জানুয়ারির মাঝামাঝি। ক্যালেন্ডারের পাতায় ২০২৬ সাল। জানালার বাইরে তাকালে যুক্তরাজ্যের অনেক বাসিন্দা এখন শিউরে উঠছেন। একটি ‘ওয়েদার বম্ব’ বা আবহাওয়ার বোমা আছড়ে পড়েছে ব্রিটেনের উপকূলবর্তী এলাকাগুলোতে। ঝোড়ো হাওয়া আর তুষারপাতের দাপটে জনজীবন যখন বিপর্যস্ত, তখন হাজার মাইল উত্তরে, যেখানে বরফের রাজত্ব থাকার কথা, সেখানে ঘটছে প্রকৃতির এক নির্মম রসিকতা।
সুমেরু বা আর্কটিক অঞ্চল—পৃথিবীর ওপরের সেই টুপি, যা হাজার বছর ধরে পৃথিবীকে ঠান্ডা রেখেছিল, তা এখন জ্বরে পুড়ছে। দ্য গার্ডিয়ানের সাম্প্রতিক খবর এবং ২০২৫ সালের শেষের দিকে প্রকাশিত ‘আর্কটিক রেইন অন স্নো স্টাডি’-এর তথ্য বলছে, সুমেরু অঞ্চলের বল্গা হরিণেরা এক অদ্ভুত শত্রুর মোকাবিলা করছে। শিকারি নেকড়ে বা ভাল্লুক নয়, তাদের শত্রু এখন ‘বৃষ্টি’। শুনতে অবিশ্বাস্য মনে হলেও, প্রচণ্ড শীতে সেখানে তুষারের বদলে বৃষ্টি হচ্ছে। সেই বৃষ্টির পানি মাটিতে পড়ার পর জমে কঠিন বরফের আস্তরণ তৈরি করছে। নরম তুষার খুঁড়ে ঘাস বের করা বল্গা হরিণের জন্য সহজ, কিন্তু ইস্পাতের মতো কঠিন বরফ ভেঙে খাবার জোগাড় করা তাদের পক্ষে অসম্ভব। খাদ্যাভাব, অনাহার আর ক্লান্তিতে হাজার হাজার বল্গা হরিণ মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে।
এই চিত্রটি কেবল প্রকৃতির বিপন্নতার গল্প নয়। এটি একটি সতর্কবার্তা। সুমেরুর এই গলতে থাকা বরফের নিচেই চাপা পড়ে আছে আধুনিক সভ্যতার ‘লোভ’। আর সেই লোভ থেকেই জন্ম নিচ্ছে একুশ শতকের সবচেয়ে ভয়াবহ ভূ-রাজনৈতিক সংঘাত। যখন বল্গা হরিণেরা খাবারের অভাবে ধুঁকছে, তখন হাজার মাইল দূরে ওয়াশিংটন, বেইজিং আর মস্কোতে সামরিক পরিকল্পনাকারীরা মানচিত্রের ওপর ঝুঁকে হিসাব কষছেন—কে আগে দখল করবে এই গলতে থাকা পৃথিবীর নতুন সম্পদ?
