চৈত্রসংক্রান্তি আর নববর্ষ বরণকে ঘিরে পার্বত্য চট্টগ্রামে যখন উৎসবের রঙ, বাতাসে যখন আনন্দের সুর, ঠিক তখনই একটি নাম ঘিরে চলছে বহু বছরের বিতর্ক – ‘বৈসাবি’। পাহাড়ে বসবাসকারী বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর বর্ষবরণ উৎসবগুলোর সম্মিলিত একটি পরিচিতি হিসেবে এই শব্দটি ব্যাপকভাবে প্রচলিত হলেও, এর ব্যবহার নিয়ে রয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া ও রাজনৈতিক টানাপোড়েন। একদিকে যেমন এটি সাংস্কৃতিক ঐক্যের প্রতীক হিসেবে উঠে এসেছে, অন্যদিকে তেমনি আঞ্চলিক রাজনীতির বিভাজনে এটি একটি বিতর্কিত শব্দেও পরিণত হয়েছে।
ঐক্যের সন্ধানে জন্ম ‘বৈসাবি’র
‘বৈসাবি’ নামের যাত্রা শুরু হয় ১৯৮৭ সালে, রাঙামাটি সরকারি কলেজ প্রাঙ্গণ থেকে। তৎকালীন ছাত্র এবং বর্তমানে অস্ট্রেলিয়াপ্রবাসী প্রবীণ খীসা নিজ হাতে একটি দেয়ালিকা লিখেছিলেন পাহাড়ের বর্ষবিদায় ও বরণ উৎসবকে উপজীব্য করে। সেই সময়ের প্রেক্ষাপট ছিল ভিন্ন। সামরিক শাসনের অধীনে সংগঠন বা শোভাযাত্রার মাধ্যমে সম্মিলিত উৎসব উদযাপন ছিল প্রায় অসম্ভব। এই পরিস্থিতিতে পাহাড়ের বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর নিজস্ব উৎসব – ত্রিপুরাদের ‘বৈসু’, মারমাদের ‘সাংগ্রাই’, চাকমাদের ‘বিজু’, তঞ্চঙ্গ্যাদের ‘বিষু’, ম্রোদের ‘চাংক্রান’, খেয়াংদের ‘সাংলান’, খুমিদের ‘চাংক্রাই’ এবং চাকদের ‘সাংগ্রাই’ – এই সবগুলোর নামের আদ্যক্ষর বা ধ্বনিগত মিল থেকে সংক্ষেপে ‘বৈসাবি’ নামটি গ্রহণ করা হয়।
প্রবীণ খীসার মতে, “সামরিক শাসনের সেই সময়ে কোনো সংগঠনের নামে উৎসব, শোভাযাত্রা করা সম্ভব ছিল না। এ জন্য পাহাড়ের সব জাতিগোষ্ঠীকে একই সাংস্কৃতিক সংহতির গাঁথুনিতে নিয়ে আসার জন্য ‘বৈসাবি’ নামে প্ল্যাটফর্ম করা হয়েছিল।” এই প্ল্যাটফর্ম থেকেই ১৯৮৮ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রথম ‘বৈসাবি’ শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত হয় এবং হেমল দেওয়ানের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় ‘বৈসাবি’ নামের ম্যাগাজিন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সেই সময়ের উদযাপন কমিটির এক সদস্য জানান, সরকারের দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে এটি ছিল একটি সৃজনশীল প্রতিবাদ, যার জন্য কয়েকজনকে কারাবরণও করতে হয়েছিল।
জনপ্রিয়তা থেকে বিতর্ক
গত শতকের নব্বইয়ের দশক থেকে বিভিন্ন সংগঠন ও কমিটির মাধ্যমে ‘বৈসাবি’ নামটি ব্যাপক পরিচিতি লাভ করে। এটি শুধু পাহাড়ের গণ্ডি পেরিয়ে সারা দেশেই বর্ষবরণের এক পরিচিত নামে পরিণত হয়। আইনজীবী প্রতিম রায় পাম্পু, যিনি নব্বইয়ের দশকে বৈসাবি উদযাপন কমিটির একজন সংগঠক ছিলেন, জানান যে কমিটির ব্যানারে শোভাযাত্রা না হলেও দেয়ালপত্রিকা ও ম্যাগাজিনের মাধ্যমে নামটি ছড়িয়ে পড়ে এবং ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, শুরুতে সরকারিভাবে এই নামের বিরোধিতা থাকলেও পরবর্তীতে সরকারই এই উৎসব উদযাপনে পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছে, এমনকি এবছরও বৈসাবি উপলক্ষে তিন দিনের সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে।
কিন্তু এই জনপ্রিয়তার সমান্তরালেই দানা বাঁধে বিতর্ক। রাজনীতি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করেন, ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির পর পাহাড়ের আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যে বিভক্তি দেখা দেয়, তার প্রভাব পড়েছে ‘বৈসাবি’ নামের উপরও। একটি পক্ষের কাছে শব্দটি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের সৃষ্টি বলে মনে হওয়ায় তারা এর বিরোধিতা করে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ১৯৮৭ সালের কমিটির আরেক নেতা বলেন, “একটি আঞ্চলিক দলের শীর্ষ নেতাদের বৈসাবি শব্দ নিয়ে আপত্তি রয়েছে। তাঁরা মনে করেন, বৈসাবি শব্দটি প্রতিপক্ষ আরেকটি দলের কর্মীদের সৃষ্টি। এ জন্য তাঁরা প্রচার করেন, বৈসাবি নামে পাহাড়ে কোনো উৎসব নেই।” তিনি জোর দিয়ে বলেন, বাস্তবে শব্দটি এসেছিল সাংস্কৃতিক ঐক্যের প্রয়োজনে, কোনো রাজনৈতিক চিন্তা থেকে নয়।
ভবিষ্যৎ কোন পথে?
বিতর্ক সত্ত্বেও ‘বৈসাবি’ নামটি পাহাড়ে চৈত্রসংক্রান্তি ও নববর্ষ উৎসবের সমার্থক হিসেবে অনেকাংশেই প্রতিষ্ঠিত। সরকারি স্বীকৃতি এবং সাধারণ মানুষের কাছে এর ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা একে সহজে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সুযোগ দেয় না। তবে, আঞ্চলিক রাজনীতির বিভক্তি এই নামের ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন জিইয়ে রেখেছে।
পার্বত্য চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরামের সভাপতি গৌতম দেওয়ান এই বিতর্ককে বড় করে দেখতে নারাজ। তিনি বলেন, “বৈসাবি একটি শব্দ। ছোট একটি বিষয়ে মন্তব্য করার কিছুই নেই। সবকিছুতে রাজনীতি নিয়ে আসা উচিত নয়।” তাঁর মতে, গ্রহণ বা বর্জন সময়ই নির্ধারণ করে দেবে।
শেষ পর্যন্ত, ‘বৈসাবি’ নামটি কি শুধুই একটি শব্দ, নাকি পাহাড়ের বহু জাতিগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক মেলবন্ধনের প্রতীক? অথবা এটি কি আঞ্চলিক রাজনীতির বিভাজনের শিকার? উত্তর যা-ই হোক না কেন, বৈসাবিকে ঘিরে পাহাড়ে বর্ষবরণের উৎসবের রঙ ফিকে হয় না, বরং এই বিতর্কই যেন উৎসবের প্রেক্ষাপটে যোগ করে ভিন্ন এক মাত্রা। একটি দেয়ালিকা থেকে জন্ম নেওয়া নাম আজ পাহাড়ের সংস্কৃতি ও রাজনীতির এক জটিল সমীকরণের প্রতিচ্ছবি।