ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে জামায়াতে ইসলামী ও সমমনা আরও ১০টি দলের মধ্যে আসন ভাগাভাগির আলোচনা এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে। মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের সময়সীমা ঘনিয়ে আসায় চলছে শেষ মুহূর্তের দর-কষাকষি। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, জামায়াত নিজেদের জন্য ১৯০টি আসন হাতে রেখে বাকি ১১০টি আসনে শরিকদের ছাড় দেওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা শিগগিরই আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হতে পারে।
দলীয় সূত্র ও আলোচনার সঙ্গে যুক্ত একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নিজস্ব জরিপ ও সাংগঠনিক শক্তির বিচারে ১৭০টি আসনে কোনো ছাড় দিতে রাজি নয় জামায়াত। এর বাইরে আরও ২০টি আসন পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। দলটির নীতিনির্ধারকরা মনে করছেন, এই আসনগুলো শরিকদের ছেড়ে দিলে জয়ী হওয়া কঠিন হবে, তাই সেখানেও দলীয় প্রার্থী দেওয়ার পক্ষে তারা।
কে কয়টি আসন পাচ্ছে
এখন পর্যন্ত হওয়া আলোচনার ভিত্তিতে ১১ দলের মধ্যে একটি খসড়া সমঝোতা দাঁড়িয়েছে। এতে চরমোনাই পীরের দল ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশকে ৪০টি, এনসিপিকে ৩০টি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসকে ১৫টি এবং খেলাফত মজলিসকে ৭টি আসন ছাড় দেওয়ার বিষয়ে প্রাথমিক সম্মতি দিয়েছে জামায়াত। এ ছাড়া লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) ৪টি, এবি পার্টি ৩টি এবং বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি (বিডিপি) ২টি আসন পেতে পারে।
তবে ইসলামী আন্দোলন ৪০টি আসনে সন্তুষ্ট নয়। দলটির নেতারা আরও কয়েকটি আসন দাবি করছেন। যে আসনগুলো তারা চাইছেন, সেগুলোতে জামায়াত ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসেরও শক্ত প্রার্থী রয়েছে। শেষ পর্যন্ত প্রার্থীর জনপ্রিয়তা ও যোগ্যতা বিবেচনায় ইসলামী আন্দোলনকে আরও কিছু আসন ছাড় দেওয়া হতে পারে বলে আভাস পাওয়া গেছে।
ইসলামী আন্দোলনের মহাসচিব মাওলানা ইউনুছ আহমাদ শনিবার রাতে বলেন, “আসন সমঝোতার আলোচনা চলমান। বিষয়টি চূড়ান্তের দিকে যাচ্ছে।” তবে কতটি আসনে সমঝোতা হচ্ছে, সে বিষয়ে তিনি স্পষ্ট কোনো সংখ্যা উল্লেখ করেননি।
এনসিপি ও খেলাফত দলগুলোর অবস্থান
এনসিপি যখন জোটে আলোচনার সূচনা করে, তখন তাদের ৩০টি আসন দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। মাঝখানে সংখ্যাটি কমার গুঞ্জন থাকলেও শেষ পর্যন্ত এনসিপিকে ৩০টি আসনেই ছাড় দেওয়া হতে পারে। দলটির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, জোটে তাঁরা কতটি আসন পাচ্ছেন, তা দু-এক দিনের মধ্যেই জানানো হবে।
অন্যদিকে মাওলানা মামুনুল হকের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস শুরুতে ২৫ থেকে ৩০টি আসন দাবি করেছিল। জামায়াত প্রথমে ১৩টি দিতে চাইলেও এখন তা বেড়ে ১৫টিতে ঠেকেছে। দলটির জ্যেষ্ঠ নায়েবে আমির ইউসুফ আশরাফ বলেন, “আগের চেয়ে আসনসংখ্যা বেড়েছে। মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ সময়ের আগেই সমঝোতা চূড়ান্ত হতে পারে।”
খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা আবদুল বাছিত আজাদ হবিগঞ্জ-২ এবং মহাসচিব আহমদ আবদুল কাদের হবিগঞ্জ-৪ আসনে নির্বাচন করবেন। দলটিকে আপাতত ৭টি আসন ছাড়ার কথা থাকলেও আলোচনায় তা আরও দু-একটি বাড়তে পারে।
এলডিপি, এবি পার্টি ও বিডিপির সমীকরণ
এলডিপির সভাপতি কর্নেল (অব.) অলি আহমদ এবার নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন না। তবে তাঁর ছেলে ও দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য অধ্যাপক ওমর ফারুক চট্টগ্রাম-১৪ আসনে লড়বেন। এলডিপিকে ৪টি আসন ছাড়ার কথা থাকলেও কোনো কোনো সূত্র বলছে, এই সংখ্যা বেড়ে ৭ পর্যন্ত হতে পারে।
এবি পার্টিকে তিনটি আসনে ছাড় দেওয়া হয়েছে। দলটির সদস্যসচিব মজিবুর রহমান মঞ্জু ফেনী-২ এবং যুগ্ম সদস্যসচিব আসাদুজ্জামান ভূঁইয়া (ফুয়াদ) বরিশাল-৩ আসনে লড়বেন। এই দুই আসনে জামায়াত প্রার্থী দেয়নি। তবে পটুয়াখালী-১ আসনে এবি পার্টির মেজর (অব.) আবদুল ওহাব মিনার প্রার্থী হলেও সেখানে জামায়াতের প্রার্থীও মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। সমঝোতা হলে জামায়াত প্রার্থী সেখান থেকে সরে দাঁড়াতে পারেন। বিডিপিকে ময়মনসিংহ-৯ ও ভোলা-৩ আসনটি ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
চূড়ান্ত ঘোষণার অপেক্ষা
জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান ওমরাহ পালন শেষে শনিবার দেশে ফিরেছেন। তাঁর নেতৃত্বে শিগগিরই শরিক দলগুলোর শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, “সব দলের নেতাদের সুবিধাজনক সময় পাওয়া যাচ্ছে না বলে একসঙ্গে বসা সম্ভব হয়নি। তবে অল্প কিছুদিনের মধ্যেই বৈঠক করে সমঝোতা চূড়ান্ত করা হবে।”
নির্বাচন কমিশনের তফসিল অনুযায়ী, আগামী ২০ জানুয়ারি মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিন। এর আগেই দলগুলোকে তাদের চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা নিশ্চিত করতে হবে। উল্লেখ্য, সমঝোতা আলোচনার মধ্যেই জামায়াত ২৭৬টি, ইসলামী আন্দোলন ২৬৮টি এবং অন্যান্য শরিক দলগুলোও আলাদাভাবে মনোনয়নপত্র জমা দিয়ে রেখেছে।