২০২৪ সাল, রোহিঙ্গা সংকটের ইতিহাসে একটি জটিল অধ্যায়। বছরের শুরু থেকেই মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংঘাত এবং রাখাইনে আরাকান আর্মির (এএ) সঙ্গে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সংঘর্ষ নতুন মাত্রা পায়। এতে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে নেওয়া পাইলট প্রকল্পের কার্যক্রম মুখ থুবড়ে পড়ে। মিয়ানমারের টালমাটাল রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও রাখাইনের অস্থিতিশীলতা রোহিঙ্গা সমস্যার দীর্ঘসূত্রতাকে আরও উসকে দিচ্ছে।
রোহিঙ্গাদের জন্য ত্রাণ সহায়তা কমে আসা, ক্যাম্পে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, এবং রোহিঙ্গাদের মধ্যে বাংলাদেশি নাগরিকত্ব নেওয়ার প্রবণতা—সব মিলিয়ে সংকট আরও ঘনীভূত হচ্ছে। স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যেও আতঙ্ক বাড়ছে। রোহিঙ্গাদের জন্মসনদ, এনআইডি ও পাসপোর্ট তৈরিতে সহায়তাকারীদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ সরকারের কঠোর অবস্থানও পরিস্থিতির জটিলতা বাড়িয়েছে।
মিয়ানমার ও রাখাইনের পরিবর্তিত প্রেক্ষাপট
২০২৩ সালের শেষ দিকে ‘থ্রি ব্রাদারহুড অ্যালায়েন্স’-এর অপারেশন ১০২৭ মিয়ানমারের সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে বড় ধরনের ধাক্কা দেয়। আরাকান আর্মি রাখাইন রাজ্যের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ায় হিসাব-নিকাশ পাল্টে গেছে। রাখাইনে এখন আরাকান আর্মির কর্তৃত্ব চলছে, যা রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে নতুন ভাবনার জন্ম দিয়েছে।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দায়বদ্ধতা
ন্যাম সম্মেলন, জি-সেভেন বৈঠক, জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদের অধিবেশন—সর্বত্রই রোহিঙ্গা ইস্যু আলোচিত হয়েছে। রোহিঙ্গাদের জন্য তহবিল বাড়ানো, নিরাপদ প্রত্যাবাসনের পরিবেশ তৈরি, এবং মিয়ানমারে সংঘটিত নৃশংসতার বিচার ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। চীনের রাষ্ট্রদূত অস্ত্রবিরতির মাধ্যমে প্রত্যাবাসন আলোচনার পথ সুগম করার কথা বলেছেন। তবে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের এই উদ্যোগগুলো এখনও পর্যন্ত প্রত্যাশিত ফল আনেনি।
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ও দেশ রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পরিদর্শন ও ত্রাণ কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে। আইওএম, অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী, রেড ক্রস, কারিতাস ইন্টারন্যাশনাল, যুক্তরাষ্ট্র—সবাই সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। বিশ্বব্যাংক ৭০০ মিলিয়ন ডলারের প্রকল্প অনুমোদন করেছে, যার মধ্যে ৩১৫ মিলিয়ন ডলার অনুদান। যুক্তরাষ্ট্র এ পর্যন্ত ২.২ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি সহায়তা দিয়েছে। ইউনিসেফ ও ব্র্যাক ভাসানচরে শিক্ষা ও জীবনমান উন্নয়নে কাজ করছে।
সীমান্ত পরিস্থিতি ও নিরাপত্তা সংকট
বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে উত্তেজনা বেড়েছে। মিয়ানমার থেকে আসা গোলাগুলিতে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। টেকনাফ-সেন্টমার্টিন রুটে যোগাযোগ বিঘ্নিত হয়েছে, খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছে। মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সদস্যরা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে এবং দফায় দফায় তাদের ফেরত পাঠানো হয়েছে। সীমান্ত পরিস্থিতি রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের পথে অন্যতম বড় বাধা।
রোহিঙ্গা-রাখাইন সম্পর্ক: বিদ্বেষের আগুন
মিয়ানমার সেনাবাহিনী কর্তৃক রোহিঙ্গাদের আরাকান আর্মির বিরুদ্ধে জোরপূর্বক মোতায়েন করার অভিযোগ উঠেছে। রাখাইনে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমার সরকারের পক্ষে লড়াইয়ে বাধ্য করার কৌশল দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে উত্তেজনা আরও বাড়িয়েছে। মংডু দখলের পর জাতিগত বিদ্বেষ উসকে দেওয়ার জন্য একজন সিনিয়র সেনা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে। ফেসবুকের মাধ্যমে বিদ্বেষ ছড়ানোর পুরোনো ক্ষত এখনও শুকায়নি।
সংকট নিরসনে নতুন উদ্যোগ: আশার আলো?
