ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর আট মাস অতিক্রান্ত হলেও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (চাকসু) নির্বাচনের কোনো সুনির্দিষ্ট রূপরেখা তৈরি হয়নি। নির্বাচন আয়োজনের দাবিতে গঠিত নীতিমালা প্রণয়ন কমিটি নির্ধারিত সময়ে প্রতিবেদন জমা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আসন্ন সমাবর্তন অনুষ্ঠানকে বিলম্বের কারণ হিসেবে উল্লেখ করলেও, এই দীর্ঘসূত্রিতায় নির্বাচন আয়োজন নিয়েই শঙ্কা প্রকাশ করছেন শিক্ষার্থী ও ছাত্র সংগঠনের নেতারা। যদিও প্রশাসন বলছে, আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচন আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে তাদের।
গত বছরের ৫ আগস্ট সরকারের পতনের পর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন করে প্রাণ পায় চাকসু নির্বাচনের দাবি। শিক্ষার্থীদের দাবির মুখে ১০ ডিসেম্বর একটি নীতিমালা প্রণয়ন কমিটি গঠন করে কর্তৃপক্ষ, যার ২৬ জানুয়ারি প্রতিবেদন দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু প্রায় তিন মাস পেরিয়ে গেলেও সেই প্রতিবেদন আলোর মুখ দেখেনি।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সূত্র বলছে, আগামী ১৪ মে অনুষ্ঠিতব্য পঞ্চম সমাবর্তন নিয়েই এখন তাদের সব ব্যস্ততা। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের উপস্থিতির কথা থাকায় এই আয়োজনকে ঘিরে চলছে নিয়মিত প্রস্তুতি সভা। প্রশাসনের দাবি, এই ব্যস্ততার কারণেই চাকসু নির্বাচনের কার্যক্রমে কিছুটা ভাটা পড়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মুহাম্মদ ইয়াহ্ইয়া আখতার চাকসু নির্বাচন প্রসঙ্গে বলেন, “আমরা এখন সমাবর্তন নিয়ে ব্যস্ত। এ বিষয়ে সমাবর্তনের পর কথা হবে।” একই সুরে সহ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক মো. কামাল উদ্দিন জানান, নীতিমালার খসড়া প্রস্তুত। সমাবর্তন শেষে শিক্ষার্থীদের সাথে আলোচনা করে এটি চূড়ান্ত করা হবে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, আগামী তিন মাসের মধ্যে নির্বাচনের রূপরেখা প্রস্তুত করে ডিসেম্বরের দিকে নির্বাচন আয়োজন করা সম্ভব হতে পারে।
তবে প্রশাসনের এই বক্তব্যে আশ্বস্ত হতে পারছেন না শিক্ষার্থীরা। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে সক্রিয় থাকা বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী ধ্রুব বড়ুয়া বলেন, “প্রশাসন চাকসু নির্বাচন নিয়ে যথেষ্ট আগ্রহ দেখাচ্ছে না। নীতিমালা কমিটি প্রতিবেদন দেয়নি, আগস্টের পর শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়নি, অপরাধীদের শাস্তি হয়নি, ছাত্রসংগঠনগুলোর সাথে আনুষ্ঠানিক আলোচনাও শুরু হয়নি। এসব কারণে মনে হচ্ছে, বর্তমান প্রশাসন নির্বাচন নিয়ে সক্রিয় নয়।”
