বাংলাদেশের পর্বতারোহণ ইতিহাসে যুক্ত হলো আরও এক স্বর্ণোজ্জ্বল পালক। এভারেস্ট ও লোৎসে জয়ের পর এবার বিশ্বের দশম উচ্চতম, কিন্তু পর্বতারোহীদের মৃত্যুর হারের হিসাবে সবচেয়ে বিপজ্জনক পর্বতশৃঙ্গ অন্নপূর্ণা-১ (৮,০৯১ মিটার) জয় করলেন চট্টগ্রামের বাবর আলী। অন্নপূর্ণা ম্যাসিফের এই সর্বোচ্চ বিন্দুতে পা রাখা পর্বতারোহীদের কাছে এক চূড়ান্ত পরীক্ষা। এর রুক্ষতা, অননুমেয় আবহাওয়া আর প্রতিনিয়ত তুষারধসের ঝুঁকি একে পরিণত করেছে পর্বতারোহণের এক সত্যি মৃত্যুফাঁদে। সেই ভয়াল সুন্দর শিখর জয় করে ফিরে আসার পর বাবর আলী ভাগ করে নিলেন তাঁর সেই শ্বাসরুদ্ধকর অভিজ্ঞতার কথা, যা শুধু শারীরিক সক্ষমতার নয়, মানসিক দৃঢ়তা আর অদম্য ইচ্ছাশক্তিরও এক জীবন্ত দলিল।
অভিযানের চূড়ান্ত পর্বের শুরুটা হয়েছিল ৬ এপ্রিল, বিকেল ৪টা বেজে ১০ মিনিটে। উত্তর অন্নপূর্ণা হিমবাহের বুকে, ৬ হাজার ৪০০ মিটার উচ্চতায় দাঁড়িয়ে ছিলেন বাবর আলী ও তাঁর সঙ্গীরা। চারপাশ তখন বরফের এক জমাটবাঁধা নিথর প্রান্তর। অতি উচ্চতার তীব্র ঠান্ডা আর হাড় কাঁপানো পাতলা বাতাস থেকে বাঁচতে তাঁদের আপাদমস্তক ঢাকা ছিল বিশেষ পর্বতারোহণের পোশাকে। সামনেই মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে ছিল এক বিশাল বরফের দেয়াল, যেন এক দৈত্যাকার প্রহরী আকাশ ছুঁতে চাইছে। এই দেয়ালের শীর্ষবিন্দুতেই রয়েছে তাঁদের আরাধ্য লক্ষ্য – অন্নপূর্ণা-১ এর শিখর। তখনও প্রায় ১ হাজার ৭০০ মিটার খাড়া পথ পাড়ি দেওয়া বাকি। সাধারণ পাহাড়ি পথের দূরত্বকে মিটার বা ফুট দিয়ে মাপা গেলেও, পর্বতের দুর্গমতা আর খাড়াইকে কেবল সংখ্যা দিয়ে বোঝানো যায় না। এর প্রতিটি পদক্ষেপের সাথে জড়িয়ে থাকে ফুসফুসের অসহনীয় চাপ, পেশির চরম ক্লান্তি, আর প্রকৃতির খামখেয়ালিপনার ভয়। বাবরের মনে হচ্ছিল, তাঁরা যেন এক দুর্ভেদ্য বরফ-দুর্গের প্রাচীর ভেদ করতে চলেছেন। পাশাপাশি প্রায় গায়ে গা লাগিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা পাহাড়ের সমষ্টি, যা ‘ম্যাসিফ’ নামে পরিচিত, তার বুক চিরে পথ করে নেওয়াটা ছিল এক বিরাট চ্যালেঞ্জ। তাঁদের পথ দেখানোর জন্য পর্বতের গায়ে আগেই দড়ি লাগিয়ে রাখা হয়েছিল। সেই জীবনরেখায় নিজের আরোহণের সরঞ্জাম ‘জুমার’ লাগানোর সময়েই বাবর মনে মনে স্থির করে নিয়েছিলেন, এই দড়ির শেষ তাঁকে দেখতেই হবে। চূড়া পর্যন্ত দড়ি লাগানোর কঠিন কাজটি তখনও চালিয়ে যাচ্ছিল অগ্রবর্তী শেরপাদের একটি দল। ঠিক আগের দিন বিকেলে হওয়া ভারী তুষারপাত তাঁদের কাজে বেশ খানিকটা বিঘ্ন ঘটিয়েছিল, কমিয়ে দিয়েছিল গতি।