জাতিসংঘের সাবেক কর্মকর্তাদের নিয়ে গঠিত স্পেশাল অ্যাডভাইজরি কাউন্সিল ফর মিয়ানমার রাখাইনে মানবিক করিডর চালুর আহ্বান জানিয়েছে। ড. মুহাম্মদ ইউনূস সংকট সমাধানে তিনটি প্রস্তাব দিয়েছেন, যার মধ্যে সব স্টেকহোল্ডারকে নিয়ে সম্মেলন ডাকার প্রস্তাবটি গুরুত্বপূর্ণ। জাতিসংঘের বিশেষ র্যাপোর্টারের সঙ্গে আলোচনায় রোহিঙ্গাদের তৃতীয় কোনো দেশে পুনর্বাসনের প্রসঙ্গ উঠেছে।
বাংলাদেশ কূটনৈতিক পথে সমাধানের চেষ্টা করছে এবং আন্তর্জাতিক আদালতের দ্বারস্থ হয়েছে। জাতিসংঘে রোহিঙ্গা বিষয়ক একটি প্রস্তাব সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়েছে এবং ২০২৫ সালে একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে।
সামনের পথ: অনিশ্চিত গন্তব্য
রোহিঙ্গাদেরও নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাদের আত্মনির্ভরশীল করে তোলা জরুরি। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য এখন আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে। তাই, আগামী দিনে মিয়ানমারে যেই ক্ষমতায় আসুক, আরাকান আর্মিকে সঙ্গে নিয়েই রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধানের পথ খুঁজতে হবে।
বাংলাদেশে অন্তর্বর্তী সরকার গঠন এবং রাখাইনে আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণ—এই দুটি বিষয় রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় নতুন সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে। তবে, রাজনৈতিক সদিচ্ছা, আঞ্চলিক সহযোগিতা, এবং আন্তর্জাতিক চাপ ছাড়া এই সংকটের সমাধান সম্ভব নয়।
করণীয়
জরুরি ভিত্তিতে আপৎকালীন তহবিল: রোহিঙ্গা সংকট মোকাবেলায় ত্রাণ ও আর্থিক সাহায্য নিরবচ্ছিন্ন রাখা অত্যন্ত জরুরি। এজন্যে অবিলম্বে একটি আপৎকালীন তহবিল গঠন করা প্রয়োজন। এই তহবিলে পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ রাখতে হবে, যাতে যেকোনো পরিস্থিতিতে রোহিঙ্গাদের সহায়তা প্রদান অব্যাহত রাখা যায়। আন্তর্জাতিক সংস্থা, বিভিন্ন দেশ এবং দাতা গোষ্ঠীগুলোর সমন্বয়ে এই তহবিল গঠন ও পরিচালনা করা যেতে পারে।
দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা: রোহিঙ্গা সমস্যার স্থায়ী সমাধানের জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রণয়ন করা আবশ্যক। এই পরিকল্পনায় রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন, পুনর্বাসন এবং তাদের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত থাকতে হবে। বাংলাদেশ সরকার, মিয়ানমার সরকার, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং রোহিঙ্গাদের অংশগ্রহণে এই পরিকল্পনা তৈরি করা উচিত। পরিকল্পনার বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।
আরাকান আর্মির সঙ্গে আলোচনা: রাখাইন রাজ্যের বর্তমান নিয়ন্ত্রক শক্তি হিসেবে আরাকান আর্মির সঙ্গে আলোচনা অপরিহার্য। রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধানে আরাকান আর্মিকে সম্পৃক্ত করতে হবে। বাংলাদেশ সরকার, আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং আরাকান আর্মির মধ্যে ত্রিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে একটি সমঝোতায় পৌঁছানো সম্ভব। এক্ষেত্রে আরাকান আর্মির রাজনৈতিক ও মানবিক দাবিগুলো বিবেচনায় রাখতে হবে।
আন্তর্জাতিক চাপ বৃদ্ধি: মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ অব্যাহত রাখা প্রয়োজন। রোহিঙ্গাদের নাগরিক অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া, রাখাইনে নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করা এবং প্রত্যাবাসনের অনুকূল পরিস্থিতি সৃষ্টির জন্য মিয়ানমার সরকারকে বাধ্য করতে হবে। জাতিসংঘ, আসিয়ান, ওআইসিসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে বাংলাদেশের কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করতে হবে।
রোহিঙ্গাদের ক্ষমতায়ন: রোহিঙ্গাদের শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির মাধ্যমে তাদের ক্ষমতায়ন করতে হবে। এর ফলে রোহিঙ্গারা নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হবে এবং নিজেদের ভবিষ্যৎ বিনির্মাণে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে পারবে। শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের আত্মনির্ভরশীল করে গড়ে তোলা গেলে, প্রত্যাবাসনের পরও তারা সমাজে মর্যাদার সঙ্গে বসবাস করতে পারবে।
পরিশেষে বলা যায়, রোহিঙ্গা সংকট কেবল একটি মানবিক বিপর্যয় নয়, এটি আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্যও হুমকি। তাই বাংলাদেশ, মিয়ানমার, এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এখনই সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে। নইলে এই সংকট আরও গভীর ও অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়বে।