সোমবার, ১৯ জানুয়ারি ২০২৬

সর্বশেষ

ট্রাম্পের শুল্কনীতিতে বিশ্ব অর্থনীতিতে চরম অনিশ্চয়তা, মন্দার চেয়েও খারাপ কিছুর আশঙ্কা

রয়টার্স

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘন ঘন পরিবর্তনশীল শুল্কনীতি বিশ্ব অর্থনীতিতে চরম অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করেছে। বাণিজ্যিক অংশীদারদের ওপর একবার শুল্ক আরোপ, পরক্ষণেই তা স্থগিত বা পরিবর্তন করার নীতি বিশ্ববাজারকে অস্থিতিশীল করে তুলেছে। বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করছেন, এই অনিশ্চয়তা চলতে থাকলে পরিস্থিতি মন্দার চেয়েও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।

চলতি মাসের শুরুতে বিভিন্ন দেশের পণ্যের ওপর পাল্টা শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন ট্রাম্প। যদিও পরে কিছু ক্ষেত্রে তা ৯০ দিনের জন্য স্থগিত করা হয়, চীনের ওপর চাপ কমেনি। দেশটির পণ্যের ওপর শুল্ক বাড়িয়ে ১৪৫ শতাংশ করা হয়েছে। তবে শুক্রবার হোয়াইট হাউস জানায়, চীনের কিছু প্রযুক্তিপণ্যকে এই বর্ধিত শুল্ক থেকে ছাড় দেওয়া হবে, যাতে ভোক্তাপর্যায়ে দাম কিছুটা সহনীয় থাকে। কিন্তু এই স্বস্তি দীর্ঘস্থায়ী না হওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। রোববার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জানিয়েছেন, আগামী সপ্তাহে আমদানি করা সেমিকন্ডাক্টরের ওপর নতুন শুল্ক আরোপ করা হতে পারে, যদিও কিছু প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে নমনীয়তা দেখানো হবে। যেহেতু স্মার্টফোন ও কম্পিউটারের মতো প্রযুক্তিপণ্য তৈরিতে সেমিকন্ডাক্টর অপরিহার্য, তাই এই ঘোষণায় আগের ছাড়ের সিদ্ধান্তটি হুমকির মুখে পড়েছে।

রোববার ফ্লোরিডা থেকে ওয়াশিংটনে ফেরার পথে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের চিপ, সেমিকন্ডাক্টরসহ অন্যান্য প্রযুক্তিপণ্য দেশেই তৈরি করতে চায় এবং এ খাতে অন্য কোম্পানির ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে আগ্রহী। এদিন তিনি সেমিকন্ডাক্টর খাতে জাতীয় নিরাপত্তা সংক্রান্ত বাণিজ্য তদন্তেরও ঘোষণা দেন। স্মার্টফোন ও কম্পিউটারের মতো পণ্য শুল্কমুক্ত থাকবে কিনা, এই প্রশ্নের সরাসরি উত্তর না দিয়ে তিনি নমনীয়তার কথা বললেও, বাণিজ্যমন্ত্রী হাওয়ার্ড লুটনিক জানিয়েছেন, চীনা প্রযুক্তিপণ্যের ওপর শুল্ক ছাড়ের বিষয়টি নতুন করে পর্যালোচনা করা হবে।

ট্রাম্পের এই দ্বিধান্বিত শুল্কনীতিকে অত্যন্ত আশঙ্কাজনক বলে মনে করছেন যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান ব্রিজওয়াটার অ্যাসোসিয়েটের প্রধান বিনিয়োগ কর্মকর্তা রে ডালিও। তিনি এনবিসির ‘মিট দ্য প্রেস’ অনুষ্ঠানে বলেছেন, বিশ্ব একটি সিদ্ধান্তহীনতার শেষ প্রান্তে পৌঁছেছে এবং শুল্কনীতি নিয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত না আসলে মন্দার চেয়েও খারাপ পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। ডেমোক্র্যাট সিনেটর এলিজাবেথ ওয়ারেন এবিসিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্পের নীতির কঠোর সমালোচনা করে বলেন, অর্থনীতিবিদরা বারবার সতর্ক করছেন যে এ ধরনের পদক্ষেপে প্রবৃদ্ধি ব্যাহত হবে এবং মূল্যস্ফীতি বাড়বে। তিনি একে শুল্কনীতির বদলে বিশৃঙ্খলা ও দুর্নীতি বলে অভিহিত করেন। বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান নর্থম্যান ট্রেডারের প্রতিষ্ঠাতা স্বেন হেনরিচ সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন, প্রশাসনের প্রতিদিনকার সিদ্ধান্ত বদলের কারণে মার্কিন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো বিনিয়োগের ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তায় ভুগছে।

এদিকে, মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার সিবিএসের ‘ফেস দ্য নেশন’ অনুষ্ঠানে বাণিজ্য উত্তেজনার জন্য চীনকে দায়ী করে বলেছেন, চীনই পাল্টা শুল্ক আরোপ করে পরিস্থিতি ঘোলাটে করছে। তিনি জানান, যুক্তরাষ্ট্র আগামী ৯০ দিনের মধ্যে কয়েকটি দেশের সঙ্গে অর্থবহ বাণিজ্য চুক্তিতে পৌঁছানোর লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে। ট্রাম্প প্রশাসনের চাপের মুখে বিভিন্ন দেশ এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতার চেষ্টা শুরু করেছে। স্পেনের একটি প্রতিনিধিদল মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্টের সঙ্গে সাক্ষাতের কথা রয়েছে। অন্যদিকে, ভিয়েতনামও ট্রাম্পের শুল্কের আওতায় পড়েছে। দেশটির পণ্যের ওপর ৪৬ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হলেও তা আপাতত ৯০ দিনের জন্য স্থগিত রাখা হয়েছে। তবে পছন্দসই চুক্তি না হলে এই শুল্ক পুনরায় কার্যকর করার হুমকি দিয়েছে ওয়াশিংটন।

যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতির জবাবে চীনও বসে নেই। দেশটি মার্কিন পণ্যের ওপর ১২৫ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক বৃদ্ধি করেছে। পাশাপাশি, বাণিজ্য ঝুঁকি কমাতে এবং সরবরাহ ব্যবস্থা সচল রাখতে চীনা প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের চেষ্টা করছেন। এর অংশ হিসেবে তিনি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া সফরে বেরিয়েছেন এবং সোমবার ভিয়েতনামে কয়েক ডজন সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষর করেছেন। ভিয়েতনামের গণমাধ্যমে প্রকাশিত এক নিবন্ধে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নাম উল্লেখ না করেই বলেছেন, বাণিজ্য ও শুল্কযুদ্ধে কেউ জয়ী হতে পারে না এবং উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থায় পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়াতে হবে। ভিয়েতনাম সফর শেষে তার মালয়েশিয়া ও কম্বোডিয়া যাওয়ার কথা রয়েছে।

বিশ্বব্যাপী এই বাণিজ্য উত্তেজনা ও অনিশ্চয়তার মধ্যেও সোমবার আন্তর্জাতিক শেয়ারবাজারে কিছুটা ইতিবাচক ধারা লক্ষ্য করা গেছে। লন্ডনের এফটিএসই ১০০ সূচক ১.৮ শতাংশ, ফ্রাঙ্কফুর্টের ডাক্স সূচক ২.৫ শতাংশ, প্যারিসের সিএসি ৪০ সূচক ২.২২ শতাংশ এবং ইউরোপের এসটিওএক্সএক্স সূচক ২.৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।

পাঠকপ্রিয়