সোমবার, ১৯ জানুয়ারি ২০২৬

সর্বশেষ

গোপন ঋণের দায়ে ডুবছে পাওয়ার গ্রিড

নিজস্ব প্রতিবেদক

রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশের (পিজিসিবি) গোপন দায়ের বোঝা তাদের প্রদর্শিত সম্পদের মূল্যকেও ছাড়িয়ে গেছে। কোম্পানির ২০২৫ অর্থবছরের আর্থিক প্রতিবেদনে এমন ভয়াবহ তথ্য উঠে এসেছে নিরীক্ষকদের (অডিটর) আপত্তিপত্রে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব গোপন দায় ও হিসাবের অসঙ্গতি আমলে নিলে দেখা যায়, ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা হারিয়ে কোম্পানিটি কার্যত দেউলিয়া হওয়ার পথে।

চলতি বছরের জুন পর্যন্ত পাওয়ার গ্রিড তাদের সম্পদের পরিমাণ ৮০ হাজার ১৯৮ কোটি টাকা (৮০,১৯৮ কোটি) বলে দাবি করেছে। বিপরীতে তাদের দায়ের পরিমাণ দেখানো হয়েছে ৬৭ হাজার ৪৭০ কোটি টাকা। তবে কোম্পানির নিরীক্ষক প্রতিষ্ঠান হোদা বসি চৌধুরী অ্যান্ড কোং এবং একনাবিন তাদের ‘কোয়ালিফাইড অপিনিয়ন’ বা শর্তযুক্ত মতামতে জানিয়েছে, কোম্পানিটি এমন কিছু সম্পদ ও পাওনা দেখিয়েছে যা আদায় করা প্রায় অসম্ভব।

নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, পাওয়ার গ্রিড বিভিন্ন পক্ষের কাছে ১ হাজার ১১৫ কোটি টাকা পাওনা দেখিয়েছে। এর মধ্যে পিডিবি এবং পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির (পিবিএস) সঙ্গেই ১৭১ কোটি টাকার পাওনা নিয়ে বিরোধ চলছে। নিরীক্ষকরা বলছেন, এই টাকা উদ্ধারের সম্ভাবনা নেই বললেই চলে, অথচ এর বিপরীতে কোনো সঞ্চিতি বা প্রভিশন রাখা হয়নি।

সবচেয়ে বিস্ময়কর তথ্য হলো, আর্থিক প্রতিবেদনে ২৭ হাজার ৪৩৬ কোটি টাকার সম্পত্তি, প্ল্যান্ট এবং যন্ত্রপাতি (পিপিই) দেখানো হলেও এর কোনো অবচয় বা অ্যামোর্টাইজেশন ধরা হয়নি। ব্র্যাক ইপিএল স্টক ব্রোকারেজের হেড অব রিসার্চ সেলিম আফজাল শাওন এ বিষয়ে বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, পাওয়ার গ্রিডের মতো একটি কোম্পানি তাদের সম্পত্তির অবচয় খরচ বাদ দেয়নি, এটা সত্যিই অবিশ্বাস্য। তিনি বলেন, আগের নিরীক্ষকরা এত বড় অসঙ্গতি ধরতে না পেরে তাদের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছেন। প্রকৃত মূল্য বের করতে একটি ‘ফরেনসিক অডিট’ করা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।

জমির মালিকানা নিয়েও বড় ধরণের জালিয়াতির ইঙ্গিত মিলেছে। কোম্পানিটি ১ হাজার ৪১০ কোটি টাকার জমি নিজেদের দাবি করে ১৯৯৬ সালের একনেক সিদ্ধান্ত ও ২০০১ সালের বিদ্যুৎ বিভাগের আদেশের দোহাই দিয়েছে। তবে বিক্রেতা সংস্থা পিডিবির কাছ থেকে কোনো অনাপত্তি সনদ (এনওসি) বা নামজারির (মিউটেশন) কাগজ দেখাতে পারেনি তারা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানের এক অংশীদার বলেন, দালিলিক প্রমাণ না থাকায় আর্থিক প্রতিবেদনে উল্লেখিত ওই জমি দাবি করার অবস্থানে নেই পাওয়ার গ্রিড।

হিসাবের গরমিল এখানেই শেষ নয়। পাওয়ার গ্রিড দাবি করেছে, তারা ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির (ডিপিডিসি) কাছ থেকে ৩৫৯ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। অথচ ডিপিডিসির ২০২৫ সালের নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদনে এই ঋণের কোনো অস্তিত্ব বা প্রাপ্য হিসাব নেই। এ বিষয়ে এক নিরীক্ষক প্রশ্ন তোলেন, ডিপিডিসি যদি ঋণ না দিয়ে থাকে, তবে পাওয়ার গ্রিড যে ঋণের কথা বলছে, সেই টাকা আসলে কে গ্রহণ করেছে?

এছাড়া মেয়াদি ঋণের বিপরীতে পাওয়ার গ্রিডের ৭ হাজার ৯৩৩ কোটি টাকার সুদ বকেয়া রয়েছে। সব মিলিয়ে এসব অসঙ্গতি ও গোপন দায় যোগ করলে কোম্পানির মোট দায় তার প্রকৃত সম্পদের চেয়ে বেশি হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ২০২৫ অর্থবছরে কোম্পানিটি শেয়ার প্রতি ২ টাকা ৩০ পয়সা লোকসান দেখিয়েছে, যা আগের বছর ছিল ৬ টাকা ৬৯ পয়সা। তবে হিসাবের গরমিল ঠিক করা হলে লোকসানের পরিমাণ আরও অনেক বাড়বে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান হওয়ায় হয়তো সরকার একে টিকিয়ে রাখবে, কিন্তু অদক্ষ ব্যবস্থাপনার কারণে করদাতার টাকার এমন অপচয় মেনে নেওয়া যায় না। সেলিম আফজাল শাওন সতর্ক করে বলেন, কোম্পানির ত্রুটিপূর্ণ সম্পদ নির্দেশ করে যে এর ইক্যুইটি নেতিবাচক হয়ে থাকতে পারে। সাধারণ বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষায় পরিচালনা পর্ষদের এখনই নজর দেওয়া উচিত।

এসব অভিযোগ ও অসঙ্গতির বিষয়ে মন্তব্য জানতে পাওয়ার গ্রিডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুর রশিদ খানের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন বা খুদে বার্তার কোনো উত্তর দেননি।

পাঠকপ্রিয়