প্রকৃতির প্রতিশোধ—‘রেইন অন স্নো’ এবং বাস্তুতন্ত্রের ধস
বিজ্ঞানীরা একে বলছেন ‘ইকোলজিক্যাল কোলাপ্স’ বা বাস্তুতন্ত্রের পতন। আর্কটিক অঞ্চলের উষ্ণায়নের হার পৃথিবীর অন্যান্য অংশের তুলনায় প্রায় চার গুণ বেশি। গত বছর, অর্থাৎ ২০২৫ সালের আগস্টে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, সুমেরুতে ‘রেইন অন স্নো’ বা তুষারের ওপর বৃষ্টির ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে।
স্বাভাবিক নিয়মে সুমেরুতে শীতকালে তাপমাত্রা হিমাঙ্কের অনেক নিচে থাকার কথা। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এখন মাঝশীতেও তাপমাত্রা হিমাঙ্কের ওপরে উঠে যাচ্ছে। ফলে আকাশ থেকে তুষারের বদলে ঝরছে বৃষ্টি। এই বৃষ্টির পানি যখন আগে থেকে জমে থাকা তুষারের স্তরের ওপর পড়ে, তখন তা চুইয়ে নিচে চলে যায় এবং পরবর্তীকালে তাপমাত্রা কমলে তা জমে কঠিন বরফের চাঁইয়ে পরিণত হয়।
জীববিজ্ঞানী এবং স্থানীয় ইনুইট বা সামি পশুপালকদের জন্য এটি এক বিভীষিকা। নরওয়ের স্ভালবার্ড দ্বীপপুঞ্জ থেকে শুরু করে রাশিয়ার ইয়ামাল উপদ্বীপ পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকায় বল্গা হরিণ ও ক্যারিবু তাদের প্রধান খাদ্য উৎস ‘লাইকেন’ (এক ধরনের শৈবাল) আর খুঁজে পাচ্ছে না। বরফের বর্ম ভেদ করে খাবারের কাছে পৌঁছাতে না পেরে অনাহারে মারা যাচ্ছে হাজার হাজার প্রাণী।
স্ভালবার্ডের এক স্থানীয় গবেষক বলেন, “আমরা আগে এমনটা কালেভদ্রে দেখতাম। এখন এটা প্রতি শীতের রুটিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। হরিণের খুর দিয়ে বরফ ভাঙার চেষ্টা করতে করতে রক্তাক্ত হয়ে যাচ্ছে, তবু খাবার মিলছে না। প্রকৃতির এই নীরব কান্না বাইরের পৃথিবী শুনতে পাচ্ছে না।”
কিন্তু সুমেরুর এই পরিবর্তন শুধু হরিণের মৃত্যুর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। পারমাফ্রস্ট বা হাজার বছর ধরে জমে থাকা মাটি গলতে শুরু করেছে। এর ফলে মাটির নিচে আটকে থাকা লক্ষ লক্ষ টন মিথেন গ্যাস বায়ুমণ্ডলে মিশছে, যা কার্বন ডাই-অক্সাইডের চেয়েও বহুগুণ বেশি ক্ষতিকর গ্রিনহাউস গ্যাস। এটি বৈশ্বিক উষ্ণায়নকে আরও ত্বরান্বিত করছে। ইনুইট সম্প্রদায়ের ঘরবাড়ি দেবে যাচ্ছে, উপকূলীয় গ্রামগুলো সমুদ্রগর্ভে বিলীন হওয়ার পথে। অথচ, এই ধ্বংসযজ্ঞের মাঝেই একদল মানুষ দেখছে অকল্পনীয় মুনাফার সুযোগ।

বরফের নিচে লুকানো গুপ্তধন—সম্পদ আহরণের উন্মাদনা
“মালিকানার সঙ্গে একটি যে সুবিধা আসে, তা হলো ভূগর্ভস্থ বিপুল সম্পদের ওপর অধিকার। বরফে জমা দেশটি উষ্ণ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেসব সম্পদ উন্মুক্ত হয়ে যেতে পারে।”—এই দর্শনটিই এখন আর্কটিকের রাজনীতিকে চালিত করছে।
মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ-এর তথ্যমতে, বিশ্বের এখনও আবিষ্কৃত হয়নি এমন তেল ও গ্যাসের ভাণ্ডারের প্রায় ১৩ শতাংশ তেল এবং ৩০ শতাংশ প্রাকৃতিক গ্যাস সুমেরু অঞ্চলের বরফের নিচে রয়েছে। কিন্তু তেল-গ্যাসই এখন আর একমাত্র লক্ষ্য নয়। একুশ শতকের প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতির প্রাণভোমরা হলো ‘বিরল খনিজ’।
আপনার হাতের স্মার্টফোন থেকে শুরু করে বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যাটারি, বায়ুবিদ্যুতের টারবাইন, এমনকি অত্যাধুনিক মিসাইল গাইডেন্স সিস্টেম—সবকিছুর জন্য প্রয়োজন নিওডিমিয়াম, ডিসপ্রোসিয়াম, টারবিয়াম এবং লিথিয়ামের মতো খনিজ উপাদান। আর বিস্ময়করভাবে, গ্রিনল্যান্ডের মাটির নিচে রয়েছে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ বিরল খনিজের মজুদ।
এতদিন চীন বিশ্বের বিরল খনিজ বাজারের প্রায় ৯০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করত। কিন্তু পশ্চিমারা, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র, এই নির্ভরতা কমাতে মরিয়া। গ্রিনল্যান্ডের কুয়ানারসুইট বা যা আগে ‘ক্ভানেফজেল্ড’ নামে পরিচিত ছিল, সেখানে ইউরেনিয়াম এবং বিরল খনিজের বিশাল খনি নিয়ে বিতর্ক চলছে দীর্ঘদিন ধরে। পরিবেশবাদীরা এর বিরোধিতা করলেও, ভূ-রাজনীতির দাবা খেলায় এই খনিগুলো একেকটি ট্রাম্পকার্ড।
ট্রাম্প প্রশাসনের চোখের দিকে তাকালে বোঝা যায়, কেন তারা গ্রিনল্যান্ডের দিকে এমন লোলুপ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন ‘গ্রিনল্যান্ড বিষয়ক বিশেষ দূত’ নিয়োগ দেন, তখন ডেনমার্ক এবং গ্রিনল্যান্ডের স্থানীয় সরকার তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিল। কিন্তু ট্রাম্পের যুক্তি সরল—তিনি একজন আবাসন ব্যবসায়ী থেকে প্রেসিডেন্ট হয়েছেন। তাঁর কাছে গ্রিনল্যান্ড কোনো দেশ বা সংস্কৃতি নয়, এটি একটি ‘রিয়েল এস্টেট ডিল’।
ট্রাম্পের বলয়ে থাকা প্রযুক্তিজগতের ধনকুবেররা এবং অন্ধ জাতীয়তাবাদীরা (তাঁকে বুঝিয়েছেন যে, গ্রিনল্যান্ড হলো আমেরিকার ভবিষ্যৎ অর্থনীতির চাবিকাঠি। যদি আমেরিকা এটি নিয়ন্ত্রণ না করে, তবে চীন করবে। আর ট্রাম্পের কাছে ‘জেতা’ মানেই প্রতিপক্ষকে ‘হারানো’। তাই পরিবেশগত বিপর্যয় বা স্থানীয় মানুষের অধিকার—কোনো কিছুই তাঁর কাছে মুখ্য নয়। তিনি ইউক্রেনে নিরাপত্তা দেওয়ার বিনিময়ে খনিজ সম্পদ চেয়েছিলেন, গাজার ধ্বংসস্তূপের ওপর হোটেল বানানোর স্বপ্ন দেখেছিলেন। গ্রিনল্যান্ডের ক্ষেত্রেও তাঁর সমীকরণ একই—সুরক্ষা দেব, বিনিময়ে সম্পদ নেব।
নতুন বাণিজ্য পথ—উত্তরের মহাসড়ক
জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সুমেরুতে যে পরিবর্তন আসছে, তার সবচেয়ে বড় কৌশলগত প্রভাব পড়ছে সমুদ্রপথের ওপর। ২০৪০-এর দশকের শুরুর দিকে গ্রীষ্মকালে সুমেরু মহাসাগর প্রায় বরফমুক্ত হয়ে যাওয়ার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। তবে এর আগেই, অর্থাৎ এখনই বছরের একটি বড় সময় ধরে উত্তর সাগরপথ এবং উত্তর-পশ্চিম পথ চলাচলের উপযোগী হয়ে উঠছে।
ঐতিহ্যগতভাবে এশিয়া থেকে ইউরোপে পণ্য পরিবহনের জন্য সুয়েজ খাল ব্যবহার করা হয়। কিন্তু রাশিয়ার ওপর দিয়ে যাওয়া নর্দার্ন সি রুট বা এনএসআর ব্যবহার করলে এই দূরত্ব প্রায় ৪০ শতাংশ কমে যায়। উদাহরণস্বরূপ, সাংহাই থেকে হামবুর্গ যেতে সুয়েজ খাল দিয়ে পাড়ি দিতে হয় প্রায় ২০,০০০ কিলোমিটার। কিন্তু উত্তরের পথ দিয়ে গেলে তা কমে দাঁড়ায় মাত্র ১৪,০০০ কিলোমিটারে। এর অর্থ জ্বালানি সাশ্রয়, সময় সাশ্রয় এবং দ্রুত পণ্য পরিবহন।
চীন নিজেকে ‘নিয়ার-আর্কটিক স্টেট’ বা সুমেরুর নিকটবর্তী রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করেছে। তারা এই নতুন পথকে তাদের ‘পোলার সিল্ক রোড’-এর অংশ হিসেবে দেখছে। বেইজিংয়ের পরিকল্পনা হলো, বরফ গলে গেলে তাদের বিশাল বাণিজ্যিক জাহাজগুলো রাশিয়ার সহযোগিতায় এই পথে ইউরোপ ও আমেরিকায় যাতায়াত করবে।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র এবং তার মিত্ররা এই সম্ভাবনাকে দেখছে এক বিশাল হুমকি হিসেবে। কারণ, এই পথের নিয়ন্ত্রণ যার হাতে থাকবে, বিশ্ব বাণিজ্যের একটি বড় অংশের চাবিকাঠিও তার হাতে থাকবে। এই কারণেই কানাডা এবং রাশিয়ার মধ্যবর্তী এই বরফশীতল জলরাশি নিয়ে শুরু হয়েছে এক নতুন প্রতিযোগিতা।
যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর প্রধান, অ্যাডমিরাল এবং রয়্যাল নেভির ফার্স্ট সি লর্ড জেনারেল স্যার গুইন জেনকিন্স গত বছরের শেষের দিকে (২০২৫) একাধিক বক্তব্যে এই নিয়ে সতর্ক করেছেন। তিনি স্পষ্টভাবে বলেছেন, “জলবায়ু সংকটের কারণে উত্তর মেরুতে বরফ গলে যাওয়ার বিষয়টি এক তীব্র প্রতিযোগিতার সূচনা করেছে। এই প্রতিযোগিতাটি বরফমুক্ত হতে থাকা সুমেরু অঞ্চলে সম্পদ, ভূখণ্ড এবং আটলান্টিকে প্রবেশের কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ পথ নিয়ে।”
তাঁর এই বক্তব্য কোনো সাধারণ সতর্কবার্তা নয়। মানচিত্রের দিকে তাকালে দেখা যায়, রাশিয়া এবং নরওয়ের উপকূল ঘেঁষে আটলান্টিক মহাসাগরে প্রবেশের পথটি ন্যাটো জোটের নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একে বলা হয় ‘জিআইইউকে গ্যাপ’ (GIUK Gap — Greenland, Iceland, UK)। রুশ সাবমেরিনগুলো যদি বরফহীন সুমেরু দিয়ে অবাধে আটলান্টিকে ঢুকে পড়তে পারে, তবে তা ইউরোপ এবং আমেরিকার নিরাপত্তার জন্য চরম ঝুঁকির কারণ হবে।

সামরিকীকরণ—বরফের বুকে বারুদ
