সোমবার, ১৯ জানুয়ারি ২০২৬

সর্বশেষ

ডাক্তারদের উপহার, বাড়ছে ওষুধের দাম: নিয়ন্ত্রণের উপায় জানালেন বিশেষজ্ঞ

নিজস্ব প্রতিবেদক

দেশে ওষুধের দাম সাম্প্রতিক সময়ে অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। গত কয়েক মাসে ওষুধের দাম ৩০ থেকে ৯০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে, যা নিম্ন ও সীমিত আয়ের মানুষের জন্য চরম দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেকে বাধ্য হয়ে কম ওষুধ কিনছেন, কেউ কেউ পড়ছেন আর্থিক সংকটে।

এই পরিস্থিতিতে বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারকে সব ধরনের ওষুধের দাম ফর্মুলার ভিত্তিতে নির্ধারণ করার পরামর্শ দিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক এবং অ্যালায়েন্স ফর হেলথ রিফর্মস বাংলাদেশের (এএইচআরবি) আহ্বায়ক ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ।

সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে ড. হামিদ বলেন, “ওষুধ একটি বাণিজ্যিক পণ্য হওয়ায় এর দাম সময়ের সাথে সাথে বাড়বে, এটাই স্বাভাবিক। তবে এই বৃদ্ধি হতে হবে নিয়ন্ত্রিত। ৫০ থেকে ১০০ শতাংশ দাম বেড়ে যাওয়াটা অস্বাভাবিক। প্রতি দুই বছর অন্তর অন্তর দুই-চার শতাংশ করে বাড়লে মানুষ মানিয়ে নিতে পারত।”

তিনি জানান, ১৯৮২ সালের ওষুধ নীতি অনুযায়ী ১১৭টি অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের মূল্য সরকার নির্ধারিত কমিটির মাধ্যমে নির্ধারণ করার কথা। কিন্তু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সেই কমিটি নিয়মিত সভা করে না এবং দাম পুনর্নির্ধারণ করে না। ফলে কোম্পানিগুলো এই ওষুধগুলো উৎপাদন না করে লাভজনক ওষুধ উৎপাদনে মনোযোগ দিচ্ছে।

ড. হামিদের মতে, ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের ওষুধের মূল্য নির্ধারণ করার সক্ষমতা নেই এবং তাদের কাজও এটি নয়। তাদের দায়িত্ব ওষুধের অনুমোদন ও গুণগত মান রক্ষা করা। তিনি বলেন, “ওষুধের যৌক্তিক মূল্য নির্ধারণের জন্য একটি ন্যাশনাল ফার্মাসিউটিক্যাল প্রাইসিং অথরিটি তৈরি করতে হবে, যেমনটি ভারতে রয়েছে। এই অথরিটি স্বতন্ত্রভাবে ওষুধের দাম নির্ধারণ করবে।”

তিনি আরও বলেন, “এই অথরিটি ওষুধ কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে কাঁচামাল ক্রয়, উৎপাদন ব্যয়সহ যাবতীয় তথ্য সংগ্রহ করে, সেগুলোকে বিশ্লেষণ করে ওষুধের দাম পুনর্নির্ধারণ করবে। স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের সচিবের নেতৃত্বে বর্তমান যে কমিটি রয়েছে, তাদের এই তথ্য বিশ্লেষণের সামর্থ্য নেই। এজন্য প্রয়োজন দক্ষ জনবল।”

অধ্যাপক হামিদ মনে করেন, সব ধরনের ওষুধের দাম সরকার কর্তৃক ফর্মুলার ভিত্তিতে নির্ধারিত হলে ওষুধ কোম্পানি ও জনগণ উভয়ের স্বার্থ রক্ষা হবে। তিনি বলেন, “ন্যাশনাল ফার্মাসিউটিক্যাল প্রাইস ইন অথরিটি প্রতি দুই বছর পর পর ওষুধের দাম যৌক্তিকভাবে সমন্বয় করবে। এতে করে ১০০ টাকার ওষুধ ১০৫ বা ১১০ টাকা হলে মানুষের সমস্যা হবে না, কিন্তু এক লাফে ১৭৫ বা ২০০ টাকা হয়ে গেলে সেটা সবার জন্য কষ্টকর।”

ওষুধ কোম্পানিগুলোর ডাক্তারদের উপহার ও অর্থ দেওয়ার মাধ্যমে আগ্রাসী বিপণন (অ্যাগ্রেসিভ মার্কেটিং) নিয়েও কথা বলেন ড. হামিদ। তিনি বলেন, “ওষুধের দাম যদি সরকারের ফর্মুলা অনুযায়ী নির্ধারিত হয়, তাহলে কোম্পানিগুলোর অতিরিক্ত মূল্য নেওয়ার সুযোগ থাকবে না। তখন আগ্রাসী বিপণন করতে হলে তাদের নিজেদের লাভ থেকেই খরচ করতে হবে। ফলে এই প্রবণতা কমে আসবে।”

সাক্ষাৎকারের শেষে তিনি জোর দিয়ে বলেন, “সবদিক রক্ষার জন্য একমাত্র উপায় হচ্ছে সমস্ত প্রকার ওষুধের দাম ফর্মুলার ভিত্তিতে নির্ধারণ করা।”

পাঠকপ্রিয়