খুঁজুন
, ,
রবিবার, ৮ই নভেম্বর ২০২৬
বিশ্লেষণ

রাগ কয়েক মিনিটের, বিষ কেন হাতের নাগালে?

রাগ কয়েক মিনিটের, বিষ কেন হাতের নাগালে?
মুদির তাক থেকে বিষ সরালেই বাঁচবে প্রাণ
রাসেল আহমেদ
নারায়ণগঞ্জ · ৮ নভেম্বর ২০২৬, ১৩:০০

ব্যাগে চাল, ডাল, এক প্যাকেট বিস্কুট। পাশের তাক থেকে নামানো আরও একটি ছোট প্যাকেট। নারায়ণগঞ্জের গ্রামীণ মুদি দোকানে এই দৃশ্য খুব সাধারণ। এত সাধারণ যে কেউ খেয়াল করেন না, ওই ছোট প্যাকেটটি খাবার নয়। ওটা গুদামের পোকা মারার কীটনাশক।

রান্নাঘরের এত কাছে এই বিষ থাকার দাম দিতে হচ্ছে প্রাণ দিয়ে। জেলা পুলিশ, থানা, সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালের রেকর্ড এবং অপমৃত্যুর নথি বিশ্লেষণ করে এ প্রতিবেদক দেখেছেন, ২০১৪ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত এক যুগে নারায়ণগঞ্জে কীটনাশক ও গ্যাস ট্যাবলেট সেবনে অন্তত ৭৪৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে রূপগঞ্জ, আড়াইহাজার ও সোনারগাঁও উপজেলাতেই গত ছয় বছরে মারা গেছেন ৩৪০ জনের বেশি।

তবে এই গল্প শুধু মৃত্যুর হিসাব নয়। এ গল্পে একটি আশার কথাও আছে। বাংলাদেশ এই লড়াইয়ে একবার জিতেছিল।

দেশ একবার পেরেছিল

নব্বইয়ের দশকে বাংলাদেশে কীটনাশকজনিত মৃত্যু ছিল ভয়াবহ। এরপর সরকার ধাপে ধাপে সবচেয়ে বিষাক্ত কীটনাশকগুলো নিষিদ্ধ করে। ২০০০ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার শ্রেণিবিন্যাসে সর্বোচ্চ বিষাক্ত (ক্লাস-১) সব কীটনাশক নিষিদ্ধ হয়।

ফল এসেছিল দ্রুত। অক্সফোর্ড, এডিনবরা ও সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজের গবেষকদের যৌথ গবেষণা বলছে, দেশে কীটনাশকে আত্মহত্যার হার প্রতি লাখে ১৯৯৬ সালের ৬.৩ থেকে ২০১৪ সালে ২.২-এ নেমে আসে, অর্থাৎ কমে প্রায় ৬৫ শতাংশ। গবেষকদের হিসাবে, নিষেধাজ্ঞার পরের বছরগুলোতে (২০০১ থেকে ২০১৪) আগের তুলনায় প্রায় ৩৫ হাজার কম মানুষ কীটনাশকে মারা গেছেন।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যটি হলো, এতে কৃষকের কোনো ক্ষতি হয়নি। গবেষণায় দেখা গেছে, এই নিয়ন্ত্রণ কৃষি উৎপাদনে কোনো ক্ষতিকর প্রভাব ফেলেনি। এই সাফল্য এখন আন্তর্জাতিক উদাহরণ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অর্থায়নে ল্যানসেটে প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে বাংলাদেশ, দক্ষিণ কোরিয়া ও শ্রীলঙ্কার নাম এসেছে সেই দেশগুলোর তালিকায়, যেখানে কয়েকটি বিপজ্জনক কীটনাশক নিষিদ্ধ করায় সামগ্রিক আত্মহত্যার হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।

অর্থাৎ পথটা আমাদের চেনা। অসমাপ্ত কাজটুকু এখন পড়ে আছে গ্রামের মুদি দোকানে।

রাগ কয়েক মিনিটের, বিষ হাতের কাছে

চলতি বছরের ১৮ এপ্রিল সন্ধ্যায় রূপগঞ্জের একটি গ্রামে পারিবারিক অভিমানের পর ৪০ বছর বয়সী এক গৃহিণী ঘরের পাশের মুদি দোকান থেকেই কীটনাশক কিনে আনেন। হাসপাতালে নেওয়ার আগেই তাঁর মৃত্যু হয়। গত বছরের সেপ্টেম্বরে পূর্বাচলের কাছে এক গ্রামে পারিবারিক টানাপোড়েনে ভেঙে পড়া এক যুবকের মৃত্যুর গল্পও একই। দুই ঘটনার মানুষ আলাদা, কিন্তু উৎস এক: পাড়ার দোকানের তাক।

