সোমবার, ১৯ জানুয়ারি ২০২৬

সর্বশেষ

যে গ্রন্থাগার আগলে রেখেছে কোরআনের ৪০০ বিরল পাণ্ডুলিপি

নিজস্ব প্রতিবেদক

সৌদি আরবের কিং আব্দুল আজিজ পাবলিক লাইব্রেরি শুধু একটি জ্ঞানভান্ডার নয়, এটি ইসলামী শিল্পকলা ও ইতিহাসের এক জীবন্ত সংগ্রহশালা। সময়ের ধুলো এড়িয়ে এখানে সযত্নে রক্ষিত আছে পবিত্র কোরআনের ৪০০টি অত্যন্ত দুর্লভ ও ঐতিহাসিক কপি, যা হিজরি দশম থেকে ত্রয়োদশ শতকের (আনুমানিক ১৬শ থেকে ১৯শ শতক) ইসলামিক ঐতিহ্যের ধারক। এই সংগ্রহ কেবল সংখ্যায় বিপুল নয়, বরং বিভিন্ন যুগের ক্যালিগ্রাফি, অলঙ্করণ, বাঁধাই এবং হস্তলিপির বৈচিত্র্যেও অনন্য, যা দর্শকদের নিয়ে যায় ইসলামী শিল্প ও সংস্কৃতির এক সোনালী অতীতে।

সৌদি গেজেটের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গ্রন্থাগারটির এই অমূল্য ভান্ডারটি বিভিন্ন আরব ও ইসলামী যুগের শৈল্পিক উৎকর্ষের এক উজ্জ্বল প্রতিচ্ছবি। প্রতিটি কপি যেন একেকটি স্বতন্ত্র শিল্পকর্ম, যা তৎকালীন ক্যালিগ্রাফার, নকশাবিদ ও শিল্পীদের সৃজনশীলতা, ধৈর্য এবং ধর্মীয় অনুরাগের স্বাক্ষর বহন করে। সোনালি হরফ, জটিল জ্যামিতিক নকশা, আর মনোমুগ্ধকর লতাপাতার অলঙ্করণে সজ্জিত এই কোরআনগুলো ইসলামী সংস্কৃতির গভীরতা ও নান্দনিকতার প্রমাণ দেয়। এগুলো শুধু ধর্মগ্রন্থ নয়, বরং একেকটি ঐতিহাসিক ও শৈল্পিক দলিল।

সংগ্রহের মধ্যে এমন কিছু কোরআন রয়েছে যা দর্শকদের বিশেষভাবে আকর্ষণ করে। উদাহরণস্বরূপ, হিজরি ১২৮৪ সনে পারস্যের দার্শনিক ও সুফি ফখর আল-দীন আল-সোহরাওয়ার্দীর মুদ্রিত একটি কপিতে আয়াতুল কুরসি অংশটি অসাধারণ অলঙ্করণে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে, যার দুই পাশের মলাট সোনায় মোড়ানো এবং সোনালি ফ্রেমে পবিত্র আয়াত লেখা হয়েছে।

আবার, হিজরি ১২৪০ সনে নাসখ লিপিতে তৈরি ৩০ পাতার আরেকটি কপির প্রায় পুরোটাই সোনার পানিতে আঁকা চমৎকার লতাপাতার অলঙ্করণে শোভিত, এমনকি পাশের ফ্রেমগুলোতেও রয়েছে সোনার কারুকাজ। মক্কার পবিত্র ভূমিতে হিজরি ১০২৫ সনে দার্শনিক মোল্লা আলী আল-কারী তৈরি করেছিলেন ভিন্নধর্মী একটি অনুলিপি, যেখানে কালো কালির হরফের সাথে লাল ও নীল রঙের নোকতা (স্বরচিহ্ন) ব্যবহৃত হয়েছে, যা তৎকালীন লিখনরীতির পরিচায়ক।

হিজরি ৯২০ সনে চামড়ায় বাঁধানো এবং সোনালি নোকতায় সজ্জিত আরেকটি সম্পূর্ণ কোরআনও এই সংগ্রহের অংশ, যেখানে সুরার শুরুতে লতাপাতা ও জ্যামিতিক নকশা রয়েছে। এর মধ্যে একটি কপিকে তো সবচেয়ে রাজকীয় অনুলিপিগুলোর মধ্যে অন্যতম হিসেবে গণ্য করা হয়, যেখানে কালো কালির হরফের সাথে সোনালি, সবুজ, লাল ও নীল—বিভিন্ন রঙের নোকতা এবং সোনার পানিতে আঁকা ফুল-পাতার নিঁখুত নকশা রয়েছে, যা ইসলামী শৈল্পিক সৌন্দর্যের এক চূড়ান্ত নিদর্শন এবং এটি মোমের প্রলেপে আবৃত।

এই বিশেষ কপিগুলো ছাড়াও সংগ্রহটি ইসলামী বিশ্বের বিশাল ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের সাক্ষ্য দেয়। এখানে কুফিক লিপির প্রাচীন রূপ থেকে শুরু করে নাসখ, থুলুথ, টিমবুকটু এবং সুদানিজ লিপিতে লেখা কোরআন যেমন রয়েছে, তেমনি আন্দালুসীয় ও মরক্কোর বর্গাকার শৈলী, ভারতীয় পাণ্ডুলিপির লতাপাতার সজ্জা, এমনকি চীনা, কাশ্মীরি ও মামলুক আমলের শৈল্পিক নিদর্শনও বিদ্যমান। লেভান্ত, ইরাক, মিশর, ইয়েমেন এবং আরবের নজদি ও হিজাজি অঞ্চলের নিজস্ব লিখনশৈলীও এই সংগ্রহকে সমৃদ্ধ করেছে, যা ইসলামিক চিত্রকলার এক বিস্তৃত ইতিহাস তুলে ধরে।

প্রতিটি অঞ্চলের শিল্পীরা তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি, পছন্দ ও প্রতিভার ছোঁয়া রেখেছেন এই অনুলিপিগুলোতে। গ্রন্থাগার কর্তৃপক্ষ অত্যন্ত যত্ন সহকারে এই অমূল্য কপিগুলোকে মুদ্রণের লিপি, লেখার অঞ্চল, সময়কাল এবং সজ্জা অনুযায়ী বিন্যস্ত করেছে, যা গবেষক ও দর্শনার্থীদের জন্য ইসলামী হস্তলিপি ও শিল্পের বিবর্তন বুঝতে সহায়ক হয়েছে।

কিং আব্দুল আজিজ পাবলিক লাইব্রেরির এই কোরআন সংগ্রহ নিছক ধর্মগ্রন্থের সংকলন নয়, এটি শত শত বছরের ইসলামী সভ্যতা, শিল্পরুচি, এবং বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক পরিচয়ের এক নীরব সাক্ষী। প্রতিটি পৃষ্ঠা, প্রতিটি নকশা, প্রতিটি হরফ যেন কথা বলে ওঠে অতীতের গল্প নিয়ে, যা ইসলামী ঐতিহ্যের এক অমূল্য এবং জীবন্ত দলিল হিসেবে চিরকাল সংরক্ষিত থাকবে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য प्रेरणा ও জ্ঞানের উৎস হয়ে কাজ করবে।

পাঠকপ্রিয়