স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে যে মানিক মিয়া এভিনিউয়ের জনসভায় দৃঢ়কণ্ঠের বক্তৃতায় ‘আপসহীন নেত্রী’ হয়ে উঠেছিলেন, সেই চত্বর থেকেই জনতার ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে শেষ বিদায় নিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। বুধবার (৩১ ডিসেম্বর) কয়েক বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিস্তৃত ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ এই জানাজায় অংশ নেন লাখো শোকার্ত মানুষ। জানাজা শেষে বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় রাজধানীর জিয়া উদ্যানে স্বামী ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সমাধির পাশে তাঁকে দাফন করা হয়।
এর আগে বুধবার দুপুর ২টায় জানাজা শুরুর কথা থাকলেও বেলা ১১টার আগেই কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায় জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজার মাঠ ও মানিক মিয়া এভিনিউ। দুপুরের পর জানাজার কাতার সংসদ ভবন এলাকা ছাপিয়ে দক্ষিণে ধানমন্ডির সোবহানবাগ, দক্ষিণ-পূর্বে ফার্মগেট-কারওয়ান বাজার হয়ে বাংলামটর এবং উত্তরে মনিপুরিপাড়া হয়ে শেওড়াপাড়া ও বিজয় সরণি হয়ে জাহাঙ্গীর গেট পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের ফার্মগেটমুখী অংশ, আগারগাঁও, ফার্মগেট ও কারওয়ান বাজার মেট্রো স্টেশন, বিভিন্ন ভবনের ছাদ ও ওভারব্রিজে দাঁড়িয়েও হাজারো মানুষ জানাজায় অংশ নেন।
বিকেল ৩টা ৭ মিনিটে অনুষ্ঠিত এই ঐতিহাসিক জানাজায় ইমামতি করেন বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের খতিব মুফতি আবদুল মালেক। জানাজার প্রথম সারিতে অংশ নেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তাঁর দুই পাশে ছিলেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও খালেদা জিয়ার বড় ছেলে তারেক রহমান এবং প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী। তাঁদের পাশেই দাঁড়িয়ে জানাজা পড়েন জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান ও এনসিপির আহ্বায়ক এবং তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম।
এছাড়া জানাজায় অংশ নেন সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যবৃন্দ, তিন বাহিনীর প্রধানগণ, জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমান, আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুলসহ উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা ও কূটনীতিকরা।
বিএনপি নেতাদের মধ্যে জানাজায় উপস্থিত ছিলেন মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, ড. মঈন খান, সালাহউদ্দিন আহমেদ, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, হাফিজ উদ্দিন আহমেদ, এ জেড এম জাহিদ হোসেন ও নজরুল ইসলাম খান। আরও ছিলেন সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, কেন্দ্রীয় নেতা লুৎফুজ্জামান বাবর, অধ্যাপক ডা. ফরহাদ হালিম ডোনার, শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানী, আব্দুস সালাম আজাদ, অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম, অধ্যাপক ড. মোর্শেদ হাসান খান ও নজরুল ইসলাম আজাদসহ দলের সর্বস্তরের নেতাকর্মী।
জানাজায় অংশ নেওয়া অন্য রাজনৈতিক দলের নেতাদের মধ্যে ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, ইসলামী আন্দোলনের জ্যেষ্ঠ নায়েবে আমির মুহাম্মদ সৈয়দ ফয়জুল করীম, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক, নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না, গণসংহতি আন্দোলনের সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি, গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর, এনসিপির মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহ ও ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েম। জাতীয় পার্টির মহাসচিব শামীম হায়দার পাটোয়ারীসহ দলটির জ্যেষ্ঠ নেতারা রাজধানী উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে জানাজায় অংশ নেন। এছাড়া চিন্তক ফরহাদ মজহার, মিজানুর রহমান আজহারী ও শায়খ আহমদুল্লাহসহ বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী ও আলেমগণ জানাজায় শরিক হন।
জানাজায় নারীদের জন্য নির্ধারিত স্থানে উপস্থিত ছিলেন তারেক রহমানের স্ত্রী ডা. জোবাইদা রহমান, মেয়ে জাইমা রহমান, প্রয়াত আরাফাত রহমান কোকোর স্ত্রী শর্মিলা রহমান, তাঁদের মেয়ে জাহিয়া রহমান ও জাফিয়া রহমান। সরকারের উপদেষ্টাদের মধ্যে সৈয়দা রেজওয়ানা হাসান, নুরজাহান বেগম ও ফরিদা খাতুনও সেখানে উপস্থিত ছিলেন।
জানাজার আগে দুপুর ২টা ৩৫ মিনিটে জাতীয় পতাকায় মোড়ানো খালেদা জিয়ার মরদেহ সংসদ ভবনে আনা হয়। এ সময় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান চেয়ারপারসনের জীবনী পাঠ করেন এবং বলেন, তাঁর মৃত্যুর দায় থেকে ফ্যাসিবাদী হাসিনা কখনও মুক্তি পাবে না। এরপর তারেক রহমান সমবেত মুসল্লিদের উদ্দেশে মায়ের ভুলত্রুটি ক্ষমা করার অনুরোধ জানান। এর আগে সংসদ ভবনে তারেক রহমানের সঙ্গে দেখা করে শোকবার্তা হস্তান্তর করেন পাকিস্তানের স্পিকার সরদার আয়াজ সাদিক ও ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর।
রাজধানীর বিভিন্ন প্রান্ত ও দেশের দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ ছুটে এসেছিলেন প্রিয় নেত্রীকে একনজর দেখতে। ভিড়ের চাপে মানিক মিয়া এভিনিউয়ের পশ্চিম প্রান্তে অসুস্থ হয়ে পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার নিরব হোসেন নামের এক ব্যক্তির মৃত্যু হয়। গাজীপুরের গাছা থেকে আসা মোশাররফ হোসেন আক্ষেপ করে বলেন, পুলিশ আমাকে ২০১৩ সালে ধরে নিয়ে গিয়েছিল। ম্যাডামকে জানানোর পর আমার জামিন হয়। ম্যাডাম নেই, এখন আমাদের কে দেখবে? পুরান ঢাকার ৮৩ বছর বয়সী আলী আব্বাস ও এনসিপি নেতা আলাউদ্দীন মোহাম্মদসহ হাজারো মানুষের চোখে ছিল শ্রদ্ধা আর শোকের অশ্রু। ময়মনসিংহ থেকে আসা আবদুল কাউয়ুম রতন জানান, তিনি কোনো দল করেন না, কিন্তু খালেদা জিয়াকে শ্রদ্ধা করেন বলেই ছুটে এসেছেন।
ঢাকা ছাড়াও চট্টগ্রাম, ফেনী, বগুড়া, রাজশাহী, সিলেট, বরিশালসহ সারা দেশে এবং যুক্তরাষ্ট্র ও অস্ট্রেলিয়ার মতো বিভিন্ন দেশে গায়েবানা জানাজা অনুষ্ঠিত হয়েছে।