ওষুধের প্রাপ্যতা নিশ্চিত এবং চিকিৎসা ব্যয় কমাতে সারা দেশে সরকারি হাসপাতালগুলোতে ‘ফার্মেসি নেটওয়ার্ক’ গড়ে তোলার পরিকল্পনা করছে সরকার। প্রাথমিকভাবে প্রায় ৭০০ হাসপাতালে এই নেটওয়ার্ক চালু হবে, যা সপ্তাহে সাত দিন ২৪ ঘণ্টা খোলা থাকবে।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রথম ধাপে ৪২৯টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, ৫৯টি জেলা হাসপাতাল, ৩৫টি সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং ২১টি বিশেষায়িত হাসপাতাল এই নেটওয়ার্কের আওতায় আসবে। প্রয়োজনে সরকারি অন্যান্য স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান এবং বড় শহরগুলোতে ভাড়াবাড়িতেও ফার্মেসি স্থাপন করা হতে পারে।
এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে ঔষধ শিল্প সমিতি, নাগরিক সমাজ এবং সরকারি বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে একাধিক বৈঠক হয়েছে বলে মন্ত্রণালয় সূত্র নিশ্চিত করেছে। স্বাস্থ্য খাতবিষয়ক সংস্কার কমিটির খসড়া সুপারিশেও এই নেটওয়ার্কের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশে স্বাস্থ্য ব্যয়ের একটি বড় অংশ ব্যক্তির নিজস্ব পকেট থেকে যায়, যার সিংহভাগ খরচ হয় ওষুধের পেছনে। সরকারি হিসাবে, মোট স্বাস্থ্য ব্যয়ের ৭০ শতাংশ ব্যক্তি বহন করে এবং এর ৬৫ শতাংশই ওষুধের জন্য। নতুন ফার্মেসি নেটওয়ার্ক এবং অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের সরবরাহ বাড়লে এই ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী অধ্যাপক মো. সায়েদুর রহমান বলেন, “অনেক হাসপাতালে ফার্মেসি আছে, সেগুলোকে আধুনিক করা হবে। যেখানে নেই, সেখানে দ্রুত নতুন ফার্মেসি হবে। প্রাথমিকভাবে প্রায় ৭০০ ফার্মেসির একটি নেটওয়ার্ক তৈরির কাজ আমরা শুরু করে দিয়ে যাব।”
কেমন হবে এই ফার্মেসি?
স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশনের খসড়া প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রতিটি সরকারি হাসপাতাল ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে একটি করে ফার্মেসি থাকবে। এগুলো পরিচালনা করবেন প্রশিক্ষিত ও নিবন্ধিত ফার্মাসিস্টরা, যারা ওষুধ বিতরণের পাশাপাশি রোগীদের পরামর্শ দেবেন এবং ওষুধের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করবেন।
হাসপাতালে ভর্তি রোগীসহ যে কেউ যেন যেকোনো সময় ওষুধ পায়, সেজন্য ফার্মেসিগুলো ২৪ ঘণ্টা খোলা রাখা হবে। কমিশন অত্যাবশ্যকীয় সব ওষুধ বিনা মূল্যে বিতরণের সুপারিশ করেছে। এছাড়া, কিছু ওষুধ ভর্তুকি মূল্যে এবং কিছু ওষুধ প্রতিযোগিতামূলক বাজারমূল্যে বিক্রির প্রস্তাবও রয়েছে। ডিজিটাল পদ্ধতিতে ওষুধ বিতরণ পর্যবেক্ষণ করে এর অপচয় বা চুরি রোধ করা হবে।
শ্রীলঙ্কা ও থাইল্যান্ডের উদাহরণ টেনে কমিশন বলেছে, এ ধরনের নেটওয়ার্ক ওই দেশগুলোতে ওষুধের প্রাপ্যতা ও সেবার মান বাড়াতে এবং ব্যক্তির চিকিৎসা ব্যয় কমাতে সহায়ক হয়েছে।
অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা হালনাগাদ ও উৎপাদন বৃদ্ধি
রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন এসেনসিয়াল ড্রাগস কোম্পানি লিমিটেডকে (ইডিসিএল) অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর কারখানা আধুনিকীকরণ, জনবল সমন্বয় এবং আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
পাশাপাশি, দেশের রোগের ধরন ও প্রকোপ বিবেচনায় অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা হালনাগাদ করা হচ্ছে। ২০১৬ সালের পর এই প্রথম তালিকাটি সংশোধন করা হচ্ছে, যেখানে বর্তমানে ২৮৫টি ওষুধ রয়েছে। নতুন তালিকায় ক্যান্সার, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপের মতো রোগের ওষুধসহ মোট ওষুধের সংখ্যা ৩০০ ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে জানা গেছে।
শিল্পের উদ্বেগ ও এপিআই প্রসঙ্গ
ওষুধ শিল্প সমিতি ইডিসিএলকে শক্তিশালী করার উদ্যোগকে স্বাগত জানালেও কিছু সুপারিশ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। সমিতির মহাসচিব জাকির হোসেন বলেছেন, শিল্পের সফলতা ঝুঁকিতে পড়ে এমন কোনো পদক্ষেপ নেওয়া উচিত হবে না। অতিমাত্রায় নিয়ন্ত্রণ আরোপ করলে এ শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
অন্যদিকে, ওষুধের কাঁচামাল বা অ্যাকটিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্টস (এপিআই) উৎপাদনে স্বনির্ভরতা অর্জনে জোর দেওয়া হচ্ছে। বর্তমানে চাহিদার মাত্র ৫ শতাংশ এপিআই দেশে তৈরি হয়। এপিআই শিল্প বিকাশে সরকারি নীতি সহায়তা ও প্রণোদনা চেয়েছেন উদ্যোক্তারা।