চূড়া অভিযানের শুরুতেই তাঁদের পথ আগলে দাঁড়াল এক বিশাল ও ভয়ঙ্করদর্শন তুষারফাটল বা ক্রেভাস। যেন বরফের রাজ্যের কোনো দানব বিশাল এক হাঁ করে অপেক্ষা করছে শিকারের জন্য। এর গভীরতা অনুমান করাও দুঃসাধ্য। সেফটি রোপ (নিরাপত্তা দড়ি) আর জুমারের মতো আধুনিক সরঞ্জামের উপর অগাধ আস্থা রেখে, অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে তাঁরা সেই বাধা পেরোলেন। এরপরই শুরু হলো প্রায় উল্লম্ব এক বরফের দেয়াল বা আইস ওয়াল বেয়ে আরোহণ। পায়ের নিচে কেবলই জমাট বাঁধা নীলাভ শক্ত বরফ, যা পর্বতারোহীদের ভাষায় ‘ব্লু আইস’ নামে পরিচিত। এই কঠিন বরফে ক্রাম্পনের (জুতার নিচে লাগানো কাঁটাযুক্ত সরঞ্জাম) তীক্ষ্ণ দাঁড়াগুলো গেঁথে এগোনোর সময় এক অদ্ভুত ‘খচরমচর’ শব্দ প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল বরফের রাজ্যে। বাবরের কাছে তখন এই শব্দটিই ছিল চলার পথের একমাত্র সঙ্গীত। এই পরিস্থিতিতে পায়ের বুট আর ক্রাম্পনের কার্যকারিতার ওপর প্রশ্নহীন আনুগত্য দেখানো ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না। একটা বরফের ঢাল পেরোলেই সামনে এসে দাঁড়াচ্ছিল আরেকটা, আরও খাড়া, আরও কঠিন। যেন এই পথের কোনো শেষ নেই। এভাবেই বরফের সাম্রাজ্য ধরে ধীরে ধীরে এগিয়ে চলছিলেন বাবর ও তাঁর সঙ্গীরা।
ক্রমশ দিনের আলো ম্লান হয়ে এল, চারপাশ গ্রাস করল সন্ধ্যার জমাট বাঁধা অন্ধকার। সূর্য অস্ত যাওয়ায় পথ দেখার জন্য এখন একমাত্র ভরসা কপালে বাঁধা হেডল্যাম্পের বৃত্তাকার একফালি আলো। বিশাল এই পর্বতের বুকে দৃষ্টিসীমাও সীমাবদ্ধ হয়ে গেল ওই ছোট্ট আলোর বৃত্তে। পর্বতের গায়ে সর্পিল, বরফঢাকা পথ ধরে এগিয়ে চলা, এ যেন এক অনন্ত যাত্রা। এই কঠিনতম মুহূর্তে বাবরের সঙ্গী ছিলেন ফুর্বা অঙ্গেল শেরপা, যিনি কেবল তাঁর ক্লাইম্বিং গাইডই নন, এই বিপদসংকুল পথে তাঁর সবচেয়ে বড় মানসিক আশ্রয়ও। বাবরের খানিকটা সামনেই পথ চলছিলেন পর্বতারোহণ জগতের এক জীবন্ত কিংবদন্তী, সানু শেরপা। তিনি সম্পর্কে ফুর্বার বড় ভাই। পৃথিবীতে ৮ হাজার মিটারের বেশি উঁচু পর্বতশৃঙ্গ রয়েছে মোট ১৪টি। এগুলোর প্রতিটিতে একবার করে আরোহণ করাটাই যেখানে পর্বতারোহীদের কাছে স্বপ্নের মতো, অতিমানবীয় এক অর্জন বলে বিবেচিত হয়, সেখানে সানু শেরপা এই অবিশ্বাস্য কাজটি করেছেন দুইবার! এই গ্রহে এমন কৃতিত্ব আর কোনো মানবসন্তানের নেই। এটি ছিল তাঁর তৃতীয়বারের মতো ১৪টি আট-হাজারি শৃঙ্গ আরোহণের প্রচেষ্টা, যার অংশ হিসেবে তিনি এবার অন্নপূর্ণা অভিযানে সামিল হয়েছিলেন। বাবর মুগ্ধ বিস্ময়ে আর গভীর শ্রদ্ধায় দেখছিলেন তাঁর পথচলা। সানু শেরপার প্রতিটি পদক্ষেপ ছিল অভিজ্ঞতা আর আত্মবিশ্বাসের প্রতিচ্ছবি।
