বিগত এক যুগে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে দলীয় নেতা, মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও তাদের স্বজনরা ৬১টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন বাগিয়ে নিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এসব উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ট্রাস্টি বোর্ডেও দলীয়করণ ও আত্মীয়করণের চিত্র স্পষ্ট। গত ৫ আগস্ট সরকারের পতনের পর এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক মালিক পলাতক থাকায় প্রশাসনিক কার্যক্রমে স্থবিরতা নেমে এসেছে, সেই সঙ্গে প্রশ্ন উঠেছে শিক্ষার মান ও গবেষণার সক্ষমতা নিয়ে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাজনৈতিক বিবেচনায় অনুমোদন পাওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ট্রাস্টি বোর্ডে প্রভাবশালীদের দাপট ছিল। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক দিল আফরোজ বেগম জানিয়েছেন, নতুন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অনুমোদনের ক্ষেত্রে ইউজিসির পক্ষ থেকে আপত্তি জানানো হলেও শিক্ষা মন্ত্রণালয় তা আমলে নেয়নি। পরিদর্শন প্রতিবেদনে অনুমোদনে নিরুৎসাহিত করা হলেও রাজনৈতিক বিবেচনায় প্রায় সবকটি প্রতিষ্ঠান অনুমোদন পেয়েছে।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন অনুযায়ী ট্রাস্টি বোর্ড গঠনের বিধান থাকলেও সেখানে কাদের রাখা হবে তা সুনির্দিষ্ট নেই। এই সুযোগে অধিকাংশ ট্রাস্টি বোর্ড পারিবারিক প্রতিষ্ঠানে রূপ নিয়েছে। ২০১২ সালে অনুমোদন পাওয়া শরীয়তপুরের জেডএইচ শিকদার বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টি বোর্ডের ৯ জনই সিকদার পরিবারের সদস্য। সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহিউদ্দীন খান আলমগীর ২০১২ সালে ইউরোপিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ছিলেন। এছাড়া শেখ হাসিনার চাচা শেখ কবির হোসেন ২০১৩ সালে ফারইস্ট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির অনুমোদন পান। বরিশালের গ্লোবাল ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের ট্রাস্টি বোর্ডেও জাহাঙ্গীর কবির নানক ও তার পরিবারের সদস্যদের আধিপত্য দেখা গেছে। সবশেষ ২০২৪ সালে কুষ্টিয়ায় অনুমোদন পাওয়া একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টি বোর্ডেও আওয়ামী লীগের উপকমিটির নেতার নাম রয়েছে।
ইউজিসির তথ্যানুযায়ী, ২০১২ সাল থেকে অনুমোদিত ৬১টি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ৪৫টিই রাজধানীর বাইরে অবস্থিত। জেলা শহরে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক এস এম হাফিজুর রহমান বলেন, বড় শহরের বাইরে বিশ্ববিদ্যালয় হলে উচ্চশিক্ষার বিকেন্দ্রীকরণ হয় ঠিকই, কিন্তু সেখানে দক্ষ শিক্ষক ও শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করা বড় চ্যালেঞ্জ। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সেবামূলক না হয়ে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হচ্ছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
অনেক বিশ্ববিদ্যালয় আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, ল্যাবরেটরি ও শিক্ষক নিয়োগের শর্ত পূরণ না করেই অনুমোদন পেয়েছে। ২০১২ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে অনুমোদন পাওয়া চারটি বিশ্ববিদ্যালয় এখনো শিক্ষার্থী ভর্তির অনুমতি পায়নি। গবেষণা খাতেও এসব প্রতিষ্ঠানের চিত্র হতাশাজনক। ইউজিসির সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩ সালে ১৫টি নতুন বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা খাতে কোনো বরাদ্দ রাখেনি এবং ২২টি প্রতিষ্ঠান থেকে কোনো গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়নি।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন-২০১০ সংশোধনের উদ্যোগ ২০১৬ সালে নেওয়া হলেও তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। খসড়া আইনে ট্রাস্টি বোর্ডে এক-তৃতীয়াংশ শিক্ষাবিদ রাখার প্রস্তাব করা হলেও মালিকপক্ষের আপত্তিতে তা বাদ পড়ার শঙ্কা রয়েছে। তবে ইউজিসির সদস্য অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন জানিয়েছেন, সংশোধিত আইনের খসড়া নিয়ে কাজ চলছে এবং প্রশাসনিক অনুমোদন শেষে তা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে।