পাহাড় আর সমুদ্রে ঘেরা মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য দীর্ঘদিন ধরেই এক অস্থিতিশীল যুদ্ধক্ষেত্র। এই রাজ্যেরই রাজধানী সিত্তের এক দরিদ্র পরিবারে জন্ম নেওয়া তোয়ান মারত নাইং কৈশোরে দারিদ্র্যের কারণে কাজ নিয়েছিলেন কাচিনের খনিতে। সেখান থেকেই সশস্ত্র সংগ্রামের দীক্ষা আর সামরিক প্রশিক্ষণের হাতেখড়ি। ২০০৯ সালে মাত্র ৩০ বছর বয়সে কয়েকজনকে নিয়ে গড়ে তোলেন আরাকান আর্মি (এএ), দায়িত্ব নেন কমান্ডার ইন চিফের। তার সামরিক কৌশল, জাতিগত পরিচয়ের বোধ এবং রাজনৈতিক দূরদর্শিতার মিশেলে আজ রাখাইনের প্রায় ৯০ শতাংশ এলাকা আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে, যা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ভূরাজনীতির চিত্রপটেও বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে।
১৯৭৮ সালের ৭ নভেম্বর জন্ম নেওয়া নাইংয়ের জীবন শুরু হয়েছিল সাধারণভাবেই। কাচিন রাজ্যের খনিতে কাজ করার সময় কাচিন ইনডিপেনডেন্স আর্মির (কেআইএ) সঙ্গে তার পরিচয় ও ঘনিষ্ঠতা হয়, যারা তাকে গেরিলা যুদ্ধের প্রশিক্ষণ দেয়। ১৯৯৮ সালের দিকে ‘ন্যাশনাল ইউনিটি পার্টি অব আরাকান’-এ যোগ দিতে চাইলেও সেই দলের প্রধান সেনা অভিযানে নিহত হওয়ায় তা সম্ভব হয়নি। পরে ২০০৪ সালে চিকিৎসক নায়ো তোয়ান অংয়ের সঙ্গে মিলে ২০০৯ সালে মাত্র ২৬ জন সদস্য নিয়ে কেআইএ’র সহায়তায় গঠন করেন আরাকান আর্মি। লক্ষ্য ছিল রাখাইন রাজ্যে স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠা।
ইয়াঙ্গুনে পর্যটন গাইড হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতা নাইংকে শুধু ইংরেজিতে দক্ষই করেনি, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে যোগাযোগের পথও খুলে দেয়। একইসঙ্গে তিনি সামরিক কৌশল, দর্শন, আন্তর্জাতিক রাজনীতি, ভূগোল ও ইতিহাসে পারদর্শী হয়ে ওঠেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি একজন গেরিলা নেতার পাশাপাশি চিন্তক ও কৌশলবিদ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেন।
প্রথমদিকে গুরুত্ব না পেলেও আরাকান আর্মিই একসময় মিয়ানমার সেনাবাহিনীর জন্য বড় হুমকি হয়ে ওঠে। এক্ষেত্রে নাইংয়ের জোট গঠনের কৌশল মুখ্য ভূমিকা রাখে। ২০১৫ সালে কাচিন, তাআং ও কোকাং বাহিনীর সঙ্গে ‘ব্রাদারহুড অ্যালায়েন্স’ গঠন করে সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করেন তিনি। ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে মিয়ানমারে সেনা অভ্যুত্থানের পর তিনি স্পষ্টভাবে সেনাশাসনের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন এবং আরাকান আর্মি প্রতিরোধ আন্দোলনের অন্যতম প্রধান শক্তি হয়ে ওঠে।
নাইংয়ের রাজনৈতিক লক্ষ্যও স্পষ্ট – তিনি বরাবরই রাখাইন জনগণের নিজস্ব স্বায়ত্তশাসনের ওপর জোর দিয়েছেন। তার মতে, নতুন মিয়ানমার হবে একটি ফেডারেল কাঠামোর দেশ, যেখানে প্রতিটি জাতিগোষ্ঠী নিজেদের অঞ্চলের ওপর সার্বভৌম কর্তৃত্ব পাবে। এই ভাবনা থেকেই তিনি কাচিন, কারেনের মতো অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর সশস্ত্র সংগঠনগুলোর সঙ্গে ঐক্য গড়ে তোলেন এবং জান্তার বিরুদ্ধে সমন্বিত প্রতিরোধ যুদ্ধে সফল হন।
তার রণকৌশল ছিল মূলত তিন স্তরবিশিষ্ট: প্রথমে গ্রামীণ এলাকা থেকে জান্তা বাহিনীকে উৎখাত ও স্থানীয়দের দলে ভেড়ানো, এরপর স্থানীয় প্রশাসন নিয়ন্ত্রণে নেওয়া এবং সবশেষে আধুনিক অস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহার করে সেনাচৌকিতে আঘাত হানা। এই কৌশলেই ২০২২-২৪ সালের মধ্যে পালেত্তা, মংডু, বুথিডংসহ রাখাইনের বিশাল অংশ আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে আসে।