বাবর উল্লেখ করেন, ‘আট হাজার মিটারের উপরের জগৎটা আসলেই অন্যরকম। এখানকার বাতাস এতটাই পাতলা যে প্রতিটা পদক্ষেপ নিতে হয় মেপে মেপে, প্রতিটা নিঃশ্বাস নিতে হয় হিসেব করে। এখানকার নিয়মকানুন সমতলের চেয়ে একেবারেই ভিন্ন।’ চূড়ায় ওঠার উত্তেজনায় যদি কেউ সমস্ত শক্তি নিঃশেষ করে ফেলে, তবে তার জন্য অপেক্ষা করে থাকে ভয়ঙ্কর বিপদ। কারণ, নিরাপদে নিচে নেমে আসার জন্যও প্রয়োজন হয় যথেষ্ট শক্তি, মনোযোগ আর সঠিক পরিকল্পনা। অতি উচ্চতার পর্বতে আরোহণের চেয়েও অনেক সময় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে কখন থামতে হবে, কতটা বিশ্রাম নিতে হবে, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা। বাবর পর্বতের বিশাল কাঁধ বেয়ে ধীরে ধীরে উঠতে উঠতে সানু শেরপার অভিজ্ঞতা থেকে সেই অমূল্য জ্ঞানই আহরণের চেষ্টা করছিলেন।
আরও কিছুটা পথ চলার পর, একটি দীর্ঘ ও খাড়া ঢাল বেয়ে উপরে উঠে তাঁরা পৌঁছালেন একটি তুলনামূলক সমতল জায়গায়। এখানেই এক কোণে স্থাপিত হয়েছে ৪ নম্বর ক্যাম্প। উচ্চতা তখন প্রায় ৬ হাজার ৯০০ মিটার। বরফের রাজ্যে ইতস্তত ছড়ানো ছিটানো গোটা তিনেক তাঁবু চোখে পড়ল। কিন্তু তাঁবুগুলোতে প্রাণের কোনো স্পন্দন নেই, চারপাশে যেন কবরের নিস্তব্ধতা বিরাজ করছে। এই তাঁবুগুলো ছাড়িয়ে আবারও সামনে সেই একই দৃশ্য – অন্তহীন বরফের ঢাল।
বাবর জানান, আগে পর্বতারোহীরা ৪ নম্বর ক্যাম্প স্থাপন করতেন আরও উঁচুতে, প্রায় ৭ হাজার ৪০০ মিটার উচ্চতায়। সেটাই ছিল শীর্ষারোহণের আগে শেষ শিবির বা সামিট ক্যাম্প। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে বোঝা গেছে, ওই উচ্চতায় ক্যাম্প স্থাপন করাটা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। সেই পথটি অতিরিক্ত দুর্গম, আর সেখানে প্রতিনিয়ত তুষারধস ও উপর থেকে পাথর খসে পড়ার মারাত্মক ঝুঁকি থাকে। তাই আজকাল অভিজ্ঞ পর্বতারোহীরা কেউই ওই পুরনো ক্যাম্পে রাত কাটানো তো দূরে থাক, সামান্য বিশ্রামের জন্যও থামতে সাহস পান না। জেনেবুঝে কে-ই বা নিজেকে বলির পাঁঠা বানাতে চায়? এর বদলে কিছু পর্বতারোহী দল অপেক্ষাকৃত নিচু এবং কিছুটা নিরাপদ এই ৬৯০০ মিটার উচ্চতার স্থানটিতে ক্যাম্প স্থাপন করেন। বিশেষ করে, যেসকল পর্বতারোহী মনে করেন তাঁদের আরোহণের গতি কিছুটা ধীর, তাঁরাই মূলত এখানে এক রাত কাটিয়ে শেষবারের মতো শক্তি সঞ্চয় করে নেওয়ার চেষ্টা করেন। যদিও বাবর যোগ করেন, এখানেও তুষারধস বা পাথর পতনের ঝুঁকি যে একেবারেই নেই, তা বলা যায় না। বিপদ এখানেও ছায়ার মতো ওঁত পেতে থাকে।
