সোমবার, ১৯ জানুয়ারি ২০২৬

সর্বশেষ

মহাসাগরের গভীরে নতুন স্নায়ুযুদ্ধ

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রশান্ত মহাসাগরের অতল জলরাশি আপাতদৃষ্টিতে শান্ত মনে হলেও, এর গভীরে এখন চলছে এক তীব্র ও নীরব প্রতিযোগিতা। এশিয়ার নিরাপত্তা মানচিত্রে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তনের সূচনা হয়েছে, যার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে দক্ষিণ কোরিয়া এবং তাদের দীর্ঘদিনের লালিত পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিন অর্জনের উচ্চাকাক্সক্ষা। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের মিত্র দেশগুলোকে পারমাণবিক প্রযুক্তির সাবমেরিন সরবরাহে অনীহা দেখিয়ে আসছিল এবং পরমাণু বিস্তার রোধের দোহাই দিয়ে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করে রেখেছিল।

কিন্তু ২০২৫ সালের শেষে এসে সেই দৃশ্যপটে আমূল পরিবর্তন ঘটেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরাসরি সমর্থন ও অনুমোদনের পর দক্ষিণ কোরিয়ার এই অভিজাত ক্লাবে প্রবেশের পথ এখন সুগম হয়েছে। সিউলের এই উদ্যোগ কেবল একটি সামরিক সক্ষমতা অর্জন নয়; এটি কোরীয় উপদ্বীপ, জাপান সাগর এবং সামগ্রিকভাবে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের ভূ-রাজনীতির সমীকরণকে নতুন করে লিখছে।

দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে মিয়ং এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যকার সাম্প্রতিক বৈঠকটি ইতিহাসের পাতায় একটি বাঁকবদল হিসেবে চিহ্নিত হতে যাচ্ছে। দুই দেশের মধ্যে থাকা দীর্ঘদিনের পারমাণবিক চুক্তির আওতায় জ্বালানি ব্যবহারের অনুমতি প্রদানের মাধ্যমে ট্রাম্প প্রশাসন কার্যত এশিয়ায় এক নতুন অস্ত্র প্রতিযোগিতার দুয়ার খুলে দিয়েছে। এই পদক্ষেপের ফলে পানির নিচে শক্তির ভারসাম্য বজায় রাখার চিরাচরিত কৌশলগুলো আর কার্যকর থাকছে না।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এটি কেবল উত্তর কোরিয়াকে মোকাবিলা করার কৌশল নয়, বরং এর সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য চীনকে ঘিরে আবর্তিত হচ্ছে। দক্ষিণ কোরিয়ার নৌবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত সাবমেরিন ক্যাপ্টেন চই ইল যথার্থই বলেছেন যে সাবমেরিন অত্যন্ত কার্যকর আক্রমণাত্মক ব্যবস্থা এবং এই অঞ্চলে অস্ত্র প্রতিযোগিতা এখন অনিবার্য হয়ে পড়েছে।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: তিন দশকের দীর্ঘ প্রতীক্ষা ও কূটনৈতিক লড়াই

দক্ষিণ কোরিয়ার জন্য পারমাণবিক সাবমেরিন কোনো হুট করে নেওয়া সিদ্ধান্ত নয়, বরং এটি তাদের দীর্ঘদিনের জাতীয় আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন। সেজং ইনস্টিটিউটের তথ্যমতে, এই স্বপ্নের বীজ রোপিত হয়েছিল আজ থেকে প্রায় তিন দশক আগে। ১৯৯৪ সালে যখন উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে প্রথম বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়, তখনই সিউলের নীতিনির্ধারকরা এই প্রযুক্তির প্রয়োজনীয়তা তীব্রভাবে অনুভব করতে শুরু করেন। কিন্তু তৎকালীন সময়ে কারিগরি সীমাবদ্ধতা, অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ এবং সবচেয়ে বড় বাধা হিসেবে আন্তর্জাতিক চাপের মুখে সেই উদ্যোগ আলোর মুখ দেখেনি। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর পারমাণবিক বিস্তার রোধ নীতি এ ক্ষেত্রে বড় দেওয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