গত বছরের ১১ অক্টোবর সোনারগাঁওয়ে এক দিনেই কীটনাশকে চারজনের মৃত্যু হয়, যাদের মধ্যে ছিল পাঁচ বছরের একটি শিশুও। সেই পরিবারের এক নানি এখনো প্রশ্নটা ছাড়তে পারেননি। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, “আমার মেয়েটা রাগের মাথায় এমন করছে। কিন্তু মুদি দোকানদার কীভাবে একটা মায়ের হাতে এই বিষ তুলে দিলো? ঘরের পাশের দোকানে যদি বিষ না পাওয়া যাইতো, তবে আজ আমার নাতি আর মেয়েটা বেঁচে থাকত।”

তাঁর এই কথার পক্ষে বিজ্ঞানও আছে। দক্ষিণ এশিয়ার তথ্য বলছে, কীটনাশকে মৃত্যুর ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ ক্ষেত্রে বিষটি কেনা হয় ঘটনার অল্প আগে, ওই উদ্দেশ্যেই। মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. সুরজিত কুমার তালুকদার বলেন, এ ধরনের সিদ্ধান্ত বেশির ভাগ সময় আসে প্রচণ্ড আবেগ আর ক্ষণিকের উত্তেজনা থেকে। তাঁর মতে, বিষ হাতের নাগাল থেকে সরানো গেলে এমন ক্ষণিকের মৃত্যুর অন্তত ৮০ শতাংশ ঠেকানো সম্ভব।

আন্তর্জাতিক গবেষকেরাও একই কথা বলছেন। নিষেধাজ্ঞা মানুষকে সংকট থেকে মুক্ত করেনি, কিন্তু পরবর্তী চেষ্টাগুলোকে অনেক কম প্রাণঘাতী করেছে, ফলে মৃত্যুর হার কমেছে। রাগ কেটে যায়, মানুষ বেঁচে থাকে।

২১ বাজার, অর্ধশত দোকান, একই চিত্র

এ প্রতিবেদক ক্রেতা সেজে রূপগঞ্জের নগরপাড়া, বেলদি, ভোলাব এবং আড়াইহাজারের গোপালদি, বিশনন্দিসহ ২১টি বাজারের অর্ধশতাধিক দোকানে গিয়েছেন। প্রতিটি দোকানেই কীটনাশক পাওয়া গেছে।

দোকানিরা অবশ্য বিষয়টি লুকান না, বরং অনেকে নিজেরাও অস্বস্তিতে আছেন। বেলদি বাজারের এক মুদি দোকানি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “ভাই, দুইডা টেকা লাভ অয়। বেডি মানুষ আহে চাউল ভালা রাখনের লেইগা। অহন নিয়া কী করে হেইডা তো জানি না। তয় এইডা বেচা ঠিক না।” বিশনন্দি বাজারের দোকানি মাসুম বিল্লাল সোজাসাপ্টা স্বীকার করেন, “সবজি ক্ষেতের লাইগা মানুষ চায়, তাই বেচি। আমাগো লাইসেন্স নাই।”

দোকানির এই অস্বস্তিটাই সমাধানের প্রথম সূত্র।

আইন এ বিষয়ে পরিষ্কার। বালাইনাশক (পেস্টিসাইডস) আইন, ২০১৮-এর ৯ ধারা অনুযায়ী, লাইসেন্স ছাড়া নিবন্ধিত ব্রান্ডের বালাইনাশক বিক্রয় করা যাবে না। আইনে পরিদর্শকের ক্ষমতা, প্রবেশ ও জব্দকরণ এবং মোবাইল কোর্টের এখতিয়ারের বিধানও রয়েছে। অর্থাৎ নতুন আইন লাগবে না। দরকার শুধু বিদ্যমান আইনকে মুদির তাক পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়া।

দোকানিই হতে পারেন প্রথম রক্ষাকবচ

এখানে শ্রীলঙ্কার অভিজ্ঞতা কাজে লাগতে পারে। দেশটি কীটনাশক বিক্রেতাদের “গেটকিপার” বা পাহারাদার হিসেবে প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। এই কর্মসূচিতে বিক্রেতারা শেখেন কীভাবে ঝুঁকিতে থাকা ক্রেতাকে চিনতে হয় এবং তাঁর হাতে কীটনাশক যাওয়া ঠেকাতে হয়। স্থানীয় আলোচনায় এই বিক্রেতাভিত্তিক পদ্ধতিই সবচেয়ে বেশি সমর্থন পেয়েছে, এবং প্রাথমিক সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে বিক্রেতারাও তা ভালোভাবে গ্রহণ করেছেন। কর্মসূচিটির কার্যকারিতা এখন বড় পরিসরের গবেষণায় যাচাই হচ্ছে।

