দেশে মূল্যস্ফীতির বিপুল চাপ গত দুই বছর আট মাস ধরে ভোক্তাদের জীবনযাত্রা কঠিন করে তুলেছে। মজুরির তুলনায় দ্রুত বাড়তে থাকা মূল্যস্ফীতির কারণে জীবনযাত্রার মান নিম্নগামী হচ্ছে, যা দেশের ভোক্তাদের ব্যয় কমাতে বাধ্য করেছে।
২০২২ সালের শুরুর দিকে শুরু হওয়া এই সমস্যার এখনো সমাধান দেখা যাচ্ছে না, বরং ক্রমেই তা নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের শেষদিকে শুরু হওয়া এই সংকট, নতুন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকেও ফেলে দিয়েছে একই সমস্যার মধ্যে।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতেও এই সংকটের তীব্রতা বহাল রয়েছে। ২০২৪ সালের আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে ভোক্তাদের আয়ের তুলনায় ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় দীর্ঘ সময় ধরে মূল্যস্ফীতির হার মজুরির বৃদ্ধির হারকে ছাপিয়ে যাচ্ছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যমতে, ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া এ পরিস্থিতির কারণে ভোক্তারা তাদের খরচের ধরন পরিবর্তন করতে বাধ্য হচ্ছেন। খাদ্য, চিকিৎসা, শিক্ষা এবং বিনোদনের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোতে ভোক্তাদের ব্যয় কাটছাঁট করতে হয়েছে। এই পরিস্থিতি শুধু ব্যক্তিগত জীবনে সীমাবদ্ধ নয়, বরং সামগ্রিক অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে এবং মন্দাকে আরও তীব্র করেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মুদ্রাস্ফীতি ও মজুরির হারে এই পার্থক্যের প্রভাব প্রাত্যহিক জীবনে মারাত্মক আঘাত হেনেছে।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক ড. মোস্তফা কে মুজেরী বলেন, “মজুরি বৃদ্ধির হার বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির ওপর নির্ভরশীল। সাধারণত উৎপাদন বৃদ্ধি পেলে মজুরিও বাড়ে, কিন্তু যদি পণ্যের দাম বৃদ্ধি পায় কিংবা মুদ্রার মান কমে, তবে মূল্যস্ফীতি দ্রুত বাড়তে থাকে। ফলস্বরূপ, মজুরির চেয়ে দ্রুতগতিতে বাড়তে থাকে মুদ্রাস্ফীতি, যা ভোক্তাদের আয়ে তীব্র প্রভাব ফেলে।”
মূল্যস্ফীতি : দীর্ঘমেয়াদী সংকট এবং এর প্রভাব
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৬ দশমিক ১৭ শতাংশ, যা মজুরি বৃদ্ধির হার ৬ দশমিক ০৩ শতাংশের চেয়ে সামান্য বেশি। সেই সময় থেকে মূল্যস্ফীতির হার ক্রমশ বাড়তে থাকে, আর মজুরি বৃদ্ধির হার কমতে থাকে। গত দুই বছরের বেশি সময় ধরে ভোক্তাদের আয়ের তুলনায় ব্যয় বৃদ্ধির এই প্রবণতা তাদের জীবিকা নির্বাহকে আরও কঠিন করে তুলেছে। শুধু তা-ই নয়, এই ক্রমাগত সংকটের কারণে ভোক্তারা তাদের সঞ্চয় খরচ করতে বাধ্য হয়েছেন, এবং অনেকেই ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন।
এছাড়াও, এই অর্থনৈতিক চাপের কারণে ভোক্তাদের স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং জীবনযাত্রার অন্যান্য ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। খাদ্য গ্রহণ কমে যাওয়ার ফলে ভোক্তাদের মধ্যে পুষ্টির ঘাটতি দেখা দিয়েছে, যা স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। শিশুদের পড়াশোনার ব্যয় কমানো, চিকিৎসার খরচ সংকোচন এবং বিনোদনের খাতে খরচ কমানো ভোক্তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও প্রভাব ফেলছে।
২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৯ দশমিক ৯২ শতাংশ, যেখানে মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৮ দশমিক ০১ শতাংশ। এতে প্রায় দুই শতাংশের এই পার্থক্য ভোক্তাদের আয়ের তুলনায় ব্যয় বৃদ্ধিকে আরও প্রকট করে তুলেছে। দীর্ঘদিন ধরে আয়ের তুলনায় ব্যয় বেশি হওয়ায় ভোক্তারা একদিকে অর্থনৈতিক আঘাত সহ্য করছেন, অন্যদিকে সামাজিক মানদণ্ডেও তাদের জীবনযাত্রায় আঘাত আসছে।
ভবিষ্যত সংকট মোকাবিলার চ্যালেঞ্জ
বিশ্বব্যাংক এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) তাদের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে যে, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সংকট আরও এক বছর অব্যাহত থাকতে পারে। চলতি অর্থবছর শেষে মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৭ শতাংশে পৌঁছাতে পারে, এমনকি বছরের কোনো সময়ে তা ১০ শতাংশ অতিক্রম করতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের ধারণা, এ সময়ে ভোক্তাদের আয়ের তুলনায় ব্যয় আরও বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যা তাদের জীবনযাত্রাকে আরও দুর্বিষহ করবে। এই পরিস্থিতিতে ক্রয়ক্ষমতা কমতে থাকলে সামগ্রিক অর্থনীতির ওপরও আরও চাপ সৃষ্টি হবে।
সংশ্লিষ্ট অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, মূল্যস্ফীতির হার বাড়লেও অর্থনৈতিক মন্দার কারণে মানুষের আয় বৃদ্ধির সুযোগ খুবই সীমিত থাকবে। এর ফলে আগামী এক বছর ভোক্তাদেরকে কঠোরভাবে খরচের ক্ষেত্রে কাটছাঁট করে চলতে হবে। এতে করে তাদের জীবনযাত্রার মান আরও হ্রাস পাবে, আর ভোগান্তি তীব্র আকার ধারণ করবে।