সোমবার, ১৯ জানুয়ারি ২০২৬

সর্বশেষ

পোশাক খাত: ২২ মাসে বন্ধ ২২৬ কারখানা, বেকার দুই লাখের বেশি

নিজস্ব প্রতিবেদক

বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি তৈরি পোশাক শিল্প এক নজিরবিহীন অস্তিত্ব সংকটের মুখে পড়েছে। গ্যাসের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি, ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদহার এবং খেলাপি ঋণের সংজ্ঞা পরিবর্তনের জেরে গত ২২ মাসে দেশে ২২৬টি পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। এতে কর্মসংস্থান হারিয়েছেন দুই লাখেরও বেশি শ্রমিক।

পোশাক মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ এবং বিকেএমইএ-র তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ছোট ও মাঝারি কারখানার পাশাপাশি বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলোও এই ধাক্কা সামাল দিতে পারছে না। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিগত সরকারের আমলে নেওয়া কিছু দীর্ঘমেয়াদি নীতি এবং বর্তমান সময়ের অর্থনৈতিক সংস্কারের চাপে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

বন্ধের তালিকায় রেকর্ড

বস্ত্র ও পোশাক খাতের সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের ১০ নভেম্বর পর্যন্ত—অর্থাৎ মাত্র ২২ মাস ১০ দিনে ২২৬টি কারখানা তাদের উৎপাদন বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে। এর মধ্যে শুধু ২০২৫ সালেই (১০ নভেম্বর পর্যন্ত) বন্ধ হয়েছে ১৪৯টি কারখানা, যা একটি বছরে কারখানা বন্ধের হিসেবে সর্বোচ্চ।

এই বিপুল সংখ্যক কারখানা বন্ধ হওয়ার ফলে সরাসরি বেকার হয়েছেন ২ লাখ ২ হাজার ৭৯৫ জন শ্রমিক। এর আগে ২০২৪ সালে বন্ধ হওয়া ৭৭টি কারখানায় কর্মরত ছিলেন প্রায় ৫২ হাজার শ্রমিক।

কেন এই বিপর্যয়?

খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই সংকটের শুরু হয়েছিল ২০২৩ সালে, তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে। সে সময় শিল্পে ব্যবহৃত গ্যাসের দাম এক লাফে প্রায় ১৫০ শতাংশ বাড়ানো হয়।

ব্যবসায়ীরা জানান, ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে গ্যাসের দাম প্রতি ঘনমিটারে ১৬ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩০ টাকার ওপরে নিয়ে যাওয়া হয়। বর্তমানে নতুন শিল্প সংযোগের ক্ষেত্রে এই মূল্য ৪০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।

বিজিএমইএ-র সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, “গ্যাসের এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কা অনেক কারখানাই সামলে উঠতে পারেনি। এর সাথে যুক্ত হয়েছে ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদহার। আগে যেখানে ৯ শতাংশ সুদে ঋণ পাওয়া যেত, এখন তা বেড়ে ১৬-১৭ শতাংশে ঠেকেছে। এত চড়া সুদে ঋণ নিয়ে ব্যবসা টিকিয়ে রাখা অসম্ভব হয়ে পড়েছে।”

ব্যাংকিং নীতিমালার পরিবর্তন ও খেলাপি হওয়ার ভয়

কারখানা বন্ধের পেছনে আরেকটি বড় কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে খেলাপি ঋণের সংজ্ঞা পরিবর্তনকে। আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থাগুলোর পরামর্শ এবং ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফেরানোর অংশ হিসেবে ঋণ খেলাপি ঘোষণার সময়সীমা ছয় মাস থেকে কমিয়ে তিন মাস (৯০ দিন) করা হয়েছে।

ব্যবসায়ী নেতাদের অভিযোগ, হঠাৎ করে এই নিয়ম কার্যকর হওয়ায় অনেক সচল ব্যবসায়ী রাতারাতি খেলাপি হয়ে পড়েছেন। ফলে তারা নতুন করে ঋণপত্র (এলসি) খোলা বা ব্যবসা পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থায়ন পাচ্ছেন না।

বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, “নীতি সুদহার কমানো না হলে এবং জ্বালানির চড়া মূল্যের বিকল্প কোনো সুরাহা না হলে বিনিয়োগ বাড়বে না। ১৫-১৬ শতাংশ সুদে ঋণ নিয়ে ব্যবসা চালানো অসম্ভব। দুর্বল ব্যাংকগুলো আরও বেশি সুদ নিচ্ছে। ফলে অনেকেই বাধ্য হয়ে ব্যবসা গুটিয়ে নিচ্ছেন বা দেশ ছেড়ে যাচ্ছেন।”

রাজনৈতিক অস্থিরতা ও শ্রমিক অসন্তোষ

গ্যাস ও ব্যাংকিং সংকটের পাশাপাশি রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং শ্রমিক অসন্তোষও এই খাতে বড় প্রভাব ফেলেছে। গত ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বেশ কিছু কারখানায় শ্রমিকদের বিভিন্ন দাবিতে অস্থিরতা দেখা দেয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ‘অযৌক্তিক’ দাবির মুখেও কারখানা বন্ধ ঘোষণা করতে বাধ্য হন মালিকরা।

এছাড়া বিগত সরকারের আমলে সুবিধাভোগী কিছু ব্যবসায়ী নেতা রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আত্মগোপনে চলে গেছেন অথবা দেশ ছেড়েছেন, যার ফলে তাদের মালিকানাধীন কারখানাগুলোও বন্ধ হয়ে গেছে।

বন্ধ হওয়া উল্লেখযোগ্য কিছু কারখানা

গত দুই বছরে বন্ধ হওয়া কারখানাগুলোর তালিকায় রয়েছে বেশ কিছু পরিচিত নাম। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—জেনারেশন নেক্সট ফ্যাশনস, বার্ডস গ্রুপ (বার্ডস গার্মেন্টস, বার্ডস এ অ্যান্ড জেড, বার্ডস ফ্যাড্রেক্স), ক্রনি গ্রুপ (ক্রনি অ্যাপারেলস, ক্রনি টেক্স), টিআরজেড গার্মেন্টস, নিয়াগারা টেক্সটাইল, ডিজনি সুয়েটার এবং নাসা গ্রুপের একাধিক প্রতিষ্ঠান।

এছাড়া ঢাকা, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জ এলাকার অসংখ্য ছোট ও মাঝারি মানের কারখানাও এই তালিকায় রয়েছে। যেমন—প্রিন্স গার্মেন্টস, অ্যাপারেল ইন্ডাস্ট্রি, জ্যামস ফ্যাশন, হংকং ফ্যাশনস, এবং বেক্সিমকো ও যমুনা গ্রুপের কিছু অঙ্গপ্রতিষ্ঠান।

বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন, এখনই যদি ঋণের সুদহার এবং জ্বালানি মূল্যের বিষয়ে বাস্তবসম্মত নীতি গ্রহণ না করা হয়, তবে সামনে এই সংকট আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে, যা দেশের সামগ্রিক রপ্তানি আয়ে বড় ধস নামাতে পারে।

পাঠকপ্রিয়