২০২৫ সাল জুড়ে আর্কটিক অঞ্চলে যে সামরিক তৎপরতা দেখা গেছে, তা স্নায়ুযুদ্ধের পর আর কখনো দেখা যায়নি। রাশিয়া তাদের উত্তরাঞ্চলীয় নৌবহর বা নর্দার্ন ফ্লিটকে ঢেলে সাজিয়েছে। ইউক্রেন যুদ্ধে বিপুল ক্ষয়ক্ষতির পরেও, রাশিয়া সুমেরু থেকে তাদের মনোযোগ সরায়নি। বরং, পেচেঙ্গা (Pechenga) এবং কোলা উপদ্বীপের মতো কৌশলগত স্থানগুলোতে তারা নতুন করে সেনা মোতায়েন করেছে।
স্যাটেলাইট ইমেজে দেখা গেছে, রাশিয়ার আর্কটিক উপকূল বরাবর পুরোনো সোভিয়েত ঘাঁটিগুলোকে আধুনিকায়ন করা হয়েছে। সেখানে বসানো হয়েছে অত্যাধুনিক রাডার সিস্টেম, অ্যান্টি-এয়ারক্রাফট মিসাইল এবং হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র। রাশিয়ার হাতে রয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় আইসব্রেকার বা বরফকাটা জাহাজের বহর। তাদের ‘প্রজেক্ট ২২২২০’ পারমাণবিক শক্তিচালিত আইসব্রেকারগুলো—যেমন ‘আরক্তিকা’, ‘সিবির’ এবং ‘ইউরাল’—এখন সুমেরুর বরফ ভেঙে তাদের রণতরীগুলোর জন্য পথ তৈরি করছে।
এর বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্র এবং ন্যাটো পিছিয়ে নেই। নরওয়ে এবং ফিনল্যান্ড ন্যাটোতে যোগ দেওয়ার পর সুমেরুর সমীকরণ বদলে গেছে। আর্কটিক কাউন্সিলের ৮টি সদস্য দেশের মধ্যে ৭টিই এখন ন্যাটোর সদস্য (রাশিয়া ছাড়া)। এটি রাশিয়াকে কোণঠাসা করে ফেললেও, একই সঙ্গে তাদের আরও আক্রমণাত্মক করে তুলেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের আলাস্কা থেকে নরওয়ের স্ভালবার্ড পর্যন্ত ন্যাটো এখন নিয়মিত সামরিক মহড়া চালাচ্ছে। মার্কিন সাবমেরিনগুলো বরফের নিচ দিয়ে টহল দিচ্ছে। আর গ্রিনল্যান্ডের থুলি এয়ার বেস—যা আমেরিকার সবচেয়ে উত্তরের সামরিক ঘাঁটি—সেটির গুরুত্ব এখন বহুগুণ বেড়ে গেছে। এই ঘাঁটি থেকেই আমেরিকা মহাকাশ নজরদারি চালায় এবং রাশিয়ার মিসাইল হামলার আগাম সতর্কবার্তা পায়। ট্রাম্প প্রশাসন জানে, গ্রিনল্যান্ডের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারালে আমেরিকার মিসাইল ডিফেন্স সিস্টেম অন্ধ হয়ে যেতে পারে।
ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত এই ভূখণ্ডে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় থেকেই মার্কিন সেনা মোতায়েন রয়েছে। ১৯৪৬ সালে প্রেসিডেন্ট হ্যারি ট্রুম্যান ১০০ মিলিয়ন ডলার মূল্যে গ্রিনল্যান্ড কিনে নেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তখন ডেনমার্ক তা প্রত্যাখ্যান করে। এখন ট্রাম্প বা তাঁর উপদেষ্টারা যখন আবার সেই প্রস্তাব তোলেন বা সামরিক উপস্থিতির কথা বলেন, তখন তা কোনো পাগলামি নয়, বরং সুচিন্তিত ভূ-কৌশলগত চাল।
গ্রিনল্যান্ড—রাজনীতির দাবার ঘুঁটি নাকি স্বাবলম্বী রাষ্ট্র?