শ্রীলঙ্কা থেকে আরেকটি শিক্ষাও আছে। শুধু ঘরে তালাবদ্ধ বাক্সে কীটনাশক রাখলেই কাজ হয় না। দেশটির ১৮০টি গ্রামে চালানো এক গবেষণায় নিরাপদ সংরক্ষণের ফলে বিষপানের ঘটনা কমার কোনো প্রমাণ মেলেনি। তাই উৎসেই, অর্থাৎ বিক্রির জায়গাতেই নিয়ন্ত্রণ সবচেয়ে কার্যকর।

নারায়ণগঞ্জে সেই কাজের প্রস্তুতিও দেখা যাচ্ছে। রূপগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আফরোজা সুলতানা জানান, খাদ্যপণ্যের দোকানে বিষ রাখা দণ্ডনীয় অপরাধ এবং এ বিষয়ে জিরো টলারেন্স নীতি নেওয়া হয়েছে। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আঃ জাঃ মুঃ আহসান শহীদ সরকার বলেন, কীটনাশক সাধারণ পণ্যের মতো খোলা বাজারে বিক্রির জিনিস নয়। ব্যবস্থার পাশাপাশি সচেতনতাও জরুরি।

রূপগঞ্জ থানার ওসি এএইচএম সালাউদ্দিন বলেন, হাতের নাগালে বিষ না পেলে তাৎক্ষণিক রাগ কমে গিয়ে অনেকেই বেঁচে যেতেন। অবৈধ বিক্রেতাদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। আড়াইহাজার থানার ওসি সবজেল হোসেনও কঠোর ব্যবস্থার কথা জানিয়েছেন। জেলা ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক হৃদয় রঞ্জন মল্লিক বলেন, শিগগিরই তাঁরা অভিযানে নামবেন।

যা করলে বদলাতে পারে চিত্র

সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য আর আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা মিলিয়ে কয়েকটি সহজ পদক্ষেপ সামনে আসে। কৃষি বিভাগ, পুলিশ ও ভোক্তা অধিকার অধিদপ্তর মিলে উপজেলাভিত্তিক যৌথ তদারকি চালাতে পারে, যাতে কীটনাশক কেবল লাইসেন্সধারী ডিলারের কাছেই থাকে। গুদামের পোকা দমনের মতো প্রকৃত প্রয়োজন মেটাতে লাইসেন্সধারী ডিলারের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত সেবা চালু করা যায়, যাতে সাধারণ গৃহস্থকে প্যাকেট কিনে ঘরে রাখতে না হয়। মুদি দোকানিদের নিয়ে ছোট সচেতনতা সভা করা যায়, যেখানে তাঁরা শিখবেন কেন এই পণ্য তাঁদের তাকে থাকা উচিত নয়। আর বিষক্রিয়ার রোগী যেন দ্রুত চিকিৎসা পান, সে জন্য উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোর প্রস্তুতি জোরদার করা যায়।

দুই দশক আগে বাংলাদেশ দেখিয়েছিল, নীতির একটি সিদ্ধান্ত হাজারো পরিবারকে শোক থেকে বাঁচাতে পারে। এবার সেই সিদ্ধান্তকে নিয়ে যেতে হবে পাড়ার মোড়ের ছোট দোকানটিতে, যেখানে চাল-ডালের পাশে এখনো জায়গা পেয়ে যায় বিষ।

কাঁচপুরের সেই নানির চাওয়াটাও এর বেশি কিছু নয়। তিনি চান, আর কোনো মা যেন রাগের মুহূর্তে পাশের দোকানে গিয়ে ওই প্যাকেটটি না পান।


মন খারাপ, হতাশা বা আত্মহত্যার চিন্তা এলে একা থাকবেন না। মানসিক সহায়তার জন্য “কান পেতে রই” হেল্পলাইনে কল করুন: ০৯৬১২-১১৯৯১১ (প্রতিদিন বিকেল ৩টা থেকে রাত ৩টা)। জরুরি প্রয়োজনে ৯৯৯।

আপনার মতামত লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রথমবার মন্তব্য করলে তা মন্তব্য নীতি অনুযায়ী যাচাইয়ের পর প্রকাশিত হয়।

বিশ্লেষণ থেকে আরও