সোমবার, ১৯ জানুয়ারি ২০২৬

সর্বশেষ

ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর রেকর্ড প্রবাসী আয়

নিজস্ব প্রতিবেদক

ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর প্রবাসী আয় বা বাংলাদেশের রেমিট্যান্স প্রবাহে বড় ধরনের উল্লস্ময়তা দেখা দিয়েছে। প্রবাসী বাংলাদেশীরা সেপ্টেম্বরে মোট ২৪০ কোটি বা ২.৪০ বিলিয়ন ডলারের রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন, যা দেশের মুদ্রায় ২৮,৮৫৭ কোটি টাকার সমান। এটি দেশের ইতিহাসে কোনো একক মাসে তৃতীয় সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স প্রবাহ।

বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে গতকাল প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, রেমিট্যান্সের এই উচ্চ প্রবাহ সাধারণত ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার মতো উৎসবের সময়েই দেখা যায়। তবে এবার বড় কোনো উৎসব ছাড়া এত বেশি পরিমাণ অর্থ প্রবাসীরা পাঠিয়েছেন।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, দেশে সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স এসেছে ২০২০ সালের জুলাইয়ে, যখন প্রবাসীরা করোনাভাইরাস মহামারীর মধ্যে রেকর্ড ২৫৯.৮২ কোটি ডলার পাঠিয়েছিলেন। সেই বছর ঈদুল আজহার ছুটি ১ আগস্ট থেকে শুরু হয়েছিল, যা রেমিট্যান্স বৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রাখে। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ২৫৩.৮৬ কোটি ডলার রেমিট্যান্স এসেছে ২০২৩ সালের জুনে, যেখানে ঈদুল আজহার ছিল গুরুত্বপূর্ণ।

শেখ হাসিনার সরকার পতনের পর ব্যাংক খাতের ক্ষত বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে। বেশ কিছু ব্যাংক গ্রাহকের চাহিদা অনুযায়ী আমানতের অর্থ ফেরত দিতে পারছে না। নতুন গভর্নর দায়িত্ব নেয়ার পর ১১টি বেসরকারি ব্যাংকের পর্ষদ ভেঙে দিয়েছেন। এই পরিস্থিতিতে প্রবাসীরা আতঙ্কিত হয়ে ব্যাংকবিমুখ হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু রেমিট্যান্স প্রবাহের চিত্র বলছে প্রবাসীরা বৈধ পথে অর্থ পাঠাতে উৎসাহী হয়েছেন।

মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, “রেমিট্যান্সের যে প্রবৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে, সেটি নতুন বাংলাদেশের সূচনা। প্রবাসীরা দেশের গণঅভ্যুত্থানকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন এবং দেশ গঠনে ভূমিকা রাখতে আগ্রহী।”

সৈয়দ মাহবুবুর রহমান আরও যোগ করেন, “প্রবাসীদের এই উৎসাহ ধরে রাখতে হলে সরকারকে কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে। দেশ সঠিক পথে পরিচালিত হলে প্রবাসীরা বৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠাতে আরো অনুপ্রাণিত হবেন। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বিমানবন্দরে প্রবাসীদের জন্য সেবার মান বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।”

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) প্রবাসীরা ৬.৫৪ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স দেশে পাঠিয়েছেন, যা গত বছরের একই সময়ে ৪.৯০ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় ৩৩.৩% বৃদ্ধি পেয়েছে।

সেপ্টেম্বরে রেমিট্যান্স আহরণের শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি, যেখান থেকে এসেছে ৪০.২৭ কোটি ডলার। দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে অগ্রণী ব্যাংক পিএলসি (৩২.২১ কোটি ডলার) এবং তৃতীয় স্থানে ট্রাস্ট ব্যাংক (২৪.৫৫ কোটি ডলার)।

ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুহাম্মদ মুনিরুল মওলা বলেন, “প্রবাসীরা দেশ পুনর্গঠনে ভূমিকা রাখতে উদগ্রীব। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর রেমিট্যান্স পাঠানোর মাধ্যমে তারা নিজেদের সমর্থন প্রকাশ করছেন। আশা করছি, আমাদের ব্যাংকের মাধ্যমে রেমিট্যান্স প্রবাহ আরো বাড়বে।”

সৌদি আরব ছিল বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ শ্রমবাজার, কিন্তু গত দুই বছরে সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে বেশি রেমিট্যান্স আসতে শুরু করেছে। রেমিট্যান্স আসার ক্ষেত্রে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে, এবং সৌদি আরব তৃতীয় স্থানে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স এসেছে ২০২০-২১ অর্থবছরে, যখন প্রবাসীরা রেকর্ড ২৪.৭৭ বিলিয়ন ডলার পাঠিয়েছিলেন। এর আগে ২০১৯-২০ অর্থবছরে ১৮.২০ বিলিয়ন ডলার, ২০২১-২২ অর্থবছরে ২১.০৩ বিলিয়ন ডলার এবং ২০২২-২৩ অর্থবছরে ২১.৬১ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়ে ২৩.৯১ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, চলতি অর্থবছরে এখন পর্যন্ত প্রতি মাসে গড়ে ২ বিলিয়ন ডলারের বেশি রেমিট্যান্স এসেছে। যদি এই প্রবৃদ্ধি বজায় থাকে, তাহলে রেমিট্যান্সে নতুন রেকর্ড স্থাপিত হবে।

পাঠকপ্রিয়