গ্রিনল্যান্ডের রাজধানী নুক-এ পার্লামেন্ট ভবনের সামনে দাঁড়ালে আপনি অদ্ভুত এক নীরবতা অনুভব করবেন। কিন্তু এই নীরবতার নিচেই ফুটছে রাজনীতির লাভা। ৫৬,০০০ মানুষের এই দ্বীপটি এখন বিশ্বের পরাশক্তিগুলোর টানাটানির কেন্দ্রবিন্দু।
স্থানীয় ইনুইটরা দীর্ঘদিন ধরে স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখছে। ডেনমার্কের কাছ থেকে সম্পূর্ণ স্বাধীনতা পেলে তারা নিজেদের মতো করে দেশ চালাতে পারবে। কিন্তু স্বাধীনতা মানেই অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা প্রয়োজন। বর্তমানে গ্রিনল্যান্ডের অর্থনীতির বড় অংশ চলে ডেনমার্কের অনুদানে। স্বাধীনতা পেতে হলে তাদের আয়ের বিকল্প উৎস লাগবে। আর সেই বিকল্প হলো—খনিজ সম্পদ আহরণ এবং পর্যটন।
এখানেই তৈরি হয়েছে এক জটিল জট। খনি খুঁড়লে পরিবেশ নষ্ট হবে, যা ইনুইটদের ঐতিহ্যবাহী জীবনযাত্রার বিরোধী। আবার খনি না খুঁড়লে অর্থনৈতিক স্বাধীনতা আসবে না। চীন এবং যুক্তরাষ্ট্র—উভয়েই এই দুর্বলতার সুযোগ নিতে চাইছে। চীন বিনিয়োগের প্রস্তাব নিয়ে আসছে, বিমানবন্দর বানিয়ে দিচ্ছে, খনিতে টাকা ঢালছে। যুক্তরাষ্ট্র পাল্টা প্রস্তাব দিচ্ছে—নিরাপত্তা এবং বিনিয়োগের।
হোয়াইট হাউস বা ক্রেমলিন—কেউই গ্রিনল্যান্ডের মানুষের ভালো চায় না। তারা চায় গ্রিনল্যান্ডের অবস্থান এবং সম্পদ। পুতিনের কৌশল ধার করে ওয়াশিংটন হয়তো গ্রিনল্যান্ডের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে উসকে দিতে পারে। সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচার চালিয়ে ডেনমার্কের বিরুদ্ধে জনমত তৈরি করা এবং তারপর ‘ত্রাণকর্তা’ হিসেবে আবির্ভূত হওয়া—আধুনিক হাইব্রিড যুদ্ধের পরিচিত কৌশল।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সম্প্রতি বলেছেন, লক্ষ্য গ্রিনল্যান্ড আক্রমণ করা নয়। কিন্তু তাঁর কথা আর ট্রাম্পের টুইট বা সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টের মধ্যে ফারাক বিস্তর। ট্রাম্প গত সপ্তাহে অভিযোগ করেছেন যে গ্রিনল্যান্ডের “সর্বত্র চীনা ও রুশ জাহাজে ভর্তি”। এটি আদতে সত্য না হলেও, নিজের সমর্থকদের উত্তেজিত করতে এবং আগ্রাসী পদক্ষেপের যৌক্তিকতা তৈরি করতে এমন ডাহা মিথ্যা বলা তাঁর পুরোনো অভ্যাস।

একটি নৈতিক সংকট এবং মানবজাতির ভবিষ্যৎ
এই পুরো পরিস্থিতির মধ্যে সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো নৈতিকতার মৃত্যু। যখন বিজ্ঞানীরা বলছেন যে ২০৪০ সালের মধ্যে সুমেরু বরফমুক্ত হবে, তখন বিশ্বনেতাদের উচিত ছিল আতঙ্কে হাত-পা গুটিয়ে না বসে কার্বন নিঃসরণ কমানোর জন্য যুদ্ধ ঘোষণা করা। অথচ, তাঁরা উল্টো খুশি হচ্ছেন। বরফ গলছে? ভালো! জাহাজ চলবে। খনিজ পাওয়া যাবে। তেল তোলা যাবে।
এটি যেন নিজের ঘর পুড়তে দেখে সেই আগুনের তাপে বারবিকিউ পার্টি করার মতো ঘটনা। ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রকে আন্তর্জাতিক জলবায়ু উদ্যোগ থেকে সরিয়ে নেওয়ার হুমকি দিয়েছেন বারবার। তাঁর কাছে জলবায়ু পরিবর্তন কোনো সংকট নয়, বরং একটি ব্যবসায়িক সুযোগ।
কিন্তু এই সুযোগের মাশুল গুনবে কে? মাশুল গুনবে বাংলাদেশের মতো বদ্বীপ রাষ্ট্রগুলো, মালদ্বীপের মতো দ্বীপদেশগুলো। সুমেরুর বরফ গলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়লে নোনাজলে তলিয়ে যাবে বিশ্বের নিচু এলাকাগুলো। যখন নিউইয়র্ক বা লন্ডনের উপকূল রক্ষা করতে বিলিয়ন ডলারের বাঁধ দেওয়া হবে, তখন সুন্দরবনের বাঘ কিংবা বরিশালের কৃষকের কী হবে?
