চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক সেট্রাল রেলওয়ে বিল্ডিং বা সিআরবি রক্ষা ও ঝুঁকিমুক্ত ব্যবহারের স্বার্থে সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। প্রায় ১২৮ বছরের পুরোনো এই স্থাপনাটির মূল নকশা অবিকৃত রেখে এর কাঠামোগত শক্তি বৃদ্ধি বা রেট্রোফিটিং করা হবে। দীর্ঘমেয়াদী এই পুনর্নির্মাণ কাজ শেষ করতে সময় লাগবে প্রায় ৯ বছর। আর এতে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১৩৩ কোটি টাকা।
রেলওয়ের প্রকৌশল বিভাগের সূত্রে জানা গেছে, সিআরবি ভবনটি হেরিটেজ বা ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা হওয়ায় এর বাহ্যিক অবকাঠামো পরিবর্তন না করেই সংস্কারকাজ চালানো হবে। এ লক্ষ্যে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ব্যুরো ভেরিটাস (বাংলাদেশ) প্রাইভেট লিমিটেডের সঙ্গে রেলওয়ের চুক্তি হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি ভবনের সামগ্রিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে সংস্কারের সুপারিশ ও ব্যয়ের চিত্র জমা দিয়েছে। তাদের দেওয়া প্রাক-প্রতিবেদন অনুযায়ী, পাঁচটি ধাপে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করতে মোট ৮ বছর ৭ মাস সময় লাগবে।
ব্যুরো ভেরিটাসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সিআরবি ভবন সংস্কার ও শক্তিশালী করতে সিভিল ওয়ার্কে ব্যয় হবে ৯৭ কোটি ৮ লাখ টাকা। এছাড়া ইলেকট্রিক্যাল ওয়ার্কে ১৯ কোটি ৬১ লাখ এবং প্লাম্বিং ওয়ার্কে ১৫ কোটি ৭০ লাখ টাকাসহ মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১৩২ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। সংস্কারের সময় মূল কাঠামো ঠিক রাখা হলেও ভবনে লিফটসহ কিছু আধুনিক সুবিধা সংযোজন করার পরিকল্পনা রয়েছে রেলওয়ের।
১৮৯৮ সালে আসাম-বেঙ্গল রেলওয়ের সদর দপ্তর হিসেবে নির্মিত এই ভবনটি বর্তমানে বাংলাদেশ রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের সদর দপ্তর। ২০ একর জমির ওপর নির্মিত এই মেগা অবকাঠামোটি কালের পরিক্রমায় জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে ভবনের দক্ষিণ ও পশ্চিম ব্লকের দ্বিতীয় তলার ছাদের মূল লোহার বিম এবং আড়াআড়িভাবে স্থাপিত বিমগুলোর অধিকাংশ স্থানে মরিচা ধরেছে। করিডোরের ফাউন্ডেশনে ফাটল এবং দেয়াল ও ছাদ স্যাঁতসেঁতে হয়ে যাওয়ায় বড় ভূমিকম্পে ভবনটি ধসে পড়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী মো. তানভিরুল ইসলাম জানান, বিদেশি দক্ষ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে মূল নকশা ঠিক রেখে সংস্কার ও কাঠামো শক্তিশালী করতে কাজ করছে রেলওয়ে। প্রকল্পটি ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ হওয়ায় সরকারের সব পক্ষকে নিয়ে কাজ শুরু করা হবে। সম্ভাব্যতা যাচাই শেষে আগামী বছরের মধ্যেই সিআরবি সংস্কারকাজ শুরু করার লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে রেলওয়ে।
অন্যদিকে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের উপপরিচালক রাখী রায় বলেন, রেলওয়ের পক্ষ থেকে সিআরবি ভবনটি সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়ায় অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে সার্বিক সহযোগিতা করা হচ্ছে। কোনো হেরিটেজের মূল নকশা অক্ষত রেখে পরিবর্তন বা পরিবর্ধন না করলে আইনের ব্যত্যয় ঘটে না। ভবনটি প্রত্নতত্ত্বের অধীনে মেরামতের পর সরকার চাইলে এটিকে হেরিটেজ ঘোষণার বিষয়টি বিবেচনায় নিতে পারে।
উল্লেখ্য, ১৯৫৮ সালে পাকিস্তান আমলে এবং স্বাধীনতার পর ১৯৭৯ সালে এই ভবনের বিভিন্ন অংশের সম্প্রসারণ করা হয়। বর্তমানে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের পাঁচ শতাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী এই ভবনে কাজ করেন। এছাড়া প্রতিদিন অসংখ্য দর্শনার্থীর আনাগোনা থাকে এই ঐতিহাসিক প্রাঙ্গণে। তাই সম্ভাব্য দুর্ঘটনা এড়াতেই ভবনটি দ্রুত সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।