সোমবার, ১৯ জানুয়ারি ২০২৬

সর্বশেষ

বিশ্বজুড়ে কমছে পারমাণবিক অস্ত্রের সংখ্যা, বাড়ছে আধুনিকায়ন ও বিধ্বংসী ক্ষমতা; মানবতা কি পারবে এই মারণাস্ত্রের অভিশাপ থেকে মুক্ত হতে?

পারমাণবিক শক্তিধর কারা, কার ঝুলিতে কত মারণাস্ত্র?

উম্মে কুলসুম

এক ঝলক আলো, তারপর কান ফাটানো শব্দ আর পরমুহূর্তেই এক রাজ্যের ধ্বংসলীলা। যুক্তরাষ্ট্রের ব্যস্ততম মহানগরী নিউইয়র্কের বুকে যদি মাঝারি ক্ষমতার একটি পারমাণবিক বোমা বিস্ফোরিত হয়, তার ফল কী হতে পারে? ইন্টারন্যাশনাল ক্যাম্পেইন টু অ্যাবোলিশ নিউক্লিয়ার উইপনস (আইসিএএন) বা আইক্যানের আঁকা সেই চিত্র ভয়াবহ। তাদের হিসাবে, এমন একটি হামলায় তাৎক্ষণিকভাবে প্রাণ হারাতে পারেন প্রায় ৫ লাখ ৮৩ হাজার ১৬০ জন নিরীহ মানুষ। আহত ও দীর্ঘমেয়াদী তেজস্ক্রিয়তার শিকার হবেন আরও কত লক্ষ, তার ইয়ত্তা নেই। এই একটি পরিসংখ্যানই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, পারমাণবিক অস্ত্র নামক এই দানব মানবসভ্যতার জন্য কতটা ভয়ংকর হুমকি। একবিংশ শতকের এই আধুনিক বিশ্বেও সেই হুমকির কালো মেঘ সরেনি, বরং নতুন করে ঘনীভূত হচ্ছে পৃথিবীর আকাশে।

বিশ্বজুড়ে পারমাণবিক অস্ত্রের চালচিত্র: সংখ্যা কমলেও শঙ্কা বহাল

ফেডারেশন অব অ্যাটোমিক সায়েন্টিস্ট-এর ‘স্ট্যাটাস অব দ্য ওয়ার্ল্ডস নিউক্লিয়ার ফোর্সেস-২০২৫’ শীর্ষক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের হাতে আনুমানিক ১২ হাজার ৩৩১টি পারমাণবিক ওয়ারহেড বা যুদ্ধাস্ত্র মজুদ রয়েছে। এই সংখ্যাটি স্নায়ুযুদ্ধকালীন ৭০ হাজারের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম মনে হলেও, আত্মতুষ্টির কোনো সুযোগ নেই। আইক্যানের মতে, বর্তমান অস্ত্রগুলো অতীতের তুলনায় অনেক বেশি শক্তিশালী, সঠিক এবং বিধ্বংসী ক্ষমতাসম্পন্ন। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, আগামী এক দশকে প্রধান পারমাণবিক শক্তিধর দেশগুলো তাদের অস্ত্রভান্ডারকে আরও আধুনিক ও সম্ভবত সংখ্যায় বড় করার পরিকল্পনা করছে। নতুন করে শুরু হওয়া এই পারমাণবিক প্রতিযোগিতা মানবজাতিকে এক অজানা ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষলগ্নে জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে পারমাণবিক বোমা হামলার পর বিশ্ববাসী প্রথমবারের মতো এর ভয়াবহতা প্রত্যক্ষ করে। সেই বিভীষিকা প্রত্যক্ষ করার পরও ক্ষমতাধর রাষ্ট্রগুলো এই মারণাস্ত্রের পেছনে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ব্যয় করে চলেছে। পারমাণবিক অস্ত্রের মূল ভিত্তি ‘পারস্পরিক নিবারণ’ বা ‘মিউচুয়াল ডেটারেন্স’-এর তত্ত্ব, যেখানে এক পক্ষের হামলা হলে অন্য পক্ষও সমপরিমাণ বা তার চেয়ে বেশি ক্ষতিসাধনে সক্ষম। এই তত্ত্বের ওপর ভর করে দশকের পর দশক ধরে এক ধরনের ভঙ্গুর শান্তি বজায় থাকলেও, এই শান্তির প্রতি পদে রয়েছে ধ্বংসের হাতছানি। সামান্য ভুল বোঝাবুঝি, প্রযুক্তিগত ত্রুটি, কিংবা কোনো নেতার একক হঠকারী সিদ্ধান্ত মুহূর্তে ডেকে আনতে পারে গ্লোবাল পারমাণবিক যুদ্ধ, যার পরিণতি হবে মানবসভ্যতার বিলুপ্তি।