উত্তপ্ত পৃথিবী সবচেয়ে ভয়াবহ হবে প্রান্তিক সেই মানুষদের জন্য, যাদের মরুময় জমিতে আর কোনো ফসল ফলবে না। নিচু জনপদগুলো মাথা জাগিয়ে রাখতে লড়ে চলবে। ঝড়ে ছিন্নভিন্ন হবে দরিদ্র জনপদ। সৌভাগ্যবান নাতিশীতোষ্ণ ইউরোপের অঞ্চলগুলোর চেয়ে তারাই ভুগবে বেশি।
ধ্বংসের কিনারায় দাঁড়িয়ে
গ্রিনল্যান্ডের বরফ কেবল পানি নয়, এটি পৃথিবীর ইতিহাসের এক বিশাল আর্কাইভ। লক্ষ বছরের জলবায়ুর ইতিহাস জমা আছে এই বরফের স্তরে। সেই ইতিহাস গলে যাচ্ছে। আর সেই গলিত ইতিহাসের ওপর দাঁড়িয়ে আমরা লড়ছি আগামীদিনের যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে।
বল্গা হরিণের মৃত্যু দিয়ে যে প্রতিবেদনের শুরু হয়েছিল, তার শেষটা কোনো আশার বাণী দিয়ে করা কঠিন। কারণ, ২০২৬ সালের এই সময়ে দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছে, মানুষ প্রকৃতির সতর্কবার্তা শোনার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে।
যুক্তরাষ্ট্র, চীন বা রাশিয়া—যেই জিতুক না কেন, এই যুদ্ধে আসল পরাজিত হবে পৃথিবী। সুমেরুর ওই সাদা ভাল্লুকটি, যে এখন বরফের অভাবে সাঁতরাতে সাঁতরাতে ক্লান্ত হয়ে ডুবে মারা যাচ্ছে, সে হয়তো আমাদের ভবিষ্যতেরই প্রতিচ্ছবি। আমরা সম্পদের লোভে যে বরফ গলিয়ে দিচ্ছি, সেই পানিই একদিন আমাদের ডুবিয়ে মারবে।
কাজেই আর কিছু না হোক, বিপদাপন্ন গ্রিনল্যান্ড আমাদের মনে করিয়ে দিক যে জলবায়ু সংকটের ভূ-রাজনৈতিক পরিণতিগুলো আমরা বুঝতেই শুরু করিনি। বাড়তে থাকা তাপমাত্রা আর তার পরিণতিকে ঠেকাতে আমরা যতটুকু করতে পারি, ততটুকুই গুরুত্বপূর্ণ। ইচ্ছেমতো ক্ষতি যা করা হয়েছে, সেটা আর ফেরানো যাবে না। এখন এটুকুই ভরসা—যদি ধ্বংসের কিনারায় দাঁড়িয়েও মানুষের শুভবুদ্ধির উদয় হয়। তবে ঘড়ির কাঁটা টিক-টিক করছে, আর বরফ গলছে অবিরাম।