সোমবার, ১৯ জানুয়ারি ২০২৬

সর্বশেষ

উন্নয়নের নামে ঋণের ফাঁদ: কে দায়ী এই অবস্থার জন্য?

সায়িমা সাফা

বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে যে সংকটের মুখোমুখি, তার পেছনে অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে উঠে এসেছে বিগত সরকারের নেওয়া বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক ঋণের বোঝা। জনগণের কাঁধে চেপে বসা এই ঋণের পরিমাণ প্রায় সাড়ে ১২ লাখ কোটি টাকা, যা দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার জন্য একটি বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সম্প্রতি যুগান্তরে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে নেওয়া বৈদেশিক ঋণের স্থিতি গত জুন পর্যন্ত দাঁড়িয়েছে ১০ হাজার ৩৭৯ কোটি ডলারে, যা ১২ লাখ ৪৬ হাজার কোটি টাকার সমান। এ অর্থ পরিশোধ করতে হবে বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ সরকারগুলোকে, যা দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ওপর বিশাল প্রভাব ফেলতে পারে।

এই ঋণ শুধু দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে না, বরং পুরো অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় একটি অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি করছে। বৈদেশিক ঋণ শোধ করার জন্য রিজার্ভ থেকে টাকা ব্যবহার করতে হচ্ছে, কিন্তু রিজার্ভ ক্রমশ কমে আসছে। রিজার্ভ কমে যাওয়ার প্রভাব হিসেবে ডলারের মূল্যবৃদ্ধি লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যা দেশের অর্থনীতির জন্য আরও নেতিবাচক ফলাফল ডেকে আনছে। ডলারের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় শুধু আমদানি পণ্যের দামই বাড়ছে না, বরং সব ধরনের পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির চাপ জনগণের ওপর এসে পড়ছে। এর ফলে ভোক্তাদের জীবনযাত্রার ব্যয়ও ক্রমাগত বাড়ছে, যা সরাসরি অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

তাছাড়া, বৈদেশিক ঋণের সুদের হার বৃদ্ধির ফলে দেশের ওপর আর্থিক বোঝা আরও বেশি হয়ে দাঁড়িয়েছে। বৈশ্বিক বাজারে সুদের হার বেড়ে যাওয়ার কারণে দেশের ঋণ পরিশোধ করতে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে, যা রিজার্ভের ওপর আরও বেশি চাপ সৃষ্টি করছে। নিয়মিত ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হওয়ায় ঋণের মেয়াদ বাড়াতে হচ্ছে, যার ফলে ঋণের সুদ এবং পরিমাণ আরও বেড়ে যাচ্ছে।

এ ধরনের পরিস্থিতি দেশের শিল্পখাতে বিনিয়োগ কমিয়ে দিচ্ছে, এবং এর প্রভাব কর্মসংস্থানের সুযোগেও পড়ছে। শিল্পের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় নতুন কর্মসংস্থানের পথ বন্ধ হয়ে গেছে, যা দেশের তরুণ প্রজন্মের জন্য ভবিষ্যৎকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে।

বিগত সরকারের সময়ে বৈদেশিক ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রে যে বেপরোয়া নীতি অনুসরণ করা হয়েছে, তা দেশের অর্থনীতির জন্য একটি বিশাল বিপর্যয় ডেকে এনেছে। উন্নয়ন প্রকল্পের নামে সরকারি-বেসরকারি খাতে বেপরোয়াভাবে ঋণ নেওয়ার ফলে দেশের ঋণ-জিডিপির অনুপাত ক্রমান্বয়ে বেড়ে চলেছে। ২০১৪ সালে যেখানে এই অনুপাত ছিল ২৮.৭ শতাংশ, এখন তা ৪০ শতাংশের ওপরে পৌঁছে গেছে।

অর্থাৎ, বৈদেশিক ঋণের বোঝা দেশের অর্থনীতিকে ক্রমশ সংকটে ফেলছে। বিশেষ করে, মেগা প্রকল্পগুলোর ঋণ শোধের সময় ঘনিয়ে আসার পর যখন আসল অর্থ পরিশোধ শুরু হবে, তখন দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা আরও ভয়াবহ হতে পারে বলে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে বিগত সরকারের বাজেট ও অর্থনৈতিক নীতিতেও কিছু প্রশ্ন উঠে এসেছে। ঋণ পরিশোধের চাপে রিজার্ভে ডলারের ঘাটতি মেটানোর জন্য ভর্তুকি কমানোর এবং করের মাধ্যমে রাজস্ব বাড়ানোর চেষ্টা করা হয়েছিল, কিন্তু সেই পদক্ষেপগুলো অনেক ক্ষেত্রে অযৌক্তিক ছিল এবং জনগণের মধ্যে আরও হতাশা ও উদ্বেগের সৃষ্টি করেছিল। বাজেট প্রণয়নের সময় রাজস্ব বৃদ্ধির লক্ষ্য পূরণে নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপ যেমন অবিবেচনাপ্রসূত ছিল, তেমনি তা জনগণের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। জনগণের করের চাপ বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি এবং আমদানি খরচের বৃদ্ধির ফলে মানুষের জীবনযাত্রা ক্রমাগত দুর্বিষহ হয়ে উঠছে।

বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার এবং ভবিষ্যৎ যে কোনো সরকারকে এই বিষয়ে অত্যন্ত সতর্ক হতে হবে। বৈদেশিক ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে, কারণ অতীতের মতো বেপরোয়া ঋণ গ্রহণ অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য ভয়াবহ ফলাফল ডেকে আনতে পারে। উন্নয়ন প্রকল্পে অতিরিক্ত খরচ ও অপচয়ের প্রবণতা বন্ধ করতে হবে এবং প্রকল্পের বাস্তবায়নে মিতব্যয়িতা প্রদর্শন করতে হবে। বিশেষ করে চলমান প্রকল্পগুলোতে যে দ্বিগুণ বা তিনগুণ ব্যয়ে কাজ সম্পন্ন করার প্রবণতা দেখা গেছে, তা পরিবর্তন করে স্বচ্ছতার মাধ্যমে কাজ করতে হবে।

এ ছাড়াও, স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি ঋণের বোঝা না বাড়িয়ে তা পরিশোধের জন্য বর্তমান সরকারকে আরও যত্নশীল হতে হবে। দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা উন্নয়নের লক্ষ্যে ঋণনির্ভর অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে এসে স্বাবলম্বী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার দিকে মনোযোগ দিতে হবে।

বৈদেশিক ঋণের ফাঁদ থেকে বেরিয়ে আসতে হলে বর্তমান সরকারকে নিজের সক্ষমতা ও মিতব্যয়ী অর্থনৈতিক পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাঁধে ঋণের বোঝা চাপিয়ে দিয়ে ‘ঋণ করে ঘি খাওয়া’র প্রবণতা এড়িয়ে সুষ্ঠু আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করাই হবে বর্তমান সরকারের অন্যতম দায়িত্ব।

সামগ্রিকভাবে, দেশের জনগণের আশা, বর্তমান সরকার বৈদেশিক ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রে আরও সচেতন হবে এবং স্বাবলম্বী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার মাধ্যমে জনগণের কাঁধ থেকে ঋণের বোঝা কমানোর পথে কাজ করবে। অতীতে নেওয়া ঋণের দায় মেটাতে গিয়ে দেশের অর্থনীতি যেন আরও বিপর্যয়ের দিকে না ধাবিত হয়, সে বিষয়ে বিশেষ নজর দেওয়া জরুরি।

পাঠকপ্রিয়