পারমাণবিক শক্তিধর দেশসমূহ: কার ঝুলিতে কত মারণাস্ত্র?

আজকের বিশ্বে ৯টি দেশ পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী বলে পরিচিত, যদিও তাদের মধ্যে ইসরায়েল কখনো আনুষ্ঠানিকভাবে তা স্বীকার করেনি। এই দেশগুলো হলো রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, পাকিস্তান, ভারত, ইসরায়েল ও উত্তর কোরিয়া। এছাড়াও, ন্যাটোর ‘নিউক্লিয়ার শেয়ারিং’ কর্মসূচির আওতায় আরও কয়েকটি দেশে (যেমন ইতালি, তুরস্ক, বেলজিয়াম, জার্মানি, নেদারল্যান্ডস) যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক অস্ত্র মোতায়েন রয়েছে। সম্প্রতি বেলারুশেও রাশিয়ার ট্যাকটিক্যাল পারমাণবিক অস্ত্র স্থাপনের খবর পাওয়া গেছে।

১. রাশিয়া: বিশ্বের বৃহত্তম পারমাণবিক ভান্ডার

পারমাণবিক অস্ত্রের সংখ্যার দিক থেকে রাশিয়া বর্তমানে বিশ্বের শীর্ষে। দেশটির হাতে আনুমানিক ৫ হাজার ৮৮৯টি পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে। এই বিশাল ভান্ডারে রয়েছে ভূমি থেকে নিক্ষেপযোগ্য আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র (আইসিবিএম), সাবমেরিন থেকে নিক্ষেপযোগ্য ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র (এসএলবিএম) এবং বিমান থেকে নিক্ষেপযোগ্য বোমা ও ক্রুজ মিসাইল। অর্থাৎ, জলে-স্থলে-অন্তরীক্ষে – তিনভাবেই পারমাণবিক হামলা চালানোর পূর্ণ সক্ষমতা রাশিয়ার রয়েছে। ২০২২ সালে রাশিয়া তাদের এই পারমাণবিক বহর তৈরি ও রক্ষণাবেক্ষণে ব্যয় করেছে প্রায় ৯৬০ কোটি মার্কিন ডলার। সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন ১৯৪৯ থেকে ১৯৯০ সালের মধ্যে বর্তমান কাজাখস্তানের সেমিপালাতিনস্ক পরীক্ষাকেন্দ্রসহ রাশিয়া ও ইউক্রেনজুড়ে ৭১৫টি পারমাণবিক অস্ত্রের পরীক্ষা চালিয়েছিল, যা এই মারণাস্ত্রের উন্নয়নে তাদের দীর্ঘ ও ভয়াবহ গবেষণার ইতিহাস তুলে ধরে। রাশিয়া এখন পর্যন্ত পারমাণবিক অস্ত্র নিষিদ্ধকরণ চুক্তি বা ট্রিটি অন দ্য প্রোহিবিশন অব নিউক্লিয়ার উইপনস (টিপিএনডব্লিউ)-তে স্বাক্ষর করেনি বা অনুমোদন দেয়নি।

