তুষার ধস, ভয়ঙ্কর ঝড়, সহযাত্রীদের পিছুটান – হিমালয়ের রুদ্রকন্যা অন্নপূর্ণা-১ যেন সব বাধা একসাথেই ছুঁড়ে দিয়েছিল বাবর আলীর দিকে। এভারেস্টজয়ী এই পর্বতারোহীর কাছেও এবারের লড়াইটা মনে হয়েছে আগের সব চ্যালেঞ্জকে ছাড়িয়ে যাওয়া এক কঠিন পরীক্ষা। জানতেন কঠিন হবে, কিন্তু ধারণারও বাইরে গিয়ে অন্নপূর্ণা যে এভাবে তাঁর প্রাণশক্তি আর ইচ্ছাশক্তির চূড়ান্ত পরীক্ষা নেবে, তা ভাবেননি চট্টগ্রামের এই পর্বতারোহী।
তবুও, অদম্য মনোবলে ভর করে সেই কঠিনতম লড়াইয়েই জয়ী হয়েছেন বাবর আলী। এভারেস্ট ও লোৎসে জয়ের পর এবার তিনি পা রাখলেন বিশ্বের দশম উচ্চতম কিন্তু আরোহণের পরিসংখ্যানে সবচেয়ে বিপদসংকুল শৃঙ্গ অন্নপূর্ণা-১ (৮,০৯১ মিটার বা ২৬,৫৪৫ ফুট) এর চূড়ায়। প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে এই অনন্য কীর্তি গড়ার মাধ্যমে বিশ্বের সর্বোচ্চ ১৪টি পর্বতের মধ্যে তিনটি জয়ের মাইলফলক স্পর্শ করলেন তিনি।
কঠিন আর ঝুঁকিপূর্ণ এই অভিযানের ক্লান্তি তখনও পুরোপুরি কাটেনি। নেপালের পোখরার হোটেলে বসে বাবর যখন ফোনে তুলে ধরছিলেন তাঁর অন্নপূর্ণা জয়ের রুদ্ধশ্বাস যাত্রাপথের গল্প, তাঁর কণ্ঠের উচ্ছ্বাসই বলে দিচ্ছিল এক অসাধ্য সাধনের আনন্দ।
পর্বতরাজির সম্মেলন: অন্নপূর্ণা
উত্তর-মধ্য নেপালের পোখরা শহর থেকে উত্তরে কালী গণ্ডকি ও মার্সেয়ান্দি নদীর উপত্যকা জুড়ে প্রায় ৩০ মাইল দীর্ঘ এক সুবিশাল শৈলশিরার নাম অন্নপূর্ণা। এটি কেবল একটি পর্বত নয়, যেন ছয়টি আকাশছোঁয়া দৈত্যের সম্মেলন। হাত ধরাধরি করে দাঁড়িয়ে থাকা এই পর্বত প্রাচীরের চারটি প্রধান শৃঙ্গ হলো অন্নপূর্ণা ১, ২, ৩ ও ৪। সাথে আছে আরও দুটি সুউচ্চ পর্বত – অন্নপূর্ণা সাউথ ও গঙ্গাপূর্ণা। এদের মধ্যে অন্নপূর্ণা-১ সবার চেয়ে উঁচু (৮,০৯১ মিটার)। বাকি পাঁচটিও ৭ হাজার মিটারের বেশি উচ্চতার: অন্নপূর্ণা-২ (৭৯৩৭ মি.), অন্নপূর্ণা-৩ (৭৫৫৫ মি.), অন্নপূর্ণা-৪ (৭৫২৫ মি.), গঙ্গাপূর্ণা (৭৪৫৫ মি.) এবং অন্নপূর্ণা সাউথ (৭২১৯ মি.)। এই পর্বতশ্রেণির পশ্চিম প্রান্তের অন্নপূর্ণা-১ তাই পর্বতারোহীদের কাছে এক চূড়ান্ত চ্যালেঞ্জ।
যাত্রা শুরু ও অপ্রত্যাশিত ঝড়
অন্নপূর্ণা-১ অভিযানের লক্ষ্যে বাবর আলী বাংলাদেশ ছাড়েন গত ২৪ মার্চ। প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সেরে ২৬ মার্চ কাঠমান্ডু থেকে বিমানে পোখরা পৌঁছান। এরপর গাড়িতে ও পায়ে হেঁটে ২৮ মার্চ পৌঁছান অন্নপূর্ণা বেসক্যাম্পে (৪১৯০ মিটার)। একদিন বিশ্রাম নিয়ে শুরু হয় উচ্চতার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার পালা। ক্যাম্প-১ (৫২০০ মিটার) এ দুই রাত এবং ক্যাম্প-২ (৫৭০০ মিটার) এ এক রাত কাটিয়ে ২ এপ্রিল বাবর নেমে আসেন বেসক্যাম্পে। পরিকল্পনা ছিল, অনুকূল আবহাওয়ার জন্য অপেক্ষা করা এবং চূড়ান্ত আরোহণের আগে পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেওয়া।