ক্যাম্প ৪ ছাড়িয়ে পথ যেন আরও কঠিন, আরও একঘেয়ে হয়ে উঠল। সামনে একের পর এক খাড়া চড়াইয়ের সারি। যেন কোনো শেষ নেই, কোনো বিশ্রাম নেই। একটা বিশাল চড়াই পেরোলে যখন মনে হয়, এটাই হয়তো শেষ বাধা, ঠিক তারপরেই সামনে এসে সটান দাঁড়িয়ে পড়ে আরও ভীমদর্শন এক চড়াই! আর এই দীর্ঘ চড়াইগুলোর শরীরের ভাঁজে ভাঁজে লুকিয়ে আছে ছোট-বড় নানা আকারের তুষারফাটল বা ক্রেভাস। কোনোটাকে অত্যন্ত সাবধানে পাশ কাটিয়ে যেতে হচ্ছে, কোনোটাকে বা দড়ির সাহায্যে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পেরোতে হচ্ছে। মিনিটের পর মিনিট কেটে যাচ্ছে, মিনিট গড়িয়ে ঘণ্টা হচ্ছে, কিন্তু পথ আর ফুরোতেই চায় না। একঘেয়েমি আর চরম ক্লান্তি আচ্ছন্ন করে ফেলছে শরীর ও মনকে।
বাবরের মনেও তখন প্রশ্ন জেগেছিল, ‘এই কঠিন পথের কি আসলেই কোনো শেষ নেই? এই অন্তহীন অন্ধকারের পর নতুন কোনো ভোর কি আর আসবে না?’ গভীর রাতে, নিঃসঙ্গতার সেই মুহূর্তে তাঁর মাথায় অজান্তেই ঘুরপাক খাচ্ছিল শিল্পী হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সেই বিখ্যাত গানের কলি, ‘পথ হারাব বলেই এবার পথে নেমেছি, সোজা পথের ধাঁধায় আমি অনেক ধেঁধেছি!’

কিন্তু পরক্ষণেই তিনি মনকে শক্ত করেন। না, আক্ষরিক অর্থে পথ হারালে চলবে না। এই বরফের রাজ্যে পথ হারানোর অর্থ নিশ্চিত মৃত্যু। তিনি কায়মনোবাক্যে চাইছিলেন নিরাপদে লক্ষ্যে পৌঁছাতে। তাঁদের বেশ খানিকটা উপরে তখন আরও দুটো হেডল্যাম্পের আলো মিটমিট করে জ্বলছে। যেন রাতের অন্ধকারে দুটো প্রেতচক্ষু তাঁদের অনুসরণ করছে বা পথ দেখাচ্ছে। আপাতত ওই আলো দুটোকেই লক্ষ্য বানিয়ে তাঁরা এগিয়ে চলছিলেন। একটানা প্রায় বিরামহীন পথচলার চরম ক্লান্তি বাবরের শরীরে জেঁকে বসতে শুরু করেছিল। মাপা ছন্দে নেওয়া গভীর নিঃশ্বাস আর বরফে গেঁথে দেওয়া দৃঢ় পদক্ষেপেও মাঝে মাঝে অনিচ্ছাকৃত শিথিলতা আসছিল। ক্লান্তি দূর করতে আর গলাটা একটু ভেজাতে একবার থামলেন তিনি। বোতল থেকে একটু পানি খাবেন ভেবে বোতলটা মুখের কাছে উপুড় করতেই বুঝলেন, সব শেষ! থার্মোফ্লাস্কের কঠিন জলরোধী আবরণ ভেদ করেও ছয় হাজার মিটারের উপরের কনকনে ঠান্ডা ভেতরের পানিকে কঠিন বরফে পরিণত করে ফেলেছে। এক ফোঁটা পানিও গলার নিচে নামার উপায় নেই। কী আর করা! নিজের মুখের ভেতরের সামান্য থুতুতেই গলাটা ভেজানোর এক করুণ, ব্যর্থ চেষ্টা করলেন বাবর। এমন পরিস্থিতিতে টিকে থাকার এ এক নির্মম বাস্তবতা।