২. যুক্তরাষ্ট্র: দ্বিতীয় শীর্ষ শক্তি ও বিপুল ব্যয়

রাশিয়ার পরেই পারমাণবিক অস্ত্রের সংখ্যার দিক থেকে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির অস্ত্রাগারে আনুমানিক ৫ হাজার ২৪৪টি পারমাণবিক ওয়ারহেড রয়েছে। রাশিয়ার মতোই যুক্তরাষ্ট্রও ভূমি, সাবমেরিন ও বিমান থেকে পারমাণবিক হামলা চালাতে সক্ষম। যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক ওয়ারহেড সংযুক্ত প্রায় ৪০০টি আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র মন্টানা, নর্থ ডাকোটা ও ওয়াইয়োমিং অঙ্গরাজ্যের ভূগর্ভস্থ সাইলোগুলোতে সদা প্রস্তুত রাখা আছে। পারমাণবিক অস্ত্র বহর নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয় সবচেয়ে বেশি। ২০২২ সালে দেশটি এই খাতে খরচ করেছে আনুমানিক ৪ হাজার ৩৭০ কোটি মার্কিন ডলার, যা রাশিয়ার প্রায় সাড়ে চার গুণ। যুক্তরাষ্ট্র ১৯৪৫ থেকে ১৯৯২ সালের মধ্যে মোট ১ হাজার ৩০টি পারমাণবিক পরীক্ষা চালিয়েছে। এর বেশিরভাগই পরিচালিত হয়েছে নেভাদা ও মার্শাল দ্বীপপুঞ্জে। রাশিয়ার মতো যুক্তরাষ্ট্রও টিপিএনডব্লিউ চুক্তিতে শামিল হয়নি।

৩. চীন: ক্রমবর্ধমান শক্তি ও আধুনিকায়ন

চীনের হাতে আনুমানিক ৪১০টি পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে বলে ধারণা করা হয়, যা রাশিয়া বা যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় বেশ কম। তবে চীন দ্রুত তার পারমাণবিক সক্ষমতা বাড়াচ্ছে এবং আধুনিকায়ন করছে। তাদের অস্ত্রগুলোও ক্ষেপণাস্ত্র, সাবমেরিন ও বিমানের মাধ্যমে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম। ১৯৬৪ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত চীন ৪৫টি পরমাণু অস্ত্রের পরীক্ষা চালিয়েছে। ২০২২ সালে চীন এই খাতে ব্যয় করেছে প্রায় ১ হাজার ১৭০ কোটি ডলার। অন্য প্রধান পারমাণবিক শক্তিগুলোর মতো চীনও টিপিএনডব্লিউ চুক্তিকে সমর্থন করেনি। চীনের ক্রমবর্ধমান সামরিক শক্তি এবং পারমাণবিক আধুনিকায়ন এশীয়-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে নতুন করে উত্তেজনার জন্ম দিয়েছে।

৪. ফ্রান্স: ইউরোপীয় পারমাণবিক প্রতিরোধ

ফ্রান্সের কাছে আনুমানিক ২৯০টি পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে। দেশটি মূলত সাবমেরিন থেকে নিক্ষেপযোগ্য ব্যালেস্টিক মিসাইল এবং বিমান থেকে নিক্ষেপযোগ্য ক্রুজ মিসাইলের ওপর নির্ভরশীল। ১৯৬০ থেকে ১৯৯৬ সালের মধ্যে ফ্রান্স আলজেরিয়া ও ফরাসি পলিনেশিয়ায় মোট ২১০টি পারমাণবিক অস্ত্রের পরীক্ষা চালিয়েছে। ২০২২ সালে ফ্রান্স তার পারমাণবিক অস্ত্র বহরের জন্য ব্যয় করেছে প্রায় ৫৬০ কোটি ডলার। ফ্রান্সও টিপিএনডব্লিউ চুক্তির বাইরে রয়েছে, তারা নিজস্ব স্বাধীন পারমাণবিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা বজায় রাখার নীতিতে অটল।