কিন্তু বিশ্রাম দীর্ঘায়িত হলো না। বেসক্যাম্পে নেমেই জানতে পারলেন, আবহাওয়ার পূর্বাভাস অনুযায়ী, আরোহণের সেরা সময়টা ৩ থেকে ৬ এপ্রিল। তাই মাত্র ২৪ ঘণ্টার বিশ্রাম নিয়েই আবার শুরু করলেন চূড়ান্ত আরোহণের যাত্রা।
৩ এপ্রিল রওনা হয়ে পরদিন বাবর পৌঁছান ক্যাম্প-২ তে। কিন্তু ৪ এপ্রিল বিকেল থেকেই শুরু হয় ভয়ঙ্কর তুষার ঝড়। সেই দুর্যোগ মাথায় নিয়েই ৫ এপ্রিল তিনি পৌঁছান ক্যাম্প-৩ এ (৬৪০০ মিটার)। বাবরের ভাষায়, “ক্রমাগত তুষার পড়ছিল, অনেকটা টানা বৃষ্টির মতো। থামার উপায় নেই, কারণ দু’পাশের ঢাল থেকে পাথরও গড়িয়ে পড়ছিল। যত দ্রুত সম্ভব ওই এলাকা পার হতে হচ্ছিল, তাই গতি কমানোরও সুযোগ ছিল না। যদি ঝড় থামার অপেক্ষা করি, সূর্য উঠলে বরফ গলে বড় চাঙড় খসে পড়বে। তাই ঝুঁকি নিয়েই তুষার ঝড়ের ভেতর দিয়ে এগোতে হয়েছে।” এই ভয়ঙ্কর পথেই তাঁর সঙ্গে থাকা এস্তোনিয়ার এক পর্বতারোহী ঝড়ের কবলে পড়েন।

চূড়ান্ত লড়াই: ক্যাম্প-৩ থেকে শিখরে
সাধারণত পর্বতারোহীরা অন্নপূর্ণা-১ এর ক্যাম্প-৪ (৭৪০০ মিটার) থেকে সামিট পুশ বা চূড়ান্ত আরোহণ শুরু করেন। কিন্তু পরিস্থিতি বিবেচনায় এবং আবহাওয়ার উন্নতির জন্য একদিন অতিরিক্ত অপেক্ষা করে বাবর ও তাঁর গাইড ক্যাম্প-৩ থেকেই সামিট পুশ শুরুর ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেন। এর অর্থ হলো, প্রায় ১৭০০ মিটার উচ্চতা একটানা আরোহণ করতে হবে, যা এক কথায় অকল্পনীয়।
৬ এপ্রিল বিকেল ৪টা ১০ মিনিটে ক্যাম্প-৩ থেকে শুরু হয় সেই দীর্ঘ আরোহণ। বাবরের ভাষায়, “ক্যাম্প-২ থেকে ক্যাম্প-৩ এর মধ্যকার বিশাল করিডরটি সবার নিঃশ্বাস কেড়ে নিল যেন। ক্যাম্প-৩ এর উপরের খাড়া ঢালগুলো ছিল দুঃস্বপ্নের মতো।” একটানা প্রায় সাড়ে সতেরো ঘণ্টা আরোহণের পর ৭ এপ্রিল সকাল ৯টা ৪০ মিনিটে বাবর আলী পা রাখেন অন্নপূর্ণা-১ এর চূড়ায়। সঙ্গে ছিলেন তাঁর গাইড পূর্বা অংগেল শেরপা।
কেমন ছিল সেই মুহূর্ত? বাবর জানালেন, “তখন আবহাওয়া মোটামুটি ভালো ছিল। চূড়ায় ছিলাম মিনিট দশেক। চূড়াটা এতটাই ছোট যে সেখানে দু’জন একসঙ্গে দাঁড়ানোও বেশ কঠিন।” সেদিন আরও কয়েকজন চূড়ায় পৌঁছালেও বাবরের দলের দুই এস্তোনিয়ান ও একজন হাঙ্গেরিয়ান পর্বতারোহী সামিট শেষ করতে পারেননি। সহযাত্রীদের ফিরে যাওয়াটাও মানসিকভাবে বেশ চাপের ছিল বলে জানান তিনি।