এভাবেই রাতের অন্ধকারের বুক চিরে, এক অনন্ত চড়াই ভেঙে চলেছিলেন বাবর ও তাঁর দল। চলার যেন আর শেষ নেই। কিন্তু দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর একসময় সামনের পাহাড়ের আড়াল থেকে ধীরে ধীরে উঁকি দিতে শুরু করল ভোরের প্রথম আলোকরশ্মি। এতক্ষণ ধরে কুয়াশা আর মেঘের কারণে চূড়া দেখতে না পাওয়ার যে আশঙ্কা বাবরের মনে ভর করেছিল, ভোরের স্বচ্ছ আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গেই তা দূর হয়ে গেল। চরাচর উদ্ভাসিত করে যখন সূর্য উঠল, তখন ঠান্ডায় প্রায় জমে যাওয়া পর্বতারোহীরা যেন নতুন করে প্রাণ ফিরে পেলেন। সূর্যের সোনালী আলো গায়ে মেখে কিছুটা হলেও উষ্ণতার স্বস্তি পেলেন তাঁরা। একই সঙ্গে আবিষ্কার করলেন, চূড়া আর তাঁদের মধ্যেকার দূরত্ব এখন আর খুব বেশি নয়। তাঁদের বহু কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য এখন দৃষ্টিসীমার মধ্যেই। কিন্তু পর্বতারোহণের কঠিন বাস্তবতা হলো, চোখ যত সহজে লক্ষ্যে পৌঁছে যায়, ক্লান্ত পা দুটো কি আর তত সহজে যেতে পারে? বিশেষ করে এই চরম উচ্চতায়, যেখানে বাতাস অক্সিজেনের অভাবে এতটাই পাতলা যে ফুসফুস ফেটে যাওয়ার জোগাড় হয় আর শরীর চরম ক্লান্তিতে ভেঙে পড়তে চায়? নিজের শরীর আর পিঠের ভারী ব্যাকপ্যাকের বিপুল ওজন বহন করে প্রতিটা পা সামনে ফেলতে হচ্ছিল তখন। বাবর তখনও জানতেন না, দৃষ্টিসীমার মধ্যে থাকা ওই চূড়াটুকু কাছে পেতে তাঁদের লেগে যাবে আরও কয়েকটা অসহনীয় ঘণ্টা। শরীর আর মন, দুটোই তখন রাতের পর রাত জেগে পথচলার চরম শ্রান্তিতে প্রায় অসাড়। সমস্ত ইচ্ছাশক্তি একত্রিত করে একেকটা পদক্ষেপ ফেলতে হচ্ছিল তাঁদের। বাবর লক্ষ্য করলেন, তাঁদের আগে আগে চলা অগ্রবর্তী শেরপাদের আরোহণের গতিও বেশ ধীর হয়ে এসেছে। তাঁর সঙ্গী ফুর্বা শেরপার অবস্থাও তথৈবচ। মাঝে মাঝে তাঁরা নিজেরাই নানা প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখার বা ছবি তোলার অজুহাতে থেমে পড়ছিলেন – আসলে উদ্দেশ্য ছিল একটাই, একটু জিরিয়ে নেওয়া, ফুসফুসকে একটু বিশ্রাম দেওয়া। সময় যেন এখানে থমকে গেছে, অতি ধীরে তার গতি। আর তাঁরাও যেন বরফের উপর দিয়ে গড়িয়ে চলা নরম বলের মতো, অতি ধীরে ধীরে উঠছেন। নামার বদলে উঠছেন – এইটুকুই যা পার্থক্য। চূড়ার ঠিক আগের অংশে আবার কয়েকটা পাথুরে খাড়া সেকশন বা অংশ রয়েছে। ক্রাম্পন পরা পায়ে, ক্লান্ত ফুসফুসে সেই পাথুরে অংশগুলো পেরোনোটা ছিল আরেকটা কঠিন শারীরিক ও মানসিক পরীক্ষা। পর্বতের কাজই বোধহয় অভিযাত্রীদের এভাবে পদে পদে পরীক্ষা নেওয়া! তার কাছে ঠিকঠাকভাবে, বিনয়ের সাথে নিজেকে সঁপে দিতে পারলেই তবেই সে তার শিখর স্পর্শ করার অনুমতি দেয় – এমনটাই হয়তো বিশ্বাস করেন পর্বতারোহীরা।
