দেশের ব্যাংক খাত বর্তমানে এক অদ্ভুত দ্বৈততার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। একদিকে তারল্য সংকট মোকাবিলায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে রেকর্ড পরিমাণ ঋণ গ্রহণ, অন্যদিকে ইতিহাসের সর্বোচ্চ নিট মুনাফা প্রদর্শন। এছাড়া ঋণ খেলাপি ও মামলার জটিলতায় প্রায় ৬ লাখ কোটি টাকা আটকে আছে, যা ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা ঋণের প্রায় ৩৫ শতাংশ। এই বিপর্যয়কর পরিস্থিতি নিয়ে ব্যাংকিং খাতের সংশ্লিষ্টরা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
তারল্য সংকট মোকাবিলায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রেকর্ড ঋণ
২০২৩ সালে দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো তারল্য সংকট মেটাতে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে রেকর্ড ১৯ লাখ ২২ হাজার ৬০৪ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। বছরের শুরুতে ফেব্রুয়ারিতে এ ঋণের পরিমাণ ছিল ৮৪ হাজার ৪০৩ কোটি টাকা, যা ডিসেম্বরে বেড়ে ৩ লাখ ৩২ হাজার ৩৩১ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। রেপো, বিশেষ রেপো ও অ্যাশিউরড লিকুইডিটি সাপোর্ট (এএলএস) হিসেবে স্বল্পমেয়াদি এ ঋণ নেওয়া হয়েছে।
পূবালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আলী এ বিষয়ে বলেন, “দুর্বল হিসেবে পরিচিতি পাওয়া কিছু ব্যাংকে তারল্যের তীব্র সংকট ছিল। এ ব্যাংকগুলো কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ধার করে দৈনন্দিন লেনদেন মিটিয়েছে। আবার অতিরিক্ত তারল্য থাকা ব্যাংকগুলোও উচ্চ সুদে সরকারকে ঋণ দিয়ে সুযোগের সদ্ব্যবহার করেছে। কারণ রেপো রেটের তুলনায় ট্রেজারি বিল-বন্ডের সুদহার বেশি ছিল।”
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, রেপোর সুদহার ছিল ৬-৭ শতাংশ, যেখানে সরকারি ট্রেজারি বিল-বন্ডের গড় সুদহার ছিল প্রায় ১০ শতাংশ। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে ব্যাংকগুলো কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে স্বল্প সুদে ঋণ নিয়ে সরকারকে উচ্চ সুদে ঋণ দিয়েছে, যা তাদের মুনাফা বৃদ্ধিতে সহায়তা করেছে।
অলৌকিক মুনাফা: ব্যাংকগুলোর রেকর্ড নিট মুনাফা
তারল্য সংকট, ঋণ খেলাপি ও ব্যবসা-বাণিজ্যের মন্দার এ সময়ে ব্যাংকগুলো ২০২৩ সালে ১৪ হাজার ৮৪০ কোটি টাকা নিট মুনাফা দেখিয়েছে, যা দেশের ব্যাংকিং ইতিহাসে সর্বোচ্চ। এর আগে ২০২২ সালে নিট মুনাফা ছিল ১৪ হাজার ২৩০ কোটি টাকা। অথচ ২০২১ সালে এ মুনাফার পরিমাণ ছিল মাত্র ৫ হাজার ২০ কোটি টাকা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দেশের দ্বিতীয় প্রজন্মের একটি বেসরকারি ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহী বলেন, “কোভিড-পরবর্তী সময়ে দেশের ব্যাংক খাতে সীমাহীন লুণ্ঠন হয়েছে। ঋণের নামে সরকারি-বেসরকারি ব্যাংকগুলো থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা বের হয়ে গেছে। আবার এলসি খোলার নামে দেশ থেকে সে অর্থ পাচারও হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নিষ্ক্রিয়তা ও কিছু ক্ষেত্রে সহায়তার কারণে সেসব অপরাধ ঠেকানো সম্ভব হয়নি। আবার ব্যাংকের নিরীক্ষায় অনিয়মগুলো চিহ্নিতও করা হয়নি। এ কারণে ব্যাংক খাতের বিপর্যয় সত্ত্বেও মুনাফা বেড়েছে।”
ঋণ খেলাপি ও মামলার জটে আটকে থাকা অর্থ
বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুন পর্যন্ত অর্থঋণ আদালতে বিচারাধীন ৬৭ হাজার ৫১৯টি মামলায় আটকে আছে ২ লাখ ৯ হাজার ৬৯১ কোটি টাকা। পাশাপাশি উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশে (স্টে অর্ডার) আটকে আছে আরও প্রায় ৭৬ হাজার কোটি টাকা। সব মিলিয়ে মামলার কারণে আটকে আছে প্রায় ২ লাখ ৮৬ হাজার কোটি টাকার ঋণ, যা ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা ঋণের প্রায় ১৭ শতাংশ।
অগ্রণী ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মুরশেদুল কবীর বলেন, “আদালতে যাওয়ার প্রবণতা বেশি বড় গ্রাহকদের। তাঁদের ঋণের ওপর নজরদারি বাড়ানো যেতে পারে। পাশাপাশি নিম্ন আদালতে জামিনকালে খেলাপির অর্থের টাকা জমা দিতে হয়। এটা উচ্চ আদালতে রিট দাখিলের ক্ষেত্রে নেই। রিটের ক্ষেত্রেও অর্থের টাকা জমার বিধানটা করলে অনেকেরই আদালতে যাওয়ার প্রবণতা কমবে। আর মামলা নিষ্পত্তির জন্য আদালতের সংখ্যা বাড়াতে হবে। বিচারকার্য দ্রুত সম্পন্ন করতে বাড়তি নজর দিতে হবে সংশ্লিষ্টদের।”
বড় গ্রাহকদের ঋণ আদায়ে ব্যর্থতা
আলোচিত ব্যবসায়িক গ্রুপগুলো, যেমন অ্যাননটেক্স, হল-মার্ক, ক্রিসেন্ট, থার্মেক্স, এস আলম গ্রুপ ও রিম্যাক্স ফুটওয়্যার, ব্যাংকগুলোর বড় অংকের ঋণ নিয়ে তা পরিশোধে ব্যর্থ হয়েছে। জনতা ব্যাংকের কাছে অ্যাননটেক্স গ্রুপের পাওনা ৫ হাজার ৭৬৮ কোটি টাকা। সোনালী ব্যাংকের কাছে হল-মার্ক গ্রুপের পাওনা ৩ হাজার ৬০৬ কোটি টাকা। ব্যাংকগুলো ঋণ আদায়ে ব্যর্থ হয়ে আদালতের দ্বারস্থ হয়েছে। কিন্তু মামলার দীর্ঘসূত্রতার কারণে অর্থ আদায় সম্ভব হচ্ছে না।
মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, “অর্থঋণ আদালতে মামলা নিষ্পত্তি হলেও অর্থ না আদায় হওয়ার কারণ হলো, বড় গ্রাহকদের ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে কাগজপত্র যাচাই-বাছাই না করা। ফলে মামলা নিষ্পত্তি হলেও ব্যাংক অর্থ আদায় করতে পারে না। আর এসবই হচ্ছে ব্যাংকের কর্মকর্তাদের যোগসাজশে। মালিকপক্ষ এবং প্রভাবশালীরা চাপ প্রয়োগ করে ঋণ দিতে বাধ্য করেন, যা ব্যাংক খাতের জন্য একটা বড় সমস্যা।”
প্রায় ৬ লাখ কোটি টাকার ঝুঁকিপূর্ণ ঋণ
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ব্যাংকগুলোর পুনঃতফসিলকৃত ঋণের স্থিতি ২ লাখ ৮৮ হাজার ৫৪০ কোটি টাকা। অবলোপনকৃত ঋণ ৭১ হাজার ৬৯৯ কোটি টাকা। দৃশ্যমান খেলাপি ঋণ ২ লাখ ১১ হাজার কোটি টাকা। সব মিলিয়ে ব্যাংকিং খাতে ঝুঁকিপূর্ণ ঋণের পরিমাণ প্রায় ৬ লাখ কোটি টাকা, যা মোট বিতরণকৃত ঋণের ৩৫ দশমিক ৬৪ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর এ বিষয়ে বলেন, “খেলাপি ঋণ কমাতে ব্যাপক পরিবর্তন আনতে হবে। আর অর্থঋণ আদালতের যেসব প্রতিবন্ধকতা রয়েছে, সেগুলো দূর করা হবে। প্রয়োজনে অ্যাটর্নি জেনারেলের সঙ্গে কথা বলে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে। আর ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।”

কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে সরকারকে উচ্চ সুদে ঋণ
ব্যাংকগুলোর কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে স্বল্প সুদে ঋণ নিয়ে সরকারকে উচ্চ সুদে ঋণ দেওয়ার প্রবণতা বেড়েছে। রেপো সুদহার যেখানে ছিল ৬ থেকে ৯ দশমিক ৫০ শতাংশ, সেখানে সরকারি ট্রেজারি বিল-বন্ডের সুদহার ছিল ১০ থেকে ১২ শতাংশ। ফলে ব্যাংকগুলো কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে সরকারকে উচ্চ সুদে ঋণ দিয়ে মুনাফা বাড়িয়েছে।
