চট্টগ্রামের রাজপথ ১৬ জুলাই, ২০২৪-তে সাক্ষী হয়েছিল এক মর্মান্তিক ঘটনার। কোটা সংস্কারের দাবিতে সোচ্চার ছাত্রদের ওপর চলা হামলায় সেদিন ঝরে গিয়েছিল একটি তাজা প্রাণ- ওয়াসিম আকরাম। চট্টগ্রামের ইতিহাসে লেখা হয়ে গেল এক নতুন নাম, যে নামটি কেবল একটি নাম নয়, প্রতিবাদের স্ফুলিঙ্গ, অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর এক জ্বলন্ত উদাহরণ।
চট্টগ্রাম কলেজের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র ওয়াসীম ছিলেন ছাত্রদলের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য। চকবাজারের একটি মেসে থেকে পড়াশোনার পাশাপাশি সক্রিয় ছিলেন বৈষম্য বিরোধী আন্দোলনে। সহপাঠী ইমরান হোসেন ও তৌহিদুল ইসলামের স্মৃতিচারণায় উঠে আসে ওয়াসীমের অদম্য সাহসের কথা। নগরীর প্রতিটি কর্মসূচিতে ছিল তার সরব উপস্থিতি। আন্দোলন যখন সহিংস হয়ে ওঠে, তখনও পিছপা হননি এই নির্ভীক যোদ্ধা।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায় উঠে আসে সেই ভয়াল দুপুরের চিত্র। মুরাদপুর এলাকায় ছাত্রলীগ-যুবলীগ ও পুলিশের ত্রিমুখী আক্রমণে দিশেহারা হয়ে পড়েছিল আন্দোলনরত ছাত্ররা। লাঠিচার্জ, গুলি আর ককটেলের শব্দে প্রকম্পিত হয়ে উঠেছিল রাজপথ। সাদা পোশাকে থাকা অস্ত্রধারীদের গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে গিয়েছিল ছাত্রদের বুক। এরই মাঝে একটি বুলেট এসে বিদ্ধ করে ওয়াসিমকে।
মৃত্যুর মাত্র ১৬ ঘণ্টা আগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ওয়াসিম লিখেছিলেন, “সাধারণ শিক্ষার্থীদের পাশে আছে আমার প্রাণের সংগঠন। আমি এই পরিচয়েই শহীদ হব।” নিয়তি যেন তার সেই কথাকেই সত্য করে তুলল।
ওয়ামিমের বাড়ি কক্সবাজারের পেকুয়ার মেহেরনামা গ্রামে। বাবা শফিউল আলম কাতারে প্রবাসী। পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে ওয়াসিম ছিলেন দ্বিতীয়। তার মৃত্যু সংবাদে পুরো পরিবারে নেমে আসে শোকের ছায়া। মুঠোফোনে ওয়াসিমের চাচা মাওলানা জয়নাল আবেদীনের কণ্ঠে ঝরে পড়ে সেই শোকের মাতম, “ওয়াসিমকে নিয়ে আমাদের অনেক স্বপ্ন ছিল। সেই স্বপ্ন ভেঙে খান খান হয়ে গেল।”
১৭ই জুলাই, অশ্রুসিক্ত নয়নে, হাজারো মানুষের উপস্থিতিতে ওয়াসীমের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। ইমামতি করেন তারই চাচা। এরপর পারিবারিক কবরস্থানে চিরনিদ্রায় শায়িত হন এই বীর।
ওয়াসীমের মৃত্যুতে শোকস্তব্ধ হয়ে পড়েছিল পুরো এলাকা। বিনয়ী ও সদালাপী ওয়াসীম ছিলেন সবার প্রিয়। তার অকাল প্রয়াণে এলাকাবাসী হারিয়েছে এক উজ্জ্বল নক্ষত্রকে।
ওয়াসীমের পরিবার চায়, তার মৃত্যুর সুষ্ঠু তদন্ত হোক। দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হোক। সেই সাথে, সরকার যেন এই পরিবারের পাশে দাঁড়ায়, সেই আবেদনও জানিয়েছেন তারা।
ওয়াসিম আকরাম, একটি নাম, একটি চেতনা, একটি বিদ্রোহ। চট্টগ্রামের রাজপথে ঝরে যাওয়া এই রক্তবিন্দু হয়তো একদিন নতুন আন্দোলনের জন্ম দেবে, যে আন্দোলন অন্যায়ের বিরুদ্ধে, বৈষম্যের বিরুদ্ধে, সাম্যের পক্ষে।