গাছের মগডালে পাহারাঘর, নিচে বিক্রি হতো মানুষ
রঙ্গীখালীর পাহাড় যা বলে গেল

টেকনাফের রঙ্গীখালীর পাহাড়ে একটি গাছ। মাটি থেকে অনেক উঁচুতে তার ডালপালার ফাঁকে বাঁধা কাঠের মাচা। মাথার ওপর কালো ত্রিপলের ছাউনি, মাচায় বিছানো একটি চাদর।
দূর থেকে দেখলে মনে হয় পাখির বড় একটা বাসা। আসলে ওটা মানুষের বানানো ঘর।
আইএসপিআরের দেওয়া ছবিতে এই মাচাঘর ধরা পড়েছে শনিবারের অভিযানে। মানবপাচারকারী চক্রের যে আস্তানা যৌথ বাহিনী গুঁড়িয়ে দিয়েছে, তার ঠিক পাশেই দাঁড়িয়ে আছে গাছটি। ড্রোন থেকে তোলা ছবিতেও দেখা যায়, পুড়ে যাওয়া ঝুপড়িগুলোর এক কোণে সবুজের মধ্যে কালো ত্রিপলের ছোট্ট একটা বিন্দু।
এত উঁচুতে কেন ঘর? গাছটির চারপাশে খোলা ঢাল, পেছনে ঘন পাহাড়। মাচায় বসলে নিচের পথ, আস্তানার উঠান আর আশপাশের ঢাল একসঙ্গে চোখে পড়ার কথা। পাহাড়ে কে আসছে, কোন দিক দিয়ে আসছে, সেটা নজরে রাখার জন্যই এমন মাচা বানানো হয় বলে ধারণা করা যায়।
আর নিচে যাঁদের ওপর নজর রাখা হতো, তাঁদের গল্প আরও ভারী।
পাহারার নিচে যাঁরা ছিলেন
চট্টগ্রামের বাঁশখালীর তারেকুল ইসলামের বয়স ২৩। রাজমিস্ত্রির কাজ করতেন। দুজন রোহিঙ্গা যুবক টেকনাফের রোহিঙ্গা শিবিরে সেতু তৈরির কাজ দেওয়ার কথা বলে তাঁকে নিয়ে যান, তারপর বাহারছড়ার বড়ডেইল হয়ে তোলা হয় গহিন পাহাড়ের একটি আস্তানায়।
২ নভেম্বর থেকে তিনি সেখানে বন্দী ছিলেন। খাবার বলতে বেশির ভাগ দিন জুটত লাউ আর ডাল। একই ঘরে তাঁর সঙ্গে আটকে ছিলেন আরও ৫৫ থেকে ৬০ জন।
ফেনীর দাগনভূঞার নুর কামাল (২১) এসেছিলেন একটি স্বপ্ন নিয়ে। একজন তাঁকে একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত করেন। সেখানে বলা হয়, বিনা খরচে মালয়েশিয়া নেওয়া হবে, পৌঁছানোর পর টাকা দিলেই চলবে। সেই স্বপ্ন তাঁকে নিয়ে গেছে টেকনাফের পাহাড়ের ঝুপড়িতে। তিনি জানান, অস্ত্র হাতে ১০ থেকে ১২ জন সারাক্ষণ পাহারায় থাকতেন। কেউ মুখ খুললেই মারধর।
উখিয়ার সাইফুল ইসলামের অভিজ্ঞতা আরও কঠিন। পাচারকারীদের মুখেই তিনি শুনেছেন, তাঁকে ও আরেকজনকে এক লাখ টাকায় কেনা হয়েছে। পাঁচ দিনে তিনি দেখেছেন, প্রতিদিন চার-পাঁচজন করে নতুন মানুষ এনে জড়ো করা হচ্ছে। পালানোর চেষ্টা করায় মারধরের পর তাঁদের লোহার শিকলে বেঁধে রাখা হয়।
ফরিদপুরের সালথার এস এম আসাদুজ্জামানের (৫০) বর্ণনায় উঠে এসেছে চক্রটির হাতবদলের দাম। কাজ দেওয়ার কথা বলে কুতুপালং থেকে নিয়ে গিয়ে রাতে অটোরিকশায় পাহাড়ে তুলে মাত্র ১০ হাজার টাকায় তাঁকে পাচারকারীদের হাতে তুলে দেওয়া হয়। পরে দুই লাখ টাকায় মুক্তির মৌখিক চুক্তিও করেন তিনি।
একজন মানুষের দাম কখনো ১০ হাজার, কখনো এক লাখ, কখনো দুই লাখ টাকা। মাচাঘরের পাহারা ছিল এই বাজার আগলে রাখার জন্য।
পরিকল্পনাও ছিল তৈরি। বন্দীদের বৃহস্পতিবার রাতেই ট্রলারে তুলে সাগরপথে মালয়েশিয়ায় পাঠানোর কথা ছিল।
সেই রাত আর আসেনি।