এ বিষয়ে পূবালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আলী বলেন, “ভালো ব্যাংকগুলো নিজেদের সংগৃহীত আমানত দিয়ে বিল-বন্ড কিনেছে। আর সে বন্ড জামানত রেখে কম সুদের রেপো ঋণ নিয়েছে। এ কারণে ব্যাংকগুলোর মুনাফা বাড়ার পাশাপাশি কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণের পরিমাণও বেড়ে গেছে।”
ব্যাংক খাত : অনিয়ম-দুর্নীতি ও ঋণ আদায়ে ব্যর্থতা
ব্যাংক খাতে অনিয়ম-দুর্নীতি ও ঋণ আদায়ে ব্যর্থতার কারণে অধিকাংশ ব্যাংকই এখন বিপর্যস্ত। ব্যাংকগুলোর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বলছেন, বড় গ্রাহকদের কাছ থেকে ঋণ আদায়ে ব্যর্থ হয়ে ব্যাংকগুলো আদালতের দ্বারস্থ হচ্ছে। কিন্তু মামলার দীর্ঘসূত্রতার কারণে অর্থ আদায় সম্ভব হচ্ছে না।
ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুহাম্মদ মুনিরুল মওলা বলেন, “আমরা গ্রাহকদের আতঙ্ক দূর করার চেষ্টা করছি। এ ক্ষেত্রে সফলও হয়েছি। এখন ব্যাংক থেকে টাকা উত্তোলনের চাপ অনেকটাই কমেছে। ইসলামী ব্যাংকের আমানত প্রবাহ দ্রুতই প্রবৃদ্ধির ধারায় ফিরবে।”
তিনি আরও বলেন, “দেশে তারল্য সংকটে পড়া সাধারণ ধারার ব্যাংকগুলোর পাশে দাঁড়াতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনেক উপকরণ রয়েছে। কিন্তু ইসলামী ধারার ব্যাংকগুলোর পাশে দাঁড়ানোর তেমন কোনো উপকরণ নেই। আমরা কেবল সুকুক জমা রেখে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে অর্থ ধার করতে পারি। বর্তমান পরিস্থিতি থেকে শিক্ষা নিয়ে আমরা বেশকিছু প্রডাক্ট চালু করার উদ্যোগ নিয়েছি।”
ব্যাংক খাতের সংকট মোকাবিলায় সুপারিশ
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ব্যাংক খাতের এ বিপর্যয়কর পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি। তাঁদের মতে:
অনিয়ম-দুর্নীতি বন্ধ করা: ব্যাংক খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। অনিয়ম ও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
ঋণ আদায়ে তৎপরতা বাড়ানো : ঋণ আদায়ে ব্যাংকগুলোর তৎপরতা বাড়াতে হবে। মামলার জটিলতা কমাতে আদালতের সংখ্যা বাড়ানো ও বিচার প্রক্রিয়া দ্রুততর করা প্রয়োজন।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কার্যকর নজরদারি: বাংলাদেশ ব্যাংককে ব্যাংকগুলোর উপর কার্যকর নজরদারি বৃদ্ধি করতে হবে। ঋণ প্রদানের আগে যথাযথ যাচাই-বাছাই নিশ্চিত করতে হবে।
নীতিমালা সংস্কার: ঋণ পুনঃতফসিল, অবলোপন ও অনিয়মিত ঋণের ক্ষেত্রে নীতিমালা সংস্কার করতে হবে। উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ ঋণ প্রদানে কঠোরতা অবলম্বন করতে হবে।
অগ্রণী ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মুরশেদুল কবীর বলেন, “ব্যাংক খাতের মামলা নিষ্পত্তির জন্য আদালতের সংখ্যা বাড়াতে হবে। বিচারকার্য দ্রুত সম্পন্ন করতে বাড়তি নজর দিতে হবে সংশ্লিষ্টদের। এছাড়া উচ্চ আদালতে রিটের ক্ষেত্রে অর্থ জমার বিধান করা হলে অনেকেরই আদালতে যাওয়ার প্রবণতা কমবে।”
দেশের ব্যাংক খাত বর্তমানে এক সংকটময় অবস্থার সম্মুখীন। তারল্য সংকট, ঋণ খেলাপি, মামলার জটিলতা ও অনিয়ম-দুর্নীতি ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলেছে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি। সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ব্যাংক খাতকে পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হবে বলে আশা করা যায়।