সামরিক সাফল্যের পাশাপাশি কূটনৈতিক ক্ষেত্রেও নাইং বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়েছেন। চীনের সঙ্গে তার দীর্ঘদিনের জটিল সম্পর্ক রয়েছে। জান্তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ থামাতে চীনের মধ্যস্থতার প্রস্তাব তিনি প্রত্যাখ্যান করেছেন, যা বেইজিংয়ের প্রভাবমুক্ত থাকার ইচ্ছারই প্রতিফলন। তবে রাখাইনে চীনের বিশাল বিনিয়োগ (বিশেষত কিউকফিউ গভীর সমুদ্রবন্দর ও অর্থনৈতিক করিডোর) থাকায় সম্পর্ক ছিন্নও করেননি, বরং একে কৌশলগত সুবিধা আদায়ের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের চেষ্টা করছেন।
ভারতের সঙ্গে তার সম্পর্ক আরও বেশি কৌশলী ও স্তরভিত্তিক। ভারত প্রথমে আরাকান আর্মিকে হুমকি মনে করলেও পরিবর্তিত বাস্তবতা ও চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতার কারণে যোগাযোগ বাড়িয়েছে। নাইং ভারতের ‘অ্যাক্ট ইস্ট’ নীতি ও কালাদান প্রকল্পের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার গুরুত্বকে কাজে লাগিয়ে বোঝাতে সক্ষম হয়েছেন যে, রাখাইনে স্থিতিশীলতার জন্য আরাকান আর্মির সঙ্গে সমন্বয় ভারতের জন্যই লাভজনক। গত বছরের আগস্টের পর থেকে ভারতের সঙ্গে আরাকান আর্মির একাধিক বৈঠক হয়েছে বলে জানা গেছে। নাইংয়ের নীতি হলো, ভারতকে সীমান্ত নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক উদ্যোগে সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়ে বিনিময়ে রাখাইনে তার রাজনৈতিক অবস্থানের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায় করা এবং প্রমাণ করা যে তারা চীনের ‘প্রক্সি’ নয়।
বিশ্লেষকদের মতে, চীন ও ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষায় নাইংয়ের মূল কৌশল হলো ভারসাম্য রক্ষা এবং কোনো এক পক্ষের ওপর নির্ভরশীল না হয়ে রাখাইনের স্বার্থে সর্বোচ্চ সুবিধা আদায়।
তবে আন্তর্জাতিকভাবে নাইংয়ের ভাবমূর্তি বিতর্কের ঊর্ধ্বে নয়। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর প্রতি তার বিদ্বেষপূর্ণ মনোভাব রয়েছে বলে অভিযোগ আছে, যা তাকে সমালোচিত করেছে। ২০২১ সালে নাইংয়ের সাক্ষাৎকার নেওয়া লেখক ও গবেষক আলতাফ পারভেজ বলেন, নাইং বেশ স্মার্ট ও ক্যারিশম্যাটিক নেতা। মাত্র ১৫ বছরে একটি নবীন সংগঠনকে মিয়ানমারের অন্যতম সফল সশস্ত্র বাহিনীতে পরিণত করা এবং দক্ষ বার্মিজ বাহিনীকে পরাজিত করা তার নেতৃত্বের প্রমাণ। তার মতে, নাইং শুরুতে রোহিঙ্গাদের নাগরিক অধিকার দেওয়ার পক্ষে থাকলেও সাম্প্রতিক সংঘাত ও কট্টর জাতীয়তাবাদীদের চাপের মুখে তার অবস্থান পরিবর্তিত হতে পারে।
আলতাফ পারভেজের মতে, নাইং শুধু রাখাইনেই নন, পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের জাতীয়তাবাদী যোদ্ধাদের কাছেও জনপ্রিয় ও অনুপ্রেরণার উৎস। তার কূটনৈতিক দক্ষতাও উল্লেখ করার মতো, কারণ তিনি চীন ও ভারত—উভয় পক্ষের সঙ্গেই নিজস্ব শর্তে সম্পর্ক বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছেন।
ত্রিশ বছর বয়সে সশস্ত্র সংগঠন গড়া এক তরুণ রাখাইনের গণ্ডি পেরিয়ে যেভাবে ভূরাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছেন, তা অভাবনীয়। জনসমর্থন, সুসংগঠিত বাহিনী, কূটনৈতিক চাল এবং স্পষ্ট রাজনৈতিক অবস্থান মিলিয়ে মেজর জেনারেল তোয়ান মারত নাইং আজ শুধু মিয়ানমার নয়, সমগ্র দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ভূরাজনীতিতে এক গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র।