদিকে অনুসরণ বা ‘রেকি’ করার সময় তাদের সঙ্গে থাকা রুবেল স্বেচ্ছাসেবক লীগের কর্মী। হাদির গণসংযোগে এই তিনজনের একসঙ্গে থাকার ছবিও ইতিমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।
পরিকল্পনা ও মোটিভ
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরদিন হাদিকে হত্যার মধ্য দিয়ে দেশে বড় ধরনের অস্থিতিশীলতা তৈরি করাই ছিল হামলাকারীদের মূল লক্ষ্য। হামলার দিন রাতে রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে বাসে আগুন ও ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনার সঙ্গে এর যোগসূত্র থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
স্ত্রী-শ্যালকসহ আটক ৩
হামলার আগে ও পরে ফয়সল করিম তার স্ত্রী, শ্যালক ও বান্ধবীর সঙ্গে একাধিকবার মুঠোফোনে কথা বলেছেন বলে প্রমাণ পেয়েছে র্যাব। এর জেরে রবিবার (১৫ ডিসেম্বর) সন্ধ্যার পর র্যাব তাদের আটক করে পল্টন থানায় সোপর্দ করেছে। র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক উইং কমান্ডার এম জেড এম ইন্তেখাব চৌধুরী বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
এদিকে হামলায় ব্যবহৃত মোটরসাইকেলের মালিক মো. আব্দুল হান্নানকে গ্রেপ্তার করে তিন দিনের রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ। যদিও হান্নান দাবি করেছেন, এক বছর আগেই তিনি মোটরসাইকেলটি বিক্রি করে দিয়েছিলেন।