সোমবার, ১৯ জানুয়ারি ২০২৬

সর্বশেষ

তফসিল ঘোষণার পরও প্রস্তুতি নিয়ে হিমশিম খাচ্ছে ইসি, জটিলতার শঙ্কা

নিজস্ব প্রতিবেদক

জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার ছয় দিন পার হয়ে গেলেও নির্বাচন কমিশনের (ইসি) প্রস্তুতি নিয়ে এখনো ধোঁয়াশা কাটছে না। রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন প্রক্রিয়া, আসনভিত্তিক ভোটার তালিকা এবং নির্বাচন পরিচালনার ম্যানুয়েল বা নির্দেশিকা—সব ক্ষেত্রেই প্রস্তুতির ঘাটতি দৃশ্যমান।

নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা নভেম্বরের শেষ সপ্তাহ থেকে সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হওয়ার দাবি করে এলেও বাস্তবতা ভিন্ন। তফসিল ঘোষণার পরপরই প্রার্থীর যোগ্যতা-অযোগ্যতা বিষয়ক পরিপত্র জারি করে আবার তা সংশোধন করতে হয়েছে। একই সঙ্গে গণভোট আয়োজনের বিধিমালা নিয়েও ইসিকে তাদের প্রাথমিক অবস্থান পরিবর্তন করতে দেখা গেছে।

বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করছেন, ইসির এই ‘অগোছালো’ অবস্থার নেতিবাচক প্রভাব মাঠ পর্যায়ের নির্বাচন ব্যবস্থাপনায় পড়তে পারে। বিশেষ করে একই দিনে সংসদ নির্বাচন ও গণভোট আয়োজনের কারণে ভোট গ্রহণ ও গণনায় বড় ধরনের জটিলতা তৈরির সম্ভাবনা দেখছেন তারা।

অগোছালো প্রস্তুতি ও বিভ্রান্তি

নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তফসিল ঘোষণার পর থেকেই আগ্রহী প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র সংগ্রহের সুযোগ থাকে এবং এর সঙ্গে আসনভিত্তিক ভোটার তালিকার সিডি সরবরাহ করা হয়। কিন্তু ১১ই ডিসেম্বর সন্ধ্যায় প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিলেও রিটার্নিং কর্মকর্তাদের দপ্তর নির্দিষ্ট করে পরিপত্র জারি করতে রাত হয়ে যায়।

নির্বাচন পরিচালনার জন্য অপরিহার্য ‘নির্বাচনী ম্যানুয়েল’ বা নির্দেশিকা এখনো ছাপা হয়নি। প্রশাসন, প্রার্থী, পর্যবেক্ষক ও সাংবাদিকদের জন্য এই দলিলটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

নির্বাচন কমিশনার আবদুর রহমানেল মাছউদ অবশ্য দাবি করেছেন, ভোটার তালিকার সিডি প্রস্তুতের কাজ শেষ পর্যায়ে এবং ম্যানুয়েলও দ্রুত ছাপা হবে। পরিপত্রে ভুলের বিষয়ে তিনি বলেন, “দ্রুতই তা সংশোধন করে নতুন পরিপত্র জারি করা হয়েছে।”

‘জোড়া ভোটের’ চ্যালেঞ্জ ও গণনা নিয়ে সংশয়

বাংলাদেশে এর আগে তিনটি গণভোট হলেও জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন একই সঙ্গে গণভোট আয়োজনের নজির নেই। আগামী ১২ই ফেব্রুয়ারি একই দিনে প্রায় ১৩ কোটি ভোটারের ভোটগ্রহণ এবং তার সঙ্গে গণভোট আয়োজন ইসির সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।

ইসি সূত্রে জানা গেছে, সংসদ নির্বাচনের দিন একজন ভোটারকে এমপি নির্বাচনের পাশাপাশি গণভোটের জন্য ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোট দিতে হবে। মক ভোটিং বা পরীক্ষামূলক ভোটে দেখা গেছে, একজন ভোটারের এই প্রক্রিয়া শেষ করতে চার থেকে পাঁচ মিনিট সময় লাগছে। এতে কেন্দ্রে দীর্ঘ লাইন এবং ভোট গণনায় বিলম্বের আশঙ্কা করা হচ্ছে।

