অতীতে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে, বর্ষাকাল শেষে শীতের আগমনের সাথে সাথে ডেঙ্গুর প্রকোপ কমতে শুরু করত। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই প্রাকৃতিক ধারা ভেঙে যাচ্ছে। বিশেষ করে গত বছর ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব নভেম্বরে উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ে, যা জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও সাধারণ মানুষ উভয়ের মধ্যেই উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহেও ডেঙ্গুতে মারা যাওয়ার সংখ্যা ছিল চোখে পড়ার মতো, যা ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে চলমান লড়াইয়ে নতুন চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক তথ্য অনুসারে, এবছর অক্টোবরের মাঝামাঝি সময়েও ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে প্রতিদিন মানুষ মারা যাচ্ছে। শুধু বুধবারের প্রতিবেদনেই দেখা যায়, ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে আরও সাতজন মারা গেছেন। এ নিয়ে চলতি মাসে মোট মৃত্যুর সংখ্যা ১০১ এ দাঁড়িয়েছে, যা সেপ্টেম্বরের তুলনায় অনেক বেশি। গত সেপ্টেম্বরে ডেঙ্গুতে ৮০ জন মারা গেলেও, অক্টোবরের মধ্যেই এই সংখ্যা ছাপিয়ে গেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান বলছে, চলতি বছরে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন ২৬০ জনেরও বেশি মানুষ, যা একটি গুরুতর পরিস্থিতির ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, জুলাই মাস থেকেই ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়তে শুরু করেছে। সেই মাসে ২ হাজার ৬৬৯ জন মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হন, যা আগস্টে দ্বিগুণেরও বেশি হয়ে যায়। সেপ্টেম্বরে এ সংখ্যা আরও তিনগুণ বেড়ে যায় এবং চলতি অক্টোবর মাসে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা ইতোমধ্যেই ২২ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। শুধু আক্রান্তের সংখ্যাই নয়, মৃত্যুর হারও আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে।
এডিস মশার আচরণ ও জীবনের ধরন পরিবর্তনের কারণে ডেঙ্গু রোগের বিস্তার এবং ভয়াবহতা বেড়েছে। আগে এ মশা শুধুমাত্র পরিষ্কার পানিতে প্রজনন করত, কিন্তু এখন দূষিত পানিতেও তারা সহজেই বেঁচে থাকতে পারছে। আর এডিস মশার আরেকটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হচ্ছে, তারা দিন-রাত উভয় সময়েই সংক্রমণ ঘটাতে সক্ষম হয়ে উঠেছে, যা ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টাকে আরও জটিল করে তুলছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনও এডিস মশার টিকে থাকার সক্ষমতাকে বাড়িয়ে দিয়েছে, ফলে তাদের বিস্তার এখন বছরজুড়েই দেখা যায়।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মশা নিয়ন্ত্রণে বর্তমান পদক্ষেপগুলো যথেষ্ট নয়। রাসায়নিক কীটনাশক দিয়ে পুরোপুরি এডিস মশার বিস্তার রোধ করা সম্ভব নয়। বরং ডেঙ্গু মোকাবিলায় বছরের শুরু থেকেই সার্বিকভাবে মশক নিধন কার্যক্রম চালাতে হবে। শুধুমাত্র বর্ষাকালে মশা নিধনের চেষ্টা করলে ডেঙ্গুর বিস্তার রোধ করা সম্ভব নয়, কারণ জলবায়ুর পরিবর্তনের কারণে এডিস মশা বছরের যে কোনো সময়েই বিস্তার লাভ করতে পারে।
ডেঙ্গু রোগীর উপসর্গগুলো সাধারণত সবার পরিচিত হলেও, এ বছর ডেঙ্গুর ধরনেও পরিবর্তন এসেছে। নতুন উপসর্গগুলোর সাথে মানুষ পরিচিত না থাকায়, অনেকেই দেরিতে চিকিৎসা নিয়েছে, ফলে মৃত্যুর হার বেড়েছে। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ, যা ডেঙ্গু প্রতিরোধের জন্য জনসচেতনতা বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীর সংখ্যা গত তিন বছর ধরে আগস্ট, সেপ্টেম্বর, ও অক্টোবর মাসে সর্বাধিক। বিশেষ করে গত বছর ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন তিন লাখেরও বেশি মানুষ এবং উল্লেখযোগ্য সংখ্যক রোগী মারা যান। এই পরিস্থিতি আরও ইঙ্গিত দেয় যে, ডেঙ্গু একটি দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা হিসেবে প্রতিনিয়ত আমাদের সামনেই রয়ে যাবে।
ডেঙ্গু মোকাবিলার জন্য প্রয়োজন একটি সমন্বিত পরিকল্পনা। প্রথমত, মশার উৎস নির্মূল করতে হবে। জলবায়ুর পরিবর্তন ও এডিস মশার জীবনধারায় পরিবর্তন ঘটায়, শুধু কীটনাশক ব্যবহার করে তাদের নির্মূল করা সম্ভব নয়। দ্বিতীয়ত, জনসচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। মানুষকে বুঝতে হবে যে, ডেঙ্গুর নতুন উপসর্গগুলো সম্পর্কে সচেতন না হলে, তারা জীবনহানির শিকার হতে পারে। তাই কারও জ্বর হলে দেরি না করে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে।
এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে গবেষণা এবং জনসচেতনতা বাড়ানো অপরিহার্য। কারণ, ডেঙ্গু প্রতিরোধে সরকার বা স্বাস্থ্য বিভাগ এককভাবে সফল হতে পারবে না। সমাজের প্রতিটি মানুষকে এ দায়িত্ব নিতে হবে, যাতে মশা নিধন কার্যক্রমের সাথে সাথে নিজেদের ঘরবাড়ি এবং আশপাশের পরিবেশ পরিষ্কার রাখে। পাশাপাশি, স্থানীয় প্রশাসন ও স্বাস্থ্য বিভাগকে মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করার পাশাপাশি নতুন ধরনের রোগ উপসর্গ সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করতে হবে।
পরিশেষে বলা যায়, ডেঙ্গু একটি বহুমুখী সমস্যা যা শুধুমাত্র স্বাস্থ্যসেবা খাতের নয়, বরং সামাজিক ও পরিবেশগত চ্যালেঞ্জও বটে। এটি মোকাবিলায় প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি কার্যকর মশক নিধন প্রক্রিয়া। তবেই আমরা ডেঙ্গু পরিস্থিতির উন্নতি ঘটাতে পারব এবং বছরের যে কোনো সময়েই ডেঙ্গু রোগের ভয়াবহতা কমিয়ে আনতে সক্ষম হবো।