উল্লেখ্য, গত বছরের জুলাইয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ৯ দফার সপ্তম দাবিই ছিল ‘দলীয় লেজুড়বৃত্তিক ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ ও ছাত্রসংসদ চালু করা’। কিন্তু আট মাসেও এর কোনোটিই বাস্তবায়িত হয়নি বলে অভিযোগ শিক্ষার্থীদের।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম চাকসু নির্বাচন হয় ১৯৭০ সালে। প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ পর্যন্ত মাত্র ছয়বার এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে, যার সর্বশেষটি ছিল ১৯৯০ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি। এরপর ছাত্রসংগঠনগুলোর সংঘাত ও অস্থিতিশীল পরিবেশের কারণে আর নির্বাচন হয়নি।
ছাত্রসংগঠনগুলোর সাথে আলোচনা বসেনি প্রশাসন
জানুয়ারিতে চাকসু নির্বাচনসহ বিভিন্ন দাবিতে ‘চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় সংস্কার আন্দোলন’-এর ব্যানারে শিক্ষার্থীরা কর্মসূচি পালন করেন। প্রায় সব ছাত্রসংগঠনই দ্রুত নির্বাচন আয়োজনের দাবি জানিয়ে আসছে। সিন্ডিকেট সভায় ছাত্রসংগঠনগুলোর সাথে আলোচনার সিদ্ধান্ত হলেও বাস্তবে তা হয়নি বলে অভিযোগ ছাত্র নেতাদের।
বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ আল নোমান বলেন, “কর্তৃপক্ষ এখনো আমাদের সাথে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো আলোচনা করেনি। নির্বাচন কবে হবে, তার কোনো স্পষ্ট ধারণা নেই। তবে নির্বাচনের আগে আমরা ছাত্রলীগের অভিযুক্ত নেতা-কর্মীসহ আগের সরকারের সহযোগীদের বিচার চাই।”
ইসলামী ছাত্রশিবিরের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি মোহাম্মদ ইব্রাহিম জানান, তারা জুনের মধ্যেই নির্বাচন চেয়েছিলেন। সমাবর্তনের পর দ্রুততম সময়ে, অর্থাৎ এক-দুই মাসের মধ্যে নির্বাচন চান তারা। তিনি বলেন, “প্রশাসনের সাথে আনুষ্ঠানিক আলোচনা না হলেও অনানুষ্ঠানিকভাবে কথা হয়েছে। আমরা আলোচনার মাধ্যমে নীতিমালা সংশোধন চাই।”
তবে ভিন্নমত পোষণ করেন বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি সুদীপ্ত চাকমা। তার মতে, ক্যাম্পাসে বর্তমানে নির্বাচনের কোনো পরিবেশ নেই। তিনি অভিযোগ করেন, “বর্তমান প্রশাসন একটি নির্দিষ্ট পক্ষের সঙ্গে সমঝোতা করে চলছে। ক্যাম্পাসে উগ্র মৌলবাদী শক্তির তৎপরতাও দেখা যাচ্ছে, যা গণতান্ত্রিক চর্চাকে ব্যাহত করছে। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে নির্বাচন সুষ্ঠু হবে কিনা তা নিয়ে শঙ্কা রয়েছে। দেশে নিরপেক্ষ প্রক্রিয়ায় সরকার গঠনের পর চাকসু নির্বাচন হওয়া উচিত।”
১৯৯০ সালের সর্বশেষ চাকসু নির্বাচনের কমিশনার, শিক্ষাবিদ মুহাম্মদ সিকান্দার খান মনে করেন, ছাত্রসংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে যোগ্য নেতৃত্ব তৈরি হয় যা জাতীয় রাজনীতিতে ভূমিকা রাখে। তিনি বলেন, “নির্বাচন হওয়া জরুরি। সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য শিক্ষক-শিক্ষার্থী উভয়ের আস্থাভাজন নিরপেক্ষ ব্যক্তিদের নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্ব দিতে হবে।”
সব মিলিয়ে, সমাবর্তনের পর প্রশাসন কতটা আন্তরিকভাবে চাকসু নির্বাচনের দিকে মনোনিবেশ করে এবং ছাত্রসংগঠনসহ সকল পক্ষের অংশগ্রহণে একটি গ্রহণযোগ্য পরিবেশ ও নীতিমালা তৈরি করতে পারে, তার ওপরই নির্ভর করছে ৩৪ বছর ধরে বন্ধ থাকা চাকসু নির্বাচনের ভবিষ্যৎ।