সোমবার, ১৯ জানুয়ারি ২০২৬

সর্বশেষ

পাহাড়ের বুকে এক দম্পতির ‘রঙিন’ স্বপ্ন

জাকির হোসেন

খাগড়াছড়ির দীঘিনালা উপজেলার ছোট মেরুং সওদাগর পাড়া। পাহাড়ের এই শান্ত জনপদটি এখন ভিন্ন এক কারণে মানুষের মুখে মুখে ফিরছে। সেখানকার একটি বাড়ির আঙিনায় পা রাখলেই মনে হবে, পাহাড়ের রুক্ষতার মাঝে কেউ যেন সযত্নে এক টুকরো রঙের ক্যানভাস বিছিয়ে দিয়েছে। হলুদ, সাদা, গোলাপি আর বেগুনি রঙের ফুলের সমারোহে ঘেরা এই বাড়িটি এখন আর শুধুই একটি বসতভিটা নয়, বরং পরিণত হয়েছে শখ আর স্বপ্নপূরণের এক অনন্য দৃষ্টান্ত হিসেবে। আর এই রঙিন ভুবনটি গড়ে তুলেছেন নাসরিন আক্তার ও মো. মাসুদুল আলম নামের এক দম্পতি।

পেশাগত জীবনে নাসরিন আক্তার হাজাধন মনি পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা এবং তাঁর স্বামী মো. মাসুদুল আলম একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। কর্মব্যস্ত জীবনের ফাঁকে মাত্র দুই বছর আগে বাড়ির সৌন্দর্য বাড়ানোর ভাবনা থেকেই তাঁদের এই উদ্যোগের শুরু। প্রথমে স্রেফ শখের বশে টবে কিছু দেশি-বিদেশি ফুলের চারা রোপণ করেছিলেন তাঁরা। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় সেই শখ এখন ডালপালা মেলে ১৫০ প্রজাতির বিশাল এক বাণিজ্যিক ফুল বাগানে রূপ নিয়েছে।

বাগানে ঢুকতেই দর্শনার্থীদের চোখে পড়ে সারি সারি টবে সাজানো চন্দ্রমল্লিকা। বিশেষ করে সাদা চন্দ্রমল্লিকার পূর্ণ বিকশিত রূপ দেখে মনে হয় যেন স্নিগ্ধতার এক প্রদর্শনী চলছে। নাসরিন ও মাসুদুল দম্পতি জানান, তাঁদের বাগানে কেবল চন্দ্রমল্লিকাই রয়েছে প্রায় ৭০ প্রজাতির। এর বাইরেও আছে থাইল্যান্ডের উন্নত জাতের গোলাপসহ প্রায় ৩০ ধরনের গোলাপ। টবে ঝুলছে রঙিন পিটুনিয়া, আর মাটিতে শোভা পাচ্ছে গাঁদা, ডালিয়া, গ্যাজেনিয়া, পোত্তলিকা ও সেলোসিয়াসহ নানা জাতের ফুল।

দীঘিনালার মতো পাহাড়ি এলাকায় এমন পরিকল্পিত ফুলের বাগান সচরাচর দেখা যায় না। তাই লোকমুখে শুনে প্রতিদিনই দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ আসছেন বাগানটি দেখতে। দর্শনার্থী নুরজাহান আক্তার বাগানের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে বলছিলেন, এখানে এলে মন ভালো হয়ে যায়। ফুলগুলো এত সুন্দর যে ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। ফুলের সৌন্দর্যে নিজেকে হারিয়ে ফেলতে ইচ্ছে করে। বাড়ি ফেরার সময় আমি কিছু ফুল কিনে নিয়ে যাচ্ছি।

বাগানটি দেখতে এসেছিলেন স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মী প্রবীর সুমনও। তিনি তাঁর অভিজ্ঞতার কথা জানাতে গিয়ে বলেন, দীঘিনালায় এত সুন্দর একটি ফুলের বাগান রয়েছে, এখানে না আসলে তা জানতেই পারতাম না। চন্দ্রমল্লিকা, গোলাপসহ নাম না জানা নানা রকমের ফুল দেখে মুগ্ধ না হয়ে উপায় নেই।

শুরুর দিকে বিষয়টি কেবল শখ থাকলেও এখন এটি নাসরিন ও মাসুদুল দম্পতির জন্য আয়ের একটি উৎসে পরিণত হয়েছে। বিভিন্ন জায়গা থেকে দর্শনার্থীরা এসে পছন্দমতো ফুল কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। উদ্যোক্তারা বলছিলেন, শখ থেকে শুরু হলেও এখন এই বাগান আমাদের নেশা ও পেশা হয়ে গেছে। দেশের বিভিন্ন জায়গা ও বিদেশ থেকে উপকরণ এনে বাগানটি সাজিয়েছি। এটি এখন আমাদের মানসিক প্রশান্তির জায়গা। মানুষ যখন দূর-দূরান্ত থেকে দেখতে আসে, তখন অন্য রকম ভালো লাগা কাজ করে।

শুধু ফুলের সৌন্দর্যেই এই বাগান সীমাবদ্ধ থাকেনি, প্রকৃতির সাথেও গড়ে তুলেছে এক নিবিড় সম্পর্ক। বাগানের ফুলে আকৃষ্ট হয়ে মৌমাছিরা এসে বাসা বেঁধেছে, তৈরি করেছে মৌচাক। নাসরিন ও মাসুদুল দম্পতি সেই মৌচাক থেকে মধু সংগ্রহ করে নিজেদের পারিবারিক চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি বিক্রিও করছেন।

ভবিষ্যতে এই বাগানকে ঘিরে আরও বড় স্বপ্ন বুনছেন এই দম্পতি। ফুলের জাত বাড়ানো, নার্সারি সম্প্রসারণ এবং নতুন নতুন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে এই উদ্যোগকে তাঁরা আরও এগিয়ে নিতে চান। স্থানীয়রা মনে করছেন, দীঘিনালার পাহাড়ে নাসরিন আক্তার ও মো. মাসুদুল আলমের এই উদ্যোগ অনেকের জন্যই এক নতুন সম্ভাবনার পথ দেখাবে।

পাঠকপ্রিয়