মিষ্টি পানের জন্য বিখ্যাত কক্সবাজারের দ্বীপ উপজেলা মহেশখালীর পান চাষিরা চলতি মৌসুমে উৎপাদনে বিপ্লব ঘটালেও হঠাৎ করে দাম অস্বাভাবিকভাবে কমে যাওয়ায় চরম সংকটে পড়েছেন। মাত্র দুই মাসের ব্যবধানে পানের দাম অর্ধেকেরও বেশি হ্রাস পেয়েছে, যা গত বছরের তুলনায় অনেক কম। এই পরিস্থিতিতে উৎপাদন খরচ তো দূরের কথা, বরজ থেকে পান তোলার শ্রমিকের মজুরিও উঠছে না, ফলে উপজেলার প্রায় ১৩ হাজার পান চাষি পরিবার চরম ক্রান্তিকাল পার করছে।
কালারমার ছড়া ইউনিয়নের পানচাষি মো. সেলিম হতাশা ব্যক্ত করে জানান, “গত বছর যেখানে বড় আকারের প্রতি বিরা (৮০টি পান) পান ৫০০ থেকে সাড়ে ৫০০ টাকায় বিক্রি করেছি, সেখানে গত দুই মাস ধরে সেই একই পান বিক্রি করতে হচ্ছে মাত্র ১৫০ থেকে ১৮০ টাকায়।”
সরেজমিনে উপজেলার হোয়ানক, কালারমারছড়া, বড় মহেশখালী ও শাপলাপুর ইউনিয়নে ঘুরে দেখা যায়, গত বছর পানের ভালো দাম পাওয়ায় উৎসাহিত হয়ে এ বছর চাষিরা প্রায় ১৪০০ হেক্টর জমিতে নতুন উদ্যমে পান চাষ সম্প্রসারণ করেছিলেন। প্রায় ৮ হাজার পান বরজে অন্তত ১৩ হাজার চাষি পরিবার সরাসরি যুক্ত, যাদের কর্মসংস্থান এই পান চাষকে কেন্দ্র করেই। কিন্তু মৌসুমের শুরুতেই দাম পড়ে যাওয়ায় তাদের লাভের আশা দুরাশায় পরিণত হয়েছে।
চাষিরা আরও জানান, একদিকে পানের দাম তলানিতে, অন্যদিকে সার ও পান চাষের আনুষঙ্গিক উপকরণের দাম বাজারে অনেক বেশি। এতে ঋণগ্রস্ত প্রান্তিক চাষিদের পক্ষে চাষাবাদ চালিয়ে যাওয়াই কঠিন হয়ে পড়েছে। তারা উল্লেখ করেন, মৌসুমের শুরুতে বিভিন্ন সমিতি থেকে ঋণ নিয়ে যারা চাষাবাদে নেমেছিলেন, তারা এখন ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে হিমশিম খাচ্ছেন।
মহেশখালী উপজেলা পান চাষি সমবায় সমিতির সভাপতি শাহ আলম বলেন, “মহেশখালীর মিষ্টি পান শুধু দেশেই নয়, বিদেশেও সমাদৃত এবং এটি অতিথি আপ্যায়নের অবিচ্ছেদ্য অংশ। চট্টগ্রামের বিখ্যাত শিল্পী শেফালী ঘোষের গানেও এই পানের উল্লেখ আছে। কিন্তু আজ সেই ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি পানের চাষিরা দিশেহারা।”
তিনি আরও জানান, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে পান রপ্তানি করে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে। এই সংকটময় পরিস্থিতিতে চাষিদের বাঁচিয়ে রাখতে এবং ঐতিহ্যবাহী এই চাষাবাদ টিকিয়ে রাখতে তিনি সরকারের কাছে প্রান্তিক চাষিদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ প্রদানের জোর দাবি জানান।
মহেশখালী উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, দ্বীপটিতে প্রায় ১৪০০ হেক্টর জমিতে প্রায় ৮ হাজার পান বরজ রয়েছে এবং এর সাথে প্রায় ১৩ হাজার চাষি যুক্ত। এখানকার পাহাড়ি এলাকা পান চাষের জন্য বিশেষভাবে উপযোগী হলেও বর্ষার পর সমতল ভূমিতেও মৌসুমী পানের চাষ হয়। মিষ্টি স্বাদের জন্যই মহেশখালীর পান দেশজুড়ে বিখ্যাত, যদিও এখানে কিছু পরিমাণ সাচি পানেরও চাষ হয়ে থাকে।
এই অপ্রত্যাশিত দরপতন মহেশখালীর ঐতিহ্যবাহী পান চাষ এবং এর সাথে জড়িত হাজার হাজার মানুষের জীবন-জীবিকার উপর গুরুতর প্রভাব ফেলেছে, যা থেকে উত্তরণের জন্য দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।