সোমবার, ১৯ জানুয়ারি ২০২৬

সর্বশেষ

মিতার অরণ্য জয়: দেশের প্রথম নারী ফরেস্টারের গল্প

শরীফুল রুকন

এই গল্পের পরতে পরতে লুকিয়ে আছে অদম্য সাহস আর হার না মানা জেদের এক অসাধারণ উপাখ্যান। মিতা তঞ্চঙ্গ্যা, নামটি যেন পাহাড়ের দৃঢ়তা আর অরণ্যের স্নিগ্ধতার মিশেলে গড়া।

২১শে জানুয়ারির সেই দিনটির কথা ভাবুন। ঢাকায় বন ভবনে জড়ো হয়েছেন বহু প্রার্থী, সবার চোখেমুখে বন বিভাগে কাজ করার স্বপ্ন। কিন্তু সবার কপালে কি আর সেই স্বপ্ন পূরণের সৌভাগ্য জোটে? ফরেস্টার বা বন বিট কর্মকর্তা পদে শুধু শিক্ষাগত যোগ্যতা নয়, শারীরিক উচ্চতাও যে হতে হবে ৫ ফুট ৪ ইঞ্চি! মিতা দেখলেন, কত স্বপ্ন ফিকে হয়ে যাচ্ছে শুধু উচ্চতার মাপকাঠিতে। নিজের উচ্চতা নিয়ে আত্মবিশ্বাসী মিতাও কি একটু ভয় পেয়েছিলেন? পেয়েছিলেন নিশ্চয়ই। কিন্তু যখন মিতার পালা এলো, দুরুদুরু বুকে এগিয়ে গেলেন। বুকের মাপ নেওয়া হলো, তারপর উচ্চতা। খাতায় লেখা হলো— পাঁচ ফুট চার ইঞ্চি। যেন এক স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন মিতা। ভাইভা বোর্ডেও থাকল সেই আত্মবিশ্বাসের ছাপ।

এ তো গেল পরীক্ষার কথা। কিন্তু মিতার জীবনের গল্পটা তো আরও গভীর। কাপ্তাইয়ের হাজাছড়ি হেডম্যানপাড়ার সবুজ অরণ্যে বেড়ে ওঠা মিতা যেন প্রকৃতিরই এক সন্তান। দুই ভাই, তিন বোনের মধ্যে সবচেয়ে ছোট মিতার শৈশব কেটেছে পাহাড় আর বনের নিবিড় সান্নিধ্যে। অভাব-অনটন ছিল নিত্যসঙ্গী, কিন্তু তাতে কি আর স্বপ্নের পথে বাধা দেওয়া যায়? বড় বোন আর ভগ্নিপতির অনুপ্রেরণায় রাজস্থলী তাইতংপাড়া সরকারি উচ্চবিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাশ করে ভর্তি হলেন চট্টগ্রামের ফরেস্ট্রি সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি ইনস্টিটিউটে।

কিন্তু কলেজে ভর্তি না হয়ে কেন ফরেস্ট্রিতে ডিপ্লোমা? মিতা জানতেন, বন বিভাগে নারীদের জন্য সুযোগ আসছে। তাই ২০১৫-২০১৬ সাল থেকে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ডিপ্লোমা ইন ফরেস্ট্রি কোর্সে নারী শিক্ষার্থী ভর্তি করানো হচ্ছে। আর মিতার উচ্চতা? সে তো বনের সুবিশাল বৃক্ষের মতোই মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর জন্য প্রস্তুত!

তৃতীয় ব্যাচের শিক্ষার্থী হিসেবে ফরেস্ট্রিতে ভর্তি হলেন মিতা। এরপর? ভালোবাসার বাঁধনে বাঁধা পড়লেন বান্দরবানের সুবল তঞ্চঙ্গ্যার সাথে। সংসার আর পড়াশোনা— দুটোই চলতে থাকল সমান তালে। করোনার থাবা এসে সবকিছু এলোমেলো করে দিল। চার বছরের ডিপ্লোমা শেষ হতে লাগল পাঁচ বছর। কিন্তু তাতে কি মিতার অদম্য স্পৃহাকে দমানো যায়? একটি বেসরকারি সংস্থায় চাকরির পাশাপাশি চলল ফরেস্টার পদের জন্য প্রস্তুতি। প্রথমবার হয়তো ভাগ্য সহায় ছিল না, কিন্তু দ্বিতীয়বারে ঠিকই ধরা দিল সাফল্য।

১৫৯ বছরের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করলেন মিতা তঞ্চঙ্গ্যা। ১৮৬৬ সালে বেঙ্গল ফরেস্ট্রি ডিপার্টমেন্টের হাত ধরে যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, তারই ধারাবাহিকতায় মিতা হলেন বাংলাদেশের প্রথম নারী ফরেস্টার, যিনি সরাসরি মাঠ পর্যায়ে বন রক্ষার দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিলেন। চট্টগ্রামের সাতকানিয়ার মাদার্শা রেঞ্জে তাঁর কর্মস্থল।

বিট কর্মকর্তা হিসেবে মিতার কাজটা কিন্তু সহজ নয়। বনপ্রহরী, বাগানমালি ও অন্যান্য কর্মচারীদের নিয়ে বন রক্ষা করা, বনদস্যু বা বনাঞ্চল ধ্বংসকারী, বনজ সম্পদ পাচারকারীদের মোকাবিলা করা—এ সবই তাঁর দায়িত্ব।

বন অধিদপ্তরের ফরেস্ট রেঞ্জার আবিদা সুলতানা যেমনটি বলেছেন, বন অধিদপ্তরে ফরেস্ট রেঞ্জার, বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) ও উচ্চ পদে অনেক নারী কর্মকর্তা থাকলেও, মিতাই প্রথম নারী ফরেস্টার। এর আগে ২০১৬ সালে বনপ্রহরী পদে দিলরুবা মিলি নামে একজন নারী যোগ দিলেও, ফরেস্টার পদে মিতাই প্রথম।

মিতা বলেন, “পাহাড়ে বনাঞ্চলে বেড়ে উঠেছি। কর্মজীবনের শুরুতে শৈশব থেকে দেখা বনাঞ্চল রক্ষার কাজ পেয়ে খুবই ভালো লাগছে। … আমার এখন কাজ শেখার সময়।” মিতার এই কথাগুলো যেন নতুন প্রজন্মের জন্য এক অনুপ্রেরণা, এক নতুন পথের দিশা।

পাঠকপ্রিয়