চূড়ার শেষ ঢালটায় দাঁড়িয়ে বাবরের মাথায় কতরকম কাব্যিক ভাবনা যে আসছিল! কত রাতের স্বপ্ন, কত দিনের প্রস্তুতি, কত ত্যাগ-তিতিক্ষা! কিন্তু যখন তিনি নীলাভ কঠিন বরফে ক্রাম্পনের দাঁড়া গেঁথে সত্যি সত্যি চূড়ায় পা রাখলেন, তখন সব কাব্য, সব ভাবনা যেন কর্পূরের মতো উবে গেল। চোখের সামনে তখন কেবলই এক রুক্ষ, কঠিন, ভয়ঙ্কর বাস্তবতা। ক্যাম্প ৩-এর আপাত নিরাপদ আশ্রয় ছেড়ে বেরিয়ে আসার পর পেরিয়ে গেছে দীর্ঘ সাড়ে সতেরো ঘণ্টা। কিন্তু এ কেমন চূড়া! বাবর বিস্মিত হয়ে দেখলেন, সেখানে ঠিকমতো দুজন মানুষ পাশাপাশি দাঁড়ানোরও প্রশস্ত জায়গা নেই! পৃথিবীর দশম সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ, অন্নপূর্ণা-১, যার স্বীকৃত উচ্চতা ৮ হাজার ৯১ মিটার, তার চূড়াটা আসলে একটা দীর্ঘ ও সংকীর্ণ পাথুরে গিরিশিরার সবচেয়ে উঁচু একটা বিন্দু মাত্র। দুটো অত্যন্ত খাড়া ঢাল দুই দিক থেকে এসে তীক্ষ্ণ কোণে এখানে মিশেছে। আর সেই শীর্ষবিন্দুর দুই পাশে তাকালেই বুক কেঁপে ওঠে – নিচে কয়েক হাজার ফুটের অতলান্ত খাদ, যা সোজা তাকিয়ে দেখাও ভীতিজনক। সামান্য একটু ভারসাম্য হারালেই বা পা ফসকালেই নিশ্চিত পতন, সোজাসুজি কয়েক হাজার ফুট নিচে, যেখান থেকে ফিরে আসার কোনো সম্ভাবনা নেই।
ব্যাপারটা যে কতটা বাস্তব আর কতটা ভয়ঙ্কর, তা যেন হাতেকলমে বুঝিয়ে দিতেই ঘটল এক অপ্রত্যাশিত অঘটন। বাবরের সঙ্গী ফুর্বা শেরপা সম্ভবত চারপাশের অবিশ্বাস্য দৃশ্য ক্যামেরাবন্দী করতে গিয়ে বা বাবরকে কিছু একটা দেখাতে গিয়ে হাতের ফোনটা ফসকে ফেললেন। চোখের পলকেই মোবাইল ফোনটি গড়াতে গড়াতে হারিয়ে গেল সেই অতল গহ্বরের গভীরে! মুহূর্তে বাবরের মেরুদণ্ড বেয়ে একটা ঠান্ডা, শিরশিরে স্রোত নেমে গেল। তাঁদেরও যদি এই মুহূর্তে পা ফসকে যায়, তাহলে ঠিক একই পরিণতি হবে। এই হিমশীতল ভাবনাটা তাঁদের শরীর আর মনকে এক মুহূর্তের জন্য যেন অসাড় করে দিল।
পর্বতচূড়ায় পৌঁছানোর পর সাধারণত অভিযাত্রীদের মধ্যে যে বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস বা বিজয়ের আনন্দ দেখা যায়, বাবরের ক্ষেত্রে তার চেয়েও অনেক বেশি প্রবল হয়ে উঠল অন্য এক আদিম অনুভূতি – এখান থেকে যত দ্রুত সম্ভব নিরাপদে নিচে নামা দরকার। এর আগে তিনি এভারেস্ট ও লোৎসের মতো শৃঙ্গে আরোহণ করে চূড়ায় কিছুটা সময় কাটিয়েছেন, ছবি তুলেছেন, দেশের পতাকা উড়িয়েছেন, উদযাপন করেছেন। কিন্তু অন্নপূর্ণার এই মৃত্যুফাঁদের মতো বিপজ্জনক চূড়ায় পাঁচ মিনিটের বেশি সময় কাটানোর সাহসই তাঁর হলো না। ওই স্বল্প সময়ের মধ্যেই তিনি যেন এক বুভুক্ষুর মতো চারপাশের অবিশ্বাস্য ৩৬০ ডিগ্রি প্যানোরামিক দৃশ্য তাঁর চোখের দৃষ্টিতে এবং মনের স্মৃতিতে বন্দী করার চেষ্টা করলেন। ‘পরে যখনই চোখ বন্ধ করব, যেন মানসপটে এই দৃশ্যপট ভেসে ওঠে – এই তো চাওয়া!’
দ্রুত ফোনের ক্যামেরায় কয়েকটি ছবি তুলেই তাঁরা ফিরতি পথ ধরলেন। সামনে তখন পড়ে আছে সেই দীর্ঘ, কঠিন এবং বিপদসংকুল পথ, যা একটু আগেই তাঁরা রাতের অন্ধকারে অমানুষিক পরিশ্রমে পেরিয়ে এসেছেন। এবার নামতে হবে সেই একই পথ ধরে, রাতের ক্লান্তি আর অবসন্ন শরীরটাকে টেনে নিয়ে। প্রতিটা পদক্ষেপ ফেলতে হবে আগের চেয়েও অনেক বেশি সতর্কতার সাথে। কারণ, পর্বতারোহণের কঠিন পরিসংখ্যান এটাই বলে যে, বেশিরভাগ দুর্ঘটনা ঘটে শৃঙ্গ থেকে নামার সময়েই। তখন শরীর চরম ক্লান্ত থাকে, মনোযোগ কমে যায়, আর অভিকর্ষের টান নিচের দিকে নামাকে আরও বেশি বিপজ্জনক করে তোলে। তবুও নামতে হবে, কারণ চূড়ায় পৌঁছানো মানে যাত্রার অর্ধেক মাত্র সম্পন্ন হওয়া। আসল এবং চূড়ান্ত সাফল্য হলো নিরাপদে বেসক্যাম্পে ফিরে আসা। অন্নপূর্ণার চূড়া জয়ের বিপুল আনন্দ আর স্বস্তি তখন বুকের ভেতর সযত্নে চাপা রেখে বাবর আলী ও তাঁর সঙ্গীরা শুরু করলেন তাঁদের দীর্ঘ এবং আরও কঠিন অবতরণ পর্ব – ফিরে আসার লড়াই।
এই লড়াইটাও কম রোমাঞ্চকর বা কম বিপজ্জনক ছিল না। দিনের আলোয় সেই পথকে আরও বেশি ভয়ঙ্কর মনে হচ্ছিল। খাড়া ঢাল, বরফের চাঁই, লুকিয়ে থাকা ক্রেভাস – সবকিছুকে পাশ কাটিয়ে, শরীরের শেষ শক্তিটুকু দিয়ে তাঁরা ধীরে ধীরে নেমে আসছিলেন। প্রতিটা পরিচিত বাঁক, প্রতিটা পাথরের চাঁই যেন পুরনো বন্ধুর মতো তাঁদের স্বাগত জানাচ্ছিল, আবার একই সঙ্গে মনে করিয়ে দিচ্ছিল পথের বাকি দুর্গমতার কথা। অবশেষে দীর্ঘ, ক্লান্তিকর এবং স্নায়ুক্ষয়ী অবতরণের পর তাঁরা যখন বেসক্যাম্পের নিরাপদ আশ্রয়ে ফিরে এলেন, তখন সূর্য পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়েছে। শরীরে ক্লান্তি, চোখেমুখে অবসন্নতার ছাপ, কিন্তু তার চেয়েও বেশি ছিল এক গভীর আত্মতৃপ্তি আর বিজয়ের আনন্দ। পৃথিবীর অন্যতম বিপজ্জনক এক শৃঙ্গকে জয় করে ফিরে আসার স্বস্তি। বাবর আলীর এই অন্নপূর্ণা-১ অভিযান শুধু বাংলাদেশের পর্বতারোহণকেই সমৃদ্ধ করল না, বরং এটি হয়ে রইল সাহস, সহিষ্ণুতা আর মানুষের অদম্য চেতনার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।