পরবর্তীতে ২০১৭ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট মুন জে-ইন এই উদ্যোগকে পুনরায় চাঙ্গা করার জোরালো চেষ্টা করেন। তিনি ব্যক্তিগতভাবে তৎকালীন ট্রাম্প প্রশাসনের কাছে সমর্থনের আবেদন জানিয়েছিলেন এবং যুক্তি দেখিয়েছিলেন যে উত্তর কোরিয়ার হুমকি মোকাবিলায় এটি অপরিহার্য। বিষয়টির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, ডোনাল্ড ট্রাম্প ব্যক্তিগতভাবে সে সময়ও ইতিবাচক ছিলেন, কিন্তু মার্কিন প্রতিরক্ষা ও জ্বালানি বিভাগের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং পারমাণবিক বিস্তার রোধে তাদের কঠোর প্রাতিষ্ঠানিক নীতির কারণে সেই সমর্থন বাস্তবে রূপ নেয়নি। মুন সরকারের সময় দায়িত্ব পালন করা সাবেক উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী চোই জং-কুন স্মরণ করেন যে, পেন্টাগন এবং মার্কিন জ্বালানি বিভাগ সে সময় পারমাণবিক প্রযুক্তির বিস্তার নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল এবং দক্ষিণ কোরিয়াকে এই প্রযুক্তি দেওয়ার ঘোর বিরোধী ছিল।

তবে সময়ের পরিক্রমায় ভূ-রাজনীতির সমীকরণ বদলেছে। ২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের সহায়তায় অস্ট্রেলিয়াকে পারমাণবিক সাবমেরিন দেওয়ার যে ‘অকাস’ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, তা দক্ষিণ কোরিয়ার জন্য একটি বড় নজির বা ‘প্রিসিডেন্ট’ স্থাপন করে। এটি প্রমাণ করে যে কৌশলগত প্রয়োজনে যুক্তরাষ্ট্র তার মিত্রদের এই প্রযুক্তি দিতে প্রস্তুত। সাবেক উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী চোই জং-কুন মনে করেন, অস্ট্রেলিয়ার এই চুক্তি সিউলের জন্য একটি মনস্তাত্ত্বিক ও কূটনৈতিক বাধা অপসারণে সহায়তা করেছে। তিনি রূপক অর্থে বলেন, ট্রেন ইতিমধ্যে চলতে শুরু করেছে এবং দরজা খোলা রয়েছে; অর্থাৎ আরও কিছু কাজ বাকি থাকলেও যাত্রা শুরু হয়ে গেছে এবং এটি আর থামানোর সুযোগ নেই।

প্রযুক্তির লড়াই: ডিজেল বনাম পারমাণবিক শক্তির সক্ষমতা

সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, কেন দক্ষিণ কোরিয়া পারমাণবিক সাবমেরিনের জন্য এত মরিয়া? এর উত্তর লুকিয়ে আছে সামরিক কৌশল ও প্রযুক্তির মৌলিক পার্থক্যে। সাধারণ ডিজেল-ইলেকট্রিক সাবমেরিনগুলো ব্যাটারি চার্জ করার জন্য নিয়মিত পানির ওপরে বা স্নরকেলিং গভীরতায় উঠে আসতে বাধ্য হয়। এই ভেসে ওঠার মুহূর্তটিই সাবমেরিনের জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক, কারণ তখন এটি শত্রুর রাডারে বা স্যাটেলাইটে ধরা পড়ার ঝুঁকিতে থাকে। অন্যদিকে, পারমাণবিক সাবমেরিন বা এসএসএন হলো সমুদ্রের নিচের প্রকৃত শিকারি, যার ভেসে ওঠার কোনো প্রয়োজন নেই।