মৃত্যুফাঁদ পেরিয়ে ফেরা
অন্নপূর্ণা-১ কেবল উচ্চতার জন্য নয়, এর কুখ্যাতি বিপদসংকুল আরোহণের জন্য। বিশ্বের দশম শীর্ষ পর্বত হলেও মৃত্যুর হারের তালিকায় এটি শীর্ষে। ১৯৫০ সালে মরিস হেরজগ ও লুইস লেচেনাল প্রথম এই শৃঙ্গে আরোহণ করেন, যা আট হাজার মিটারের বেশি উচ্চতার কোনো পর্বতে মানুষের প্রথম সফল অভিযান। কিন্তু এই সাফল্যের বিপরীতে মৃত্যুর হারও অনেক বেশি। গত মৌসুম পর্যন্ত ৫১৪ জন এই পর্বত সামিট করেছেন, যার মধ্যে ৭৩ জনই প্রাণ হারিয়েছেন। ২০১২ সাল পর্যন্ত এই হার ছিল ৩২ শতাংশ, যা বর্তমানে কিছুটা কমে প্রায় ১৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
চূড়ায় পৌঁছানোর পর বাবর আলীর ফেরাটাও সহজ ছিল না। প্রায় ২৬ ঘণ্টার দীর্ঘ আরোহণ ও সামিট পুশ শেষে সেদিনই (৭ এপ্রিল) নামা শুরু করেন তিনি। নেমে আসেন ক্যাম্প-২ পর্যন্ত। ফেরার পথে পায়ে আঘাত পান এবং নিজের চোখের সামনেই আরেক পর্বতারোহীকে তুষার ঝড়ের কবলে পড়তে দেখেন। এতসব বাধা পেরিয়ে নিরাপদে ফিরে আসাটা তাই এক বিশাল অর্জন।

নতুন দিগন্তের হাতছানি
পোখরার নিরাপদ আশ্রয়ে ফিরে বাবর তাঁর ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, “অন্নপূর্ণা-১ আমার সমস্ত প্রাণশক্তি ও ইচ্ছাশক্তির পরীক্ষা নিয়েছে… একটানা ১৭০০ মিটার আরোহণ কোনো মজার বিষয় ছিল না। চূড়ায় পৌঁছাতে ১৭ ঘণ্টা লেগেছিল। আর পুরো যাত্রা প্রায় ২৬ ঘণ্টার, যা আমার জীবনের সবচেয়ে দীর্ঘতম।”
অন্নপূর্ণা জয়ের পর বাবর আলীর পরবর্তী লক্ষ্য বিশ্বের অষ্টম সর্বোচ্চ শৃঙ্গ মানাসলু (৮১৬৩ মিটার)। আগামী সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে নেপালের এই পর্বত জয়ের অভিযানে নামতে চান তিনি।
তবে কি পর্বতের বাইরে জীবনের পথেও নতুন কোনো অভিযানের ইঙ্গিত দিচ্ছেন বাবর? ফেসবুক পোস্টের শেষে তাঁর রহস্যময় উক্তি, “ইতোমধ্যে অনেকে জানতে চেয়েছেন, এরপর কী? আমার উত্তর হল, নারী-পুরুষের জীবনে আরো কিছু অন্নপূর্ণা আছে।” সেই উত্তরের জন্য আপাতত অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে সবাইকে। তবে পর্বতারোহী বাবরের এই ঐতিহাসিক সাফল্য বাংলাদেশের পর্বতারোহণের ইতিহাসে নিঃসন্দেহে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করল। তাঁর কথায়, “আমি প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে আরোহণ করেছি, সেটা বলতে চাই না। এরপরও বাংলাদেশ থেকে যারাই অন্নপূর্ণা-১ আরোহণ করবেন, সেটা অনন্য হয়েই থাকবে।”