৫. যুক্তরাজ্য: বিতর্কিত সম্প্রসারণ পরিকল্পনা

যুক্তরাজ্যের কাছে আনুমানিক ২২৫টি পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে। দেশটির পারমাণবিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা সম্পূর্ণরূপে সাবমেরিন-ভিত্তিক এবং এগুলো স্কটল্যান্ড উপকূলের নৌঘাঁটি থেকে পরিচালিত হয়। ২০২১ সালে যুক্তরাজ্য দশক পর প্রথমবারের মতো তাদের পারমাণবিক অস্ত্রভান্ডারের সীমা বাড়ানোর ঘোষণা দেয়, যা বিশ্বজুড়ে সমালোচিত হয়। পূর্ববর্তী পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে যুক্তরাজ্যের পারমাণবিক অস্ত্রের সংখ্যা ১৮০টিতে নামিয়ে আনার কথা ছিল। কিন্তু এর পরিবর্তে দেশটি তাদের ওয়ারহেডের সংখ্যা ৪০ শতাংশ বৃদ্ধি করে ২৬০টিতে উন্নীত করার পরিকল্পনা করেছে। ২০২২ সালে যুক্তরাজ্য এই খাতে ব্যয় করেছে আনুমানিক ৬৮০ কোটি ডলার। টিপিএনডব্লিউ চুক্তিতে যুক্তরাজ্যেরও কোনো সমর্থন নেই।

৬. পাকিস্তান: দক্ষিণ এশিয়ার পারমাণবিক বাস্তবতা

পাকিস্তানের কাছে আনুমানিক ১৭০টি পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে। দেশটির অস্ত্রগুলো মূলত ভূমি থেকে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র এবং বিমান থেকে নিক্ষেপযোগ্য বোমার মাধ্যমে সরবরাহ করা যায়। পাশাপাশি, সাবমেরিন থেকে পারমাণবিক অস্ত্র উৎক্ষেপণের সক্ষমতা অর্জনেও দেশটি কাজ করছে। ১৯৯৮ সালে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ভারতের পারমাণবিক পরীক্ষার জবাবে পাকিস্তান দুবার পারমাণবিক অস্ত্রের পরীক্ষা চালায়, যা দক্ষিণ এশিয়াকে একটি পারমাণবিক উত্তেজনার কেন্দ্রে পরিণত করে। ২০২২ সালে পাকিস্তান পারমাণবিক অস্ত্র বহর নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণে আনুমানিক ১০০ কোটি ডলার ব্যয় করেছে। পাকিস্তান টিপিএনডব্লিউ চুক্তিতে স্বাক্ষর করেনি।

৭. ভারত: কৌশলগত প্রতিরোধ ও ‘নো ফার্স্ট ইউজ’ নীতি?

ভারতের কাছে আনুমানিক ১৬৪টি পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে। ভারত মূলত ভূমি-ভিত্তিক ক্ষেপণাস্ত্রের মাধ্যমে এবং সম্ভবত বিমান থেকেও পারমাণবিক হামলা চালাতে সক্ষম। সাবমেরিন থেকেও এসব অস্ত্র উৎক্ষেপণের সক্ষমতা অর্জনের পথে ভারত অনেকটাই এগিয়ে গেছে। ভারত ১৯৭৪ সালে প্রথম এবং ১৯৯৮ সালে দ্বিতীয় দফায় (মোট তিনবার) পারমাণবিক অস্ত্রের পরীক্ষা চালিয়েছে। যদিও ভারত একটি ‘নো ফার্স্ট ইউজ’ বা ‘প্রথমে ব্যবহার না করার’ নীতির কথা বলে, তবে সাম্প্রতিক সময়ে এই নীতির প্রতি তাদের পূর্ণাঙ্গ আস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ২০২২ সালে ভারত এই খাতে আনুমানিক ২৭০ কোটি ডলার ব্যয় করেছে। পাকিস্তানের মতো ভারতও টিপিএনডব্লিউ চুক্তির অংশীদার নয়।