দক্ষিণ কোরিয়ার সংসদ সদস্য ও প্রখ্যাত প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞ ইউ ইয়ং-ওন বিষয়টি ব্যাখ্যা করে বলেন, পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিন ডিজেলচালিত সাবমেরিনের তুলনায় অনেক বেশি দ্রুতগামী এবং মাসের পর মাস পানির নিচে থাকতে পারে। এর একমাত্র সীমাবদ্ধতা হলো ক্রুদের জন্য খাদ্য সরবরাহ এবং মানসিক ক্লান্তি। তিনি আরও জানান, এই সক্ষমতা উত্তর কোরিয়ার সাবমেরিন নজরদারিতে নাটকীয় পরিবর্তন আনবে।

উত্তর কোরিয়া তাদের সাবমেরিন থেকে নিক্ষেপযোগ্য ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা দ্রুত বাড়াচ্ছে। একটি ডিজেল সাবমেরিন নিয়ে উত্তর কোরিয়ার এই সাবমেরিনগুলোর ওপর সার্বক্ষণিক নজরদারি করা প্রায় অসম্ভব। কারণ, ব্যাটারি চার্জ করতে ভেসে উঠলেই সেটি নিজের অবস্থান জানান দিয়ে দেবে এবং উত্তর কোরিয়া সতর্ক হয়ে যাবে। কিন্তু একটি পারমাণবিক সাবমেরিন নিঃশব্দে উত্তর কোরিয়ার সাবমেরিন ঘাঁটির বাইরে বা সাগরের গভীরে অনন্তকাল ওঁৎ পেতে থাকতে পারে এবং প্রয়োজনামাত্রই আঘাত হানতে সক্ষম। সিউলের যুক্তি হলো, সাবমেরিন থেকে নিক্ষেপযোগ্য ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রসহ উত্তর কোরিয়ার পানির নিচের এই ‘অদৃশ্য হুমকি’ মোকাবিলায় পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিন এখন আর বিলাসিতা নয়, বরং অস্তিত্ব রক্ষার প্রয়োজন।

ট্রাম্প-লি সমঝোতা ও নিরাপত্তার নতুন সমীকরণ

দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে মিয়ং ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকের পর এই চুক্তিকে একটি “বিশাল অর্জন” হিসেবে অভিহিত করেছেন। তাঁর মতে, এটি দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিরক্ষা স্বায়ত্তশাসন বা ‘ডিফেন্স অটোনমি’ নিশ্চিত করার পথে এক বিশাল পদক্ষেপ। এতদিন সিউলকে পুরোপুরি মার্কিন নৌবাহিনীর ওপর নির্ভর করতে হতো, কিন্তু এই চুক্তির ফলে তারা নিজেরাই নিজেদের জলসীমা রক্ষায় সক্ষম হবে। ১৪ নভেম্বর প্রকাশিত যুক্তরাষ্ট্র-দক্ষিণ কোরিয়ার যৌথ একটি তথ্যমূলক নথিতে ইঙ্গিত দেওয়া হয় যে, পারমাণবিক জ্বালানি সংগ্রহের ক্ষেত্রে ওয়াশিংটন সিউলকে সহযোগিতা করতে সম্মত হয়েছে, যা ছিল এই প্রকল্পের সবচেয়ে বড় বাধা।

দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী আহন গিউ-ব্যাক সংসদে এ বিষয়ে একটি অত্যন্ত সাহসী ও আত্মবিশ্বাসী বক্তব্য রাখেন। তিনি বলেন, এটিকে যুক্তরাষ্ট্রের কেবল ‘অনুমোদন’ বলার চেয়ে বলা যায় পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিন তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ দক্ষিণ কোরিয়া আগেই প্রস্তুত করে ফেলেছিল, শুধু জ্বালানিটুকুই ছিল শেষ অংশ বা মিসিং পাজল। তাঁর এই বক্তব্য প্রমাণ করে যে দক্ষিণ কোরিয়া প্রযুক্তিগতভাবে কতটা প্রস্তুত।

