সোমবার, ১৯ জানুয়ারি ২০২৬

সর্বশেষ

জলবায়ু পরিবর্তনে চালে বাড়ছে আর্সেনিক, কোটি মানুষের ক্যান্সারের শঙ্কা

নিজস্ব প্রতিবেদক

পৃথিবীর অর্ধেকের বেশি মানুষের প্রধান খাদ্য ভাতে বাড়ছে প্রাণঘাতী আর্সেনিকের মাত্রা। এর কারণ হিসেবে জলবায়ু পরিবর্তনকেই চিহ্নিত করছেন বিজ্ঞানীরা। বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই-অক্সাইডের বৃদ্ধি ও বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির সরাসরি প্রভাবে ধানের মাধ্যমে চালে আর্সেনিক জমা হওয়ার হার বাড়ছে, যা আগামী দশকগুলোতে জনস্বাস্থ্যের জন্য ভয়াবহ হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে সাম্প্রতিক এক গবেষণায় উঠে এসেছে।

চালে আর্সেনিকের উপস্থিতি নতুন কোনো বিষয় না হলেও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এর মাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ার বিষয়টি বিজ্ঞানীদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। মাটি ও পানিতে প্রাকৃতিক ভাবেই আর্সেনিক থাকে এবং ধান চাষের সময় গাছ তা শোষণ করে নেয়। স্বাভাবিক মাত্রার আর্সেনিক মানবদেহের জন্য খুব বেশি ক্ষতিকর না হলেও, দীর্ঘমেয়াদে খাবারের মাধ্যমে শরীরে অজৈব আর্সেনিক প্রবেশ করলে তা ক্যান্সারসহ বিভিন্ন মারাত্মক রোগের কারণ হতে পারে।

চীনের চারটি ভিন্ন অঞ্চলে ১০ বছরের বেশি সময় ধরে ২৮ প্রজাতির ধান নিয়ে করা এক গবেষণা দেখা গেছে, বাতাসে কার্বন ডাই-অক্সাইড ও তাপমাত্রা বৃদ্ধির সাথে সাথে চালে অজৈব আর্সেনিকের পরিমাণ আনুপাতিক হারে বাড়ছে।

গবেষকরা এই তথ্যের ভিত্তিতে একটি মডেল তৈরি করে দেখিয়েছেন, এই ধারা অব্যাহত থাকলে ২০৫০ সাল নাগাদ শুধু চীনেই অতিরিক্ত প্রায় ১ কোটি ৯৩ লাখ মানুষ ক্যান্সারে আক্রান্ত হতে পারে।

কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের এনভায়রনমেন্টাল হেলথ সায়েন্সের সহযোগী অধ্যাপক এবং এই গবেষণার একজন গবেষক লুইস জিসকা বলেন, “জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য দায়ী দুটি প্রধান কারণ—কার্বন ডাই-অক্সাইড বৃদ্ধি এবং তাপমাত্রা বৃদ্ধি—উভয়ই চালে আর্সেনিকের মাত্রা বাড়াতে ভূমিকা রাখছে।” তিনি আরও যোগ করেন, এর ফলে ফুসফুসের জটিলতা ও হৃদরোগের মতো সমস্যাও বৃদ্ধি পাবে।

যদিও গবেষণাটি মূলত চীনের ওপর আলোকপাত করেছে, বিজ্ঞানীরা বলছেন এর প্রভাব বিশ্বব্যাপী পড়বে। ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রসহ চাল উৎপাদনকারী অন্যান্য অঞ্চলেও একই ধরনের প্রভাব দেখা যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, কারণ প্রায় সব অঞ্চলের চালেই কমবেশি অজৈব আর্সেনিক পাওয়া যায়।

আর্সেনিক কমানোর উপায় কী?

বিজ্ঞানীরা চাল থেকে আর্সেনিক কমানোর বিভিন্ন উপায় নিয়ে কাজ করছেন। রান্নার কিছু পদ্ধতি অনুসরণ করে এর মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।

যুক্তরাজ্যের শেফিল্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা দেখিয়েছেন, রান্নার আগে চাল ভালোভাবে ধুয়ে, তারপর গরম পানিতে পাঁচ মিনিট সেদ্ধ করে সেই পানি ফেলে দিয়ে নতুন পানি দিয়ে রান্না করলে সাদা চাল থেকে ৭৪ শতাংশ এবং লাল চাল থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত আর্সেনিক দূর করা যায়।

যুক্তরাজ্যের খাদ্য মান নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা পরামর্শ দেয়, চাল রান্নার আগে ভালোভাবে ধুয়ে, চালের ছয় গুণ পানি দিয়ে রান্না করে মাড় ফেলে দিতে হবে। এরপর প্রয়োজনে পরিষ্কার পানি দিয়ে আরও একবার ধুয়ে নেওয়া যেতে পারে।

এছাড়া, সাদা চালে সাধারণত লাল চালের চেয়ে অজৈব আর্সেনিকের পরিমাণ কম থাকে, যদিও পুষ্টিগুণ লাল চালেই বেশি। বাসমতীর মতো কিছু জাতের চালে প্রাকৃতিকভাবেই আর্সেনিকের মাত্রা কিছুটা কম পাওয়া যায়।

গবেষণার সীমাবদ্ধতা ও গুরুত্ব

গবেষকরা স্বীকার করেছেন, তাদের মডেলে কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। যেমন, তারা ধরে নিয়েছেন ২০৫০ সালেও মানুষের মাথাপিছু চাল খাওয়ার পরিমাণ ২০২১ সালের মতোই থাকবে, যদিও অর্থনৈতিক উন্নয়নের সাথে সাথে খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা থাকে। এছাড়াও, তারা ধরে নিয়েছেন মানুষ সাদা চালই বেশি পছন্দ করবে। যদি লাল চালের দিকে মানুষের ঝোঁক বাড়ে, তবে আর্সেনিকজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।

তবে এসব সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও, কুইন্স ইউনিভার্সিটি বেলফাস্টের অধ্যাপক অ্যান্ড্রু মেহার্গ (যিনি এই গবেষণার সাথে যুক্ত ছিলেন না) এটিকে চাল ও আর্সেনিক বিষয়ে এখন পর্যন্ত হওয়া “সবচেয়ে বিস্তারিত ও শক্তিশালী গবেষণাগুলোর একটি” বলে অভিহিত করেছেন।

এই গবেষণা জলবায়ু পরিবর্তনের একটি ভয়াবহ পরোক্ষ প্রভাবকে সামনে নিয়ে এসেছে, যা কোটি কোটি মানুষের প্রধান খাদ্যের মাধ্যমে তাদের স্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে। এর মোকাবিলায় কার্বন নিঃসরণ কমানোর পাশাপাশি নিরাপদ ধান চাষ ও রান্নার পদ্ধতি নিয়ে আরও গবেষণা ও সচেতনতা বৃদ্ধির ওপর জোর দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।

পাঠকপ্রিয়