কক্সবাজারের চকরিয়া ও রামু উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে আগ্রাসীভাবে ছড়িয়ে পড়ছে তামাক চাষ। একসময় যেখানে গোলাপ, ধান আর নানা রকম সবজির আবাদ হতো, সেসব উর্বর জমি এখন চলে যাচ্ছে তামাকের দখলে। বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর লোভনীয় প্রস্তাব এবং চাষের পর নিশ্চিত বিক্রির আশ্বাসে কৃষকরা ঝুঁকে পড়ছেন তামাক চাষে, যা পরিবেশ, জনস্বাস্থ্য এবং স্থানীয় কৃষি অর্থনীতির জন্য মারাত্মক হুমকি তৈরি করছে।
চকরিয়ার বরইতলী ইউনিয়ন একসময় পরিচিত ছিল গোলাপের গ্রাম হিসেবে। এখানকার প্রায় ১০৫ একর জমিতে গোলাপ চাষ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন দুই শতাধিক কৃষক পরিবার। কিন্তু ক্রেতার অভাব এবং প্রতি বছর ৩০ লাখের বেশি গোলাপ গাছেই নষ্ট হয়ে যাওয়ায় লোকসানের মুখে পড়েছেন তারা। এই সুযোগে সেখানে জেঁকে বসেছে তামাক চাষ। ক্ষতিগ্রস্ত গোলাপ চাষিরা এখন লাভের আশায় তামাকের দিকে ঝুঁকছেন। তাদের মতে, তামাক চাষে লাভ বেশি এবং কোম্পানিগুলো নগদ টাকা, বীজ, সার ও কীটনাশক দিয়ে সহায়তা করে।
শুধু বরইতলী নয়, চকরিয়ার কাকারা, সুরাজপুর-মানিকপুর, কৈয়ারবিল, বমুবিলছড়ি, হারবাং, সাহারবিল, ফাঁসিয়াখালী, পূর্ব বড় ভেওলা ইউনিয়ন এবং পৌরসভা এলাকাতেও দ্রুত বাড়ছে তামাকের চাষ। উপজেলা কৃষি অফিসের হিসাব অনুযায়ী, চকরিয়ায় ১ হাজার ৬৬২ একর জমিতে তামাক চাষ হচ্ছে। তবে তামাকবিরোধী বেসরকারি সংস্থা ‘উন্নয়ন বিকল্পের নীতিনির্ধারণী গবেষণা’ (উবিনীগ) এর মতে, বাস্তবে তামাকের জমির পরিমাণ অন্তত তিন হাজার একর বা তারও বেশি। মাতামুহুরী নদীর চরেও অবাধে চলছে এই আগ্রাসন।
একই চিত্র রামু উপজেলাতেও। ফতেখাঁরকুল ইউনিয়নের ফাক্রিকাটা গ্রামে বাঁকখালী নদীর তীরে যেখানে দুই বছর আগেও সোনা মিয়ার মতো কৃষকরা ধান ও সবজি ফলাতেন, সেখানে এখন চলছে তামাকের চাষ। সরকারি জমিতে এই আগ্রাসন চলায় প্রতিকারও চাইতে পারছেন না অনেকে, ফলে সোনা মিয়ার মতো কৃষক বেকার হয়ে পড়ছেন। রামু উপজেলার কচ্ছপিয়া, গর্জনিয়া, ঈদগড়, জোয়ারিয়ানালা ইউনিয়নের অন্তত আটটি গ্রামে দুই হাজার একরের বেশি জমিতে তামাক চাষ হচ্ছে, যার বেশিরভাগই নদী বা বনাঞ্চলের পাশের সরকারি জমি।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, কক্সবাজারের বাঁকখালী ও মাতামুহুরী নদীর তীরবর্তী ২৭টি ইউনিয়নে প্রায় ৫ হাজার একর জমিতে এখন তামাক চাষ হচ্ছে। এর ফলে এসব এলাকার অন্তত এক লাখ কৃষক, যারা আগে ধান ও সবজি চাষ করতেন, তারা পেশা হারিয়ে দিশাহারা।
তামাক চাষ নিরুৎসাহিত করতে সরকারি প্রচারণা খুব একটা কাজে আসছে না বলে মনে করছেন কৃষক ও পরিবেশবিদরা। এর প্রধান কারণ হিসেবে তারা তামাক কোম্পানিগুলোর আর্থিক প্রলোভন এবং চাষিদের তাৎক্ষণিক লাভের বিষয়টিকে চিহ্নিত করেছেন। সুরাজপুর-মানিকপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আজিমুল হক জানান, তিনি চাষিদের নিয়ে সচেতনতামূলক কর্মসূচি করেও ব্যর্থ হয়েছেন, কারণ কোম্পানিগুলোর ফাঁদ থেকে কৃষকদের বের করা যাচ্ছে না।
তামাক চাষের ভয়াবহতা তুলে ধরে উবিনীগ কক্সবাজারের আঞ্চলিক সমন্বয়ক মো. জয়নাল আবেদীন খান বলেন, এর ফলে জমির উর্বরতা শক্তি যেমন কমছে, তেমনি চাষিদের পরিবারসহ আশপাশের মানুষ নানা স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছেন। এছাড়া, তামাক পাতা শুকাতে (কিউরিং) চুল্লিতে প্রতি বছর কোটি কোটি টাকার কাঠ পোড়ানো হচ্ছে, যার বেশিরভাগই আসছে বনাঞ্চল থেকে।
পরিবেশ অধিদপ্তর কক্সবাজারের পরিচালক মো. জমির উদ্দিন জানান, সরাসরি তামাক চাষ বন্ধে তাদের কিছু করার না থাকলেও তামাকের বিষাক্ত রস বা প্রক্রিয়াকরণে জীববৈচিত্র্য ধ্বংস ও স্বাস্থ্যহানির প্রমাণ মিললে তারা আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে পারেন।
এদিকে, রামু উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. রাশেদুল ইসলাম জানিয়েছেন, তামাক চাষের জন্য সরকারি জমি ইজারা দেওয়া হয়নি এবং সরেজমিনে পরিদর্শন করে সরকারি জমি থেকে তামাক চাষ উচ্ছেদ করা হবে।
সব মিলিয়ে, স্বল্পমেয়াদী লাভের আশায় তামাক চাষ কক্সবাজারের কৃষি জমির উর্বরতা, জীববৈচিত্র্য, বনভূমি এবং জনস্বাস্থ্যের জন্য দীর্ঘমেয়াদী এক অশনি সংকেত তৈরি করেছে।