হোয়াইট হাউসের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা এই নীতি পরিবর্তনের ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে মিত্রতা রেখে দেশটির জন্য হুমকি প্রতিরোধ এবং দায়িত্ব ভাগাভাগি বাড়ানোর লক্ষ্যে পারমাণবিক শক্তিচালিত আক্রমণাত্মক সাবমেরিন উন্নয়নসহ সিউলের উচ্চাকাক্সক্ষাকে যুক্তরাষ্ট্র সমর্থন করে। ওয়াশিংটন এখন বুঝতে পারছে যে, চীন ও উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে একা লড়াই করার চেয়ে শক্তিশালী মিত্রদের হাতে উন্নত অস্ত্র তুলে দেওয়া কৌশলগতভাবে বেশি লাভজনক।

উত্তর কোরিয়ার প্রতিক্রিয়া ও ‘নিউক্লিয়ার ডোমিনো’ প্রভাব

স্বাভাবিকভাবেই, সিউলের এই পদক্ষেপে পিয়ংইয়ং তীব্র ও ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছে, দক্ষিণ কোরিয়ার এই পরিকল্পনা অঞ্চলে একটি ‘পারমাণবিক ডোমিনো’ প্রভাব সৃষ্টি করবে। ডোমিনো প্রভাব হলো এমন একটি পরিস্থিতি যেখানে একটি দেশ পারমাণবিক অস্ত্র বা পারমাণবিক সামরিক সক্ষমতা অর্জন করলে তার প্রতিক্রিয়ায় নিরাপত্তার খাতিরে আশপাশের অন্য দেশগুলোও একই পথে এগিয়ে যেতে বাধ্য হয়। ঠিক ডোমিনো খেলার মতো একটির পর একটি দেশ পারমাণবিক শক্তিধর হয়ে ওঠার প্রবণতাকেই পারমাণবিক ডোমিনো প্রভাব বলা হয়। পিয়ংইয়ং আশঙ্কা করছে, এর ফলে জাপান এবং তাইওয়ানও ভবিষ্যতে একই পথে হাঁটবে।

উত্তর কোরিয়া নিজেও হাত গুটিয়ে বসে নেই। মার্চ মাসে দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে নেতা কিম জং-উনকে একটি পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিন তৈরির প্রকল্প পরিদর্শন করতে দেখা যায় বলে প্রচার করা হয়। যদিও তাদের দাবির সত্যতা নিয়ে পশ্চিমা বিশ্লেষকদের সন্দেহ রয়েছে এবং তাদের কর্মসূচি আসলে কতটা অগ্রসর তা এখনো স্পষ্ট নয়, তবে রাশিয়ার সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার সাম্প্রতিক ঘনিষ্ঠতা শঙ্কার জন্ম দিয়েছে। কিছু বিশ্লেষকের ধারণা, পিয়ংইয়ং এ ক্ষেত্রে রাশিয়ার কারিগরি সহায়তা পাচ্ছে। দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, তারা বিষয়টি ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়া দুই দেশই প্রতিরক্ষা সহযোগিতা জোরদারের কথা বললেও প্রতিরক্ষার ক্ষেত্রে কারিগরি সহযোগিতা নিয়ে কোনো বিস্তারিত তথ্য দেয়নি।

জাপানের দ্বিধা ও বিস্ময়: মিত্র যখন প্রতিদ্বন্দ্বী

দক্ষিণ কোরিয়ার এই অভাবনীয় কূটনৈতিক ও সামরিক বিজয়ে সবচেয়ে বেশি বিস্মিত ও কিছুটা বিব্রত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের এশীয় মিত্র জাপান। টোকিও দীর্ঘদিন ধরে এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান সামরিক সহযোগী হিসেবে নিজেকে মনে করে আসছে। সরকারি আলোচনার সঙ্গে পরিচিত এক ব্যক্তির বরাত দিয়ে জানা যায়, ডোনাল্ড ট্রাম্পের সিউলের কর্মসূচির প্রতি সমর্থনের খবর শুনে টোকিও রীতিমতো হতবাক হয়েছে। জাপানের ধারণা ছিল, যুক্তরাষ্ট্র যদি এ অঞ্চলে পারমাণবিক সাবমেরিনের মতো স্পর্শকাতর উদ্যোগে সমর্থন দেয়, তবে সেই তালিকার প্রথম নামটি হবে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া নয়।