৮. ইসরায়েল: অঘোষিত পারমাণবিক শক্তি

ইসরায়েলের কাছে আনুমানিক ৯০টি পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে বলে আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। তবে দেশটি তাদের হাতে পারমাণবিক অস্ত্র থাকার কথা কখনো আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেনি, আবার তা অস্বীকারও করেনি। এই ‘অস্পষ্টতার নীতি’র কারণে তাদের পারমাণবিক অস্ত্রভান্ডার সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য প্রায় পুরোটাই অনুমানের ওপর নির্ভরশীল। ধারণা করা হয়, ইসরায়েল ক্ষেপণাস্ত্র, সাবমেরিন ও বিমান – তিন মাধ্যমেই পারমাণবিক অস্ত্র উৎক্ষেপণ করতে সক্ষম। এমনও জল্পনা রয়েছে যে, ১৯৭৯ সালে ইসরায়েল দক্ষিণ আফ্রিকার সঙ্গে যৌথভাবে ভারত মহাসাগরের দক্ষিণাঞ্চলে একটি পারমাণবিক অস্ত্রের পরীক্ষা চালিয়েছিল। দেশটি ২০২২ সালে তার পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচিতে প্রায় ১২০ কোটি ডলার ব্যয় করেছে বলেও ধারণা করা হয়। ইসরায়েলও টিপিএনডব্লিউ চুক্তিতে যোগ দেয়নি।

৯. উত্তর কোরিয়া: একঘরে রাষ্ট্রের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা

একবিংশ শতকে পারমাণবিক অস্ত্রের পরীক্ষা চালানো একমাত্র দেশ হলো উত্তর কোরিয়া। দেশটির কাছে আনুমানিক ৩০টি পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে বলে মনে করা হয়, যা সম্ভবত স্বল্প ও মাঝারি পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের মাধ্যমে উৎক্ষেপণ করা যেতে পারে। ২০০৬ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে উত্তর কোরিয়া ছয়টি পারমাণবিক অস্ত্রের পরীক্ষা চালিয়েছে, যা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ব্যাপক নিন্দা ও নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়েছে। ২০২৩ সালে উত্তর কোরিয়ার আইনসভা দেশটির পারমাণবিক অস্ত্র সক্ষমতা অর্জনের নীতিকে সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃতি দিয়েছে। দেশটির সর্বোচ্চ নেতা কিম জং-উন ঘোষণা করেছেন, এই নীতি রাষ্ট্রের মূল আইনের অংশ হিসেবে স্থায়ী করা হয়েছে। ২০২২ সালে উত্তর কোরিয়া তার পারমাণবিক কর্মসূচিতে আনুমানিক ৫৮ কোটি ৯০ লাখ ডলার ব্যয় করেছে। বলাই বাহুল্য, উত্তর কোরিয়া টিপিএনডব্লিউ চুক্তিকে প্রত্যাখ্যান করেছে।

পারমাণবিক অস্ত্র নিষিদ্ধকরণ চুক্তি (টিপিএনডব্লিউ): আশার আলো না অলীক স্বপ্ন?

পারমাণবিক অস্ত্রের এই ভয়াবহ বিস্তার রোধে এবং বিশ্বকে সম্পূর্ণরূপে পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত করার লক্ষ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক পদক্ষেপ হলো ট্রিটি অন দ্য প্রোহিবিশন অব নিউক্লিয়ার উইপনস (টিপিএনডব্লিউ)। এই চুক্তিতে পারমাণবিক অস্ত্রের ব্যবহার, উৎপাদন, সংরক্ষণ এবং এ ধরনের অস্ত্রের হুমকি দেওয়ার ওপর সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। ২০১৭ সালে জাতিসংঘে চুক্তিটি গৃহীত হয় এবং ২০২১ সাল থেকে কার্যকর হয়। আইক্যান এই চুক্তি প্রণয়ন ও প্রচারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করায় ২০১৭ সালে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার লাভ করে।

তবে দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, বিশ্বের ৯টি পারমাণবিক অস্ত্রধারী দেশের কেউই এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেনি বা অনুমোদন দেয়নি। তাদের যুক্তি, এই চুক্তি বাস্তবসম্মত নয় এবং এটি পারমাণবিক প্রতিরোধ ব্যবস্থার ওপর প্রতিষ্ঠিত বৈশ্বিক নিরাপত্তাকাঠামোকে দুর্বল করে দেবে। তারা আরও দাবি করে, টিপিএনডব্লিউ मौजूदा পারমাণবিক অস্ত্রবিস্তার রোধ চুক্তি বা নন-প্রলিফারেশন ট্রিটি (এনপিটি)-এর সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এনপিটি-র তিনটি মূল স্তম্ভ হলো – পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার রোধ, পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ এবং শান্তিপূর্ণ কাজে পারমাণবিক শক্তির ব্যