তিনি উপমহাদেশের প্রথম দাবা গ্র্যান্ডমাস্টার। ১৯৮৭ সালে এই খেতাব অর্জনের মাধ্যমে নিয়াজ মোরশেদ বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে হয়ে উঠেছিলেন এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। দাবার ৬৪ খোপে তাঁর বিচরণের গল্প সবার জানা। কিন্তু এর বাইরেও তাঁর রয়েছে এক বর্ণাঢ্য ও বহুমাত্রিক জীবন। রান্না, গান, ভাষা শিক্ষা, কবিতা লেখা, ভ্রমণ – নানা কিছুতেই রয়েছে তাঁর অবাধ বিচরণ। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে তিনি মেলে ধরেছেন তাঁর সেই অন্য জীবনের পাতাগুলো।
দাবার চালের মতোই নিয়াজ মোরশেদ রপ্ত করেছেন কয়েকটি ভাষা। বড় ছেলেকে দেখে দেরিতে হলেও ভাষা শেখার শখ জাগে তাঁর। স্প্যানিশ ভাষায় পারদর্শী, ফ্রেঞ্চ ও রুশ ভাষাও শিখেছেন কিছুটা। সম্প্রতি তুর্কি ভাষার প্রতিও আগ্রহী হয়েছেন। শুধু ভাষাই নয়, সুরের জগতেও রয়েছে তাঁর পদচারণা। ১৯৯১ সালে বসনিয়ার তুজলা শহরে এক টুর্নামেন্টে গিয়ে মুগ্ধ হয়েছিলেন যুগোস্লাভ গায়ক জ্লাদিকো বেবেকের গানে। সেই সুরকে ভিত্তি করে পরে বাংলা কথা বসিয়ে গান তৈরি করেন। এমনকি ১৯৯৪ সালে ‘অথচ একদিন’ নামে একটি ক্যাসেটও বের করেছিলেন, যার সঙ্গীতায়োজন করেন পার্থ বড়ুয়া। শিখেছেন গিটার বাজানোও, রেনেসাঁর পিলু খানের কাছে। প্রিয় গায়কদের তালিকায় আছেন আব্দুল জব্বার ও শাহনাজ রহমতউল্লাহ।
নিয়াজ মোরশেদ শুধু সুর নয়, শব্দের জগতেও রেখেছেন ছাপ। ‘মাত্র এক কুড়ি’ নামে একটি কবিতার বই লিখেছেন তিনি, তবে নিজের নামে নয়, নাম উল্টে রাখা ছদ্মনামে। ছোটবেলায় রুশ সাহিত্যিক আলেকজান্ডার বেলায়েভের ‘উভচর মানুষ’ ছিল প্রিয় বই। দস্তয়েভস্কি, তলস্তয়ের লেখার পাশাপাশি সম্রাট বাবরকে নিয়ে লেখা ‘বাবর: স্টারি নাইটস’ বইটি তাঁর খুব ভালো লেগেছে। ভ্রমণ করেছেন প্রায় ৫০টি দেশ, যার মধ্যে স্পেন সবচেয়ে প্রিয়। দক্ষিণ আমেরিকায় যাওয়ার ইচ্ছা পোষণ করেন তিনি।
নানা ঘটনার সাক্ষী তাঁর জীবন। ১৯৭৮ সালে কিংবদন্তি বক্সার মোহাম্মদ আলীর সাথে হ্যান্ডশেকের স্মৃতি এখনো অমলিন। স্কুলজীবনের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে মনে করেন সেন্ট যোসেফ স্কুলের শিক্ষক ফণীন্দ্র বণিকের কথা, যাঁর দেওয়া কারক-বিভক্তির কঠিন পরীক্ষায় একমাত্র তিনিই দশে দশ পেয়েছিলেন, যা তাঁর আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দিয়েছিল। সবচেয়ে চমকপ্রদ স্মৃতিটি ১৯৭৯ সালের। জাতীয় দাবায় চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর স্কুলে সংবর্ধনা দেওয়া হয়। সেদিন অষ্টম শ্রেণিতে পড়া তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ছেলে তারেক রহমান তাঁকে ১ টাকা ২৫ পয়সার একটি বার্গার কিনে খাইয়েছিলেন।
একসময় আবাহনীর সমর্থক থাকলেও দাবা লিগে মোহামেডানের হয়ে খেলার সুবাদে পরে দলটির সমর্থক বনে যান। ১৯৮০ সালে স্টেডিয়ামে ফুটবল ম্যাচ দেখতে গিয়ে পুলিশের লাঠির বাড়ি খাওয়ার স্মৃতিও আছে তাঁর। প্রিয় খাবারের তালিকায় আছে খাসির মাথা, ইলিশ মাছ ও চায়নিজ স্টার ফ্রাই। প্রিয় অভিনেতা জাফর ইকবাল ও অভিনেত্রী ববিতা। ভূতে বেশ ভয় পান এবং সুযোগ পেলে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সাথে দেখা করতে চান তাঁর আসল রূপ বোঝার জন্য।
জীবনের অর্জন নিয়ে খুশি হলেও কিছু অতৃপ্তিও রয়েছে। মনে করেন, পড়াশোনা বা খেলাধুলা – যেকোনো একটায় পুরো মনোযোগ দিলে হয়তো আরও ভালো করতে পারতেন। তবে সবচেয়ে বড় আফসোস, অল্প বয়সে মাকে হারানোর আগে তাঁকে যথেষ্ট সময় দিতে না পারা। দাবা না খেললে হয়তো গায়ক বা মিউজিশিয়ান হতেন – এমনটাই মনে করেন উপমহাদেশের প্রথম এই গ্র্যান্ডমাস্টার।