জাপানের বর্তমান সংবিধান এবং পারমাণবিক-বিরোধী জনমত একটি বড় বাধা হলেও, সিউলের এই অগ্রগতি টোকিওর রাজনৈতিক মহলে অস্থিরতা তৈরি করেছে। দক্ষিণ কোরিয়ার সংসদ সদস্য ইউ ইয়ং-ওন মন্তব্য করেন, সিউলের এই সক্ষমতা অর্জন জাপানকেও তাদের অবস্থান নতুন করে ভাবতে বাধ্য করবে। জাপানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। তবে সম্প্রতি দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী শিনজিরো কোইজুমি বলেছেন, পারমাণবিক শক্তিতে রূপান্তর একটি সম্ভাব্য বিকল্প হতে পারে, যদিও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে এ মুহূর্তে এ নিয়ে কোনো গবেষণা চলছে না।

টোকিওভিত্তিক এক নৌ-বিশেষজ্ঞ নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, জাপানের তুলনামূলক ছোট ডিজেলচালিত সাবমেরিনগুলো অগভীর পানিতে কার্যকর হলেও পারমাণবিক সাবমেরিন প্রশান্ত মহাসাগর পর্যন্ত কার্যক্রম সম্প্রসারণে সক্ষম হবে এবং ভবিষ্যতে প্রতিশোধমূলক সক্ষমতার পথও তৈরি করতে পারে। তিনি আরও জানান, এক জাপানি কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন যে টোকিও যদি সত্যিই পারমাণবিক সাবমেরিনের পথে এগোয়, তবে প্রয়োজনীয় সহায়তার জন্য তারাও যুক্তরাষ্ট্রের কাছে আবেদন করবে। সেজং ইনস্টিটিউটের গবেষক চিয়ং সঙ-চ্যাং মন্তব্য করেন, যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় শেষ পর্যন্ত জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া যৌথভাবে পারমাণবিক সাবমেরিন উন্নয়নে এগোতে পারে, যা ওয়াশিংটনের আঞ্চলিক নিরাপত্তার স্বার্থের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে।

চীনকে ঘিরেই মূল লক্ষ্য: ‘পেসিং থ্রেট’ ও মার্কিন কৌশল

প্রকাশ্যে উত্তর কোরিয়ার হুমকির কথা বলা হলেও, এই পুরো উদ্যোগের পেছনে আসল লক্ষ্য যে চীন, তা সামরিক বিশ্লেষকদের কাছে পরিষ্কার। দক্ষিণ কোরিয়ার এই উচ্চাকাক্সক্ষা চীনের সামরিক প্রভাব মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্যগুলোর সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর প্রধান (চিফ অব নেভাল অপারেশনস) অ্যাডমিরাল ড্যারিল কডল চীনকে একটি ‘পেসিং থ্রেট’ বা ক্রমাগত ধাবমান হুমকি হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি সম্প্রতি সিউলে বলেন, ভবিষ্যতে আঞ্চলিক প্রতিরোধে দক্ষিণ কোরিয়ার পারমাণবিক সাবমেরিন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে তিনি আশা করছেন।

চীনের প্রতিক্রিয়া এখন পর্যন্ত সংযত হলেও, পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যেতে পারে বলে সতর্ক করেছে ওয়াশিংটনভিত্তিক থিঙ্কট্যাংক ৩৮ নর্থ। বেইজিং মনে করে, দক্ষিণ কোরিয়ার হাতে পারমাণবিক সাবমেরিন থাকার অর্থ হলো যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর শক্তি বৃদ্ধি পাওয়া, যা তাইওয়ান প্রণালী বা দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করবে। দক্ষিণ কোরিয়ার জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা উই সুং-লাকের বরাতে জানা গেছে, গত মাসে প্রেসিডেন্ট লি জে মিয়ং চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংকে আশ্বস্ত করেছেন যে সাবমেরিনগুলো হবে সম্পূর্ণ প্রতিরক্ষামূলক এবং উত্তর কোরিয়াকে নিবৃত্ত করাই এর একমাত্র উদ্দেশ্য। উই সুং-লাক বলেন, সব দেশ হয়তো বিষয়টি স্বাগত জানাবে না, কিন্তু আমাদের অবস্থান আছে এবং আমরা ব্যাখ্যা করতে ও বোঝাতে পারব।