যে বিকেলে পাহারা ভেঙে পড়ে
গোয়েন্দা সূত্রে খবর আসে, রঙ্গীখালীর গহিন পাহাড়ে প্রায় ১২০ জন রোহিঙ্গা ও বাঙালিকে জিম্মি করে রেখেছে ১৫-১৬ জনের একটি সশস্ত্র দল। সেনাবাহিনীর ১০ পদাতিক ডিভিশন, বিজিবি ও পুলিশের যৌথ দল বৃহস্পতিবার বিকেল আনুমানিক ৫টায় সেখানে পৌঁছায়।
উপস্থিতি টের পেয়েই পাচারকারীরা এলোপাতাড়ি গুলি ছুড়তে শুরু করে। গোলাগুলির একপর্যায়ে সৈনিক মো. তিতাস শেখের (২৭) বাঁ কাঁধে গুলি লাগে। রামুর সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
২৭ বছরের এক তরুণ ফিরলেন না। তাঁর বিনিময়ে ঘরে ফিরলেন আরেক দল তরুণ, যাঁদের অনেকে তাঁরই বয়সী।
অভিযানে ৫৭ জনকে জীবিত উদ্ধার ও চক্রের পাঁচ সদস্যকে আটক করা হয়। জব্দ হয় একটি পিস্তল, একটি দেশীয় বন্দুক ও চার রাউন্ড গোলাবারুদ। টেকনাফ থানার পরিদর্শক (তদন্ত) সুকান্ত চৌধুরী জানান, উদ্ধার হওয়াদের একজনকে পাচারকারী হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে, বাকি ৫৬ জন ভুক্তভোগী। নাম-ঠিকানা যাচাই করে ৩৭ জনকে পরিবারের কাছে ফেরত দেওয়া হয়েছে।
দুই দিন পর, শনিবার সকাল ৭টা থেকে বেলা ১১টা পর্যন্ত, সেনাবাহিনী, বিজিবি, এসআরবি ও পুলিশের সমন্বিত দল আবার ওঠে হ্নীলা ইউনিয়নের সেই পাহাড়ে। আইএসপিআর জানায়, আস্তানাটি চারদিক থেকে ঘিরে তল্লাশি চালিয়ে কিছু খালি কার্তুজ ও সরঞ্জাম পাওয়া যায়। তারপর পুরো আস্তানা ধ্বংস করে দেওয়া হয়।
ছবিতে দেখা যায়, পোড়া পলিথিন, বাঁশের খুঁটির কঙ্কাল, খুঁটিতে ঝুলে থাকা একটি রঙিন জামা। উঁচু গাছটি তখনো দাঁড়িয়ে, মাচাঘরটিও।

একটি গাছ, অনেক প্রশ্ন
রঙ্গীখালী এই প্রথম শিরোনামে আসেনি। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে এই একই এলাকার পাহাড়ে রাতভর অভিযান চালিয়ে বিজিবি বিপুল অস্ত্র, গোলাবারুদ, মর্টারের শেল ও গ্রেনেড উদ্ধার করেছিল। পাহাড় একবার খালি হলে অন্য দল এসে আবার জায়গা নেয়, এমন চক্র এখানে বারবার দেখা গেছে।
ক্ষতিটা শুধু পাচার হতে যাওয়া মানুষের নয়। স্থানীয় বাসিন্দা ও পুলিশের তথ্য বলছে, গত তিন বছরে টেকনাফের বিভিন্ন এলাকা থেকে অন্তত ৩২০ জন অপহরণের শিকার হয়েছেন।
হ্নীলা ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আলী সতর্ক করেছেন সময় নিয়েও। তাঁর ভাষ্য, পাহাড়ে সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতা বাড়ছে, আর শীত মৌসুমে মানবপাচারকারীদের আনাগোনাও বেড়ে যায়। নভেম্বর মানে সাগর শান্ত হওয়ার শুরু, ট্রলার ছাড়ার মৌসুমের শুরু।
তাহলে পথ কী?
গাছের মাচাটি নিজেই একটা উত্তর দেয়। চক্রটি টিকে ছিল নজরদারির ওপর। তারা আগে দেখতে পেত, তাই আগে সরে যেতে পারত। যৌথ বাহিনীর ধারাবাহিক অভিযান সেই সুবিধা ভাঙতে শুরু করেছে। আইএসপিআর জানিয়েছে, এমন সমন্বিত অভিযান অব্যাহত থাকবে।
কিন্তু পাহাড়ের ওপরের পাহারা ভাঙাই সব নয়। চক্রের শিকড় নেমে গেছে বহু দূরের গ্রামে, ফোনের পর্দায়।
তারেকুল এসেছিলেন বাঁশখালী থেকে, নুর কামাল ফেনী থেকে, আসাদুজ্জামান ফরিদপুর থেকে। কেউ এসেছেন কাজের আশ্বাসে, কেউ হোয়াটসঅ্যাপের একটি বার্তায়। “আগে যাও, পরে টাকা দিয়ো” বা “শিবিরে কাজ আছে”, এমন প্রস্তাব যে দরজা দিয়ে ঢোকে, সেটা বন্ধ করা যায় গ্রামেই। ইউনিয়ন পরিষদ, মসজিদ, স্কুল আর স্থানীয় অভিবাসন তথ্যকেন্দ্র থেকে এই বার্তা পৌঁছাতে পারে যে বৈধ পথে বিদেশ যাওয়া “বিনা খরচে” হয় না।
পাহাড়ের পাদদেশে যাঁরা একজন মানুষকে ১০ হাজার টাকায় তুলে দেন, সেই দালালদের শনাক্ত করাও জরুরি। উদ্ধার হওয়া মানুষের বর্ণনায় দালালদের নাম, পরিচয় আর হাতবদলের পথের হদিস রয়েছে। এই বয়ানগুলো মামলার তদন্তে কাজে লাগলে পাহাড়ের বাইরের চক্রটিও আইনের আওতায় আসার সুযোগ তৈরি হয়।
রঙ্গীখালীর আস্তানা এখন ছাই। মাচাঘরের নিচে আর কেউ বন্দী নেই।
তবে পাহাড়ে এমন গাছ আরও আছে। নতুন মাচা যেন আর না ওঠে, সেই পাহারা এখন শুধু পাহাড়ে নয়, শুরু করতে হবে গ্রামের দরজায় আর হাতের ফোনে।





আপনার মতামত লিখুন