ইসি সচিবালয়ের সাবেক কর্মকর্তা ও নির্বাচন বিশ্লেষক জেসমিন টুলি বলেন, “সংসদ নির্বাচন ও গণভোট একসঙ্গে করার অভিজ্ঞতা এই কমিশনের নেই। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে একাধিক ব্যালট ব্যবহারের অভিজ্ঞতা থাকলেও সংসদ নির্বাচনের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। এখানে প্রার্থী ও সমর্থকদের মধ্যে চরম উত্তেজনা থাকে, যা নিয়ন্ত্রণ করা রিটার্নিং কর্মকর্তাদের জন্য চ্যালেঞ্জিং হবে।”

তিনি আরও বলেন, ভোট শেষে দুই ধরণের ব্যালট আলাদা করে গণনা করতে দীর্ঘ সময় লাগবে, যা কেন্দ্রে বিশৃঙ্খলা তৈরি করতে পারে।

তবে নির্বাচন কমিশনার আবদুর রহমানেল মাছউদ বলেন, “বাস্তবতা সবাইকে মানতে হবে। কমিশন সিদ্ধান্ত নিয়েছে সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের গণনা একই সঙ্গে হবে। একটি আগে এবং অন্যটি পরে গোনার সুযোগ নেই।”

আইনি লড়াইয়ে ইসির হার ও সীমানা জটিলতা

নির্বাচনী প্রস্তুতির মধ্যেই সীমানা পুনর্নির্ধারণ নিয়ে আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে ইসি। বিদায়ী কমিশনের সীমানা পরিবর্তন করে বর্তমান কমিশন ৩৯টি আসনে পরিবর্তন এনেছিল। কিন্তু তফসিল ঘোষণার ঠিক আগের দিন বাগেরহাট ও গাজীপুরের সীমানা পরিবর্তন সংক্রান্ত ইসির সিদ্ধান্ত আদালত অবৈধ ঘোষণা করে।

পরবর্তীতে ফরিদপুর-৪ আসনের সীমানা নিয়েও আদালতের রায় ইসির বিপক্ষে গেছে। এছাড়া কুমিল্লা, পঞ্চগড়, রংপুর ও বরগুনার সীমানা নিয়ে আরও চারটি মামলা উচ্চ আদালতে শুনানির অপেক্ষায় আছে।

ইসি সচিব আখতার আহমেদ স্বীকার করেছেন যে, সংসদীয় আসনের সীমানা নিয়ে আদালতের রায় ইসিকে কিছুটা ‘প্রশ্নবিদ্ধ’ করে।

নিবন্ধন নিয়ে ‘সহজাত ক্ষমতা’র বিতর্ক

নতুন রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন চূড়ান্তভাবে নামঞ্জুর করার পরও সাতটি দলের আবেদন পুনর্বিবেচনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইসি। ‘আমজনতার দল’-এর অনশনের পর এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ইসি সচিব দাবি করেছেন, কমিশন তাদের ‘সহজাত ক্ষমতা’ ব্যবহার করছে।

তবে আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের (আরপিও) বাইরে গিয়ে ইসির এমন ক্ষমতা প্রয়োগের সুযোগ নেই।

এ বিষয়ে নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রধান ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, “নির্বাচনী প্রস্তুতিতে বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। ম্যানুয়েল ছাপা হয়নি, ভোটার তালিকা প্রস্তুত নয়—এসবের প্রভাব মাঠ প্রশাসনে পড়লে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।”

তিনি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ইসির ভূমিকার সমালোচনা করে বলেন, তফসিলের আগেও প্রাণহানির ঘটনায় ইসি নির্বিকার থেকেছে, যা দুঃখজনক।

এদিকে সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে গণভোটের জন্য ইসির খরচ ২০ শতাংশ বাড়ানোর কথা থাকলেও অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ জানিয়েছেন, অর্থ মন্ত্রণালয়ে এখনো এ সংক্রান্ত কোনো চাহিদাপত্র আসেনি।

পাঠকপ্রিয়