নির্মাণ প্রস্তুতি ও প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ

রাজনীতি ও কূটনীতির বাধা দূর হলেও, প্রযুক্তিগত ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জগুলো বিশাল। তবে দক্ষিণ কোরিয়া এ ক্ষেত্রেও অনেক দূর এগিয়ে আছে। অবসরপ্রাপ্ত নৌবাহিনীর কর্নেল মুন কুন-সিক সামরিক সূত্রের বরাত দিয়ে জানান, বাধাবিপত্তি সত্ত্বেও দক্ষিণ কোরিয়া স্বাধীনভাবেই অগ্রগতি সাধন করেছে এবং মৌলিক সাবমেরিন নকশা তৈরি করেছে। প্রতিরক্ষামন্ত্রী আহন গিউ-ব্যাক বলেন, রিয়্যাক্টর সংযোজন এখন ‘গুরুত্বপূর্ণ’ পর্যায়ে রয়েছে। তাঁর হিসাব অনুযায়ী, সিউল আগামী ১০ বছরের মধ্যে একটি পারমাণবিক সাবমেরিন নির্মাণ করতে পারে এবং অন্তত চারটি ৫ হাজার টন ক্ষমতার পারমাণবিক সাবমেরিন প্রয়োজন হবে তাদের নৌবহরের জন্য।

দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় রয়টার্সকে জানিয়েছে, পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিন নির্মাণ-সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি তারা নিরবচ্ছিন্নভাবে অর্জন করে চলেছে। বর্তমানে কেবল যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন, ফ্রান্স, ভারত ও যুক্তরাজ্যের কাছেই পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিন রয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়া যদি সফল হয়, তবে তারা হবে এই ক্লাবের সপ্তম সদস্য।

অনিশ্চিত ভবিষ্যতের পথে এশিয়া

মার্কিন সমর্থনে দক্ষিণ কোরিয়ার পারমাণবিক সাবমেরিন প্রকল্প এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে এক নতুন ও অনিশ্চিত অধ্যায়ের সূচনা করেছে। এটি একদিকে যেমন সিউলকে উত্তর কোরিয়ার হুমকি মোকাবিলায় অভূতপূর্ব সক্ষমতা দেবে, অন্যদিকে চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে। জাপান হয়তো খুব শীঘ্রই নিজেদের দীর্ঘদিনের সামরিক খোলস ছেড়ে বেরিয়ে আসবে এবং একই প্রযুক্তির দাবি তুলবে।

দক্ষিণ কোরিয়ার সাবমেরিন প্রকল্প কেবল একটি সামরিক হার্ডওয়্যার তৈরির গল্প নয়; এটি একটি বার্তা। বার্তাটি হলো—এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ছাতা আর আগের মতো একক নির্ভরতার প্রতীক নয়, বরং মিত্ররা এখন নিজেদের হাতেই নিজেদের নিরাপত্তার চাবিকাঠি তুলে নিচ্ছে। পানির নিচে এই নীরব যুদ্ধের ফলাফল কী হবে, তা আগামী দশকগুলোতে এশিয়ার শান্তি ও স্থিতিশীলতার ভাগ্য নির্ধারণ করবে।

জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা উই সুং-লাকের ভাষায়, সব দেশ হয়তো বিষয়টি স্বাগত জানাবে না, কিন্তু দক্ষিণ কোরিয়া তার নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বদ্ধপরিকর। তবে ব্যাখ্যা দিলেও, প্রশান্ত মহাসাগরের গভীরে শুরু হওয়া এই অস্ত্র প্রতিযোগিতা থামানো এখন প্রায় অসম্ভব। পারমাণবিক ডোমিনোর প্রথম ঘুঁটিটি পড়ে গেছে, এখন দেখার বিষয় বাকিগুলো কীভাবে এবং কখন পড়ে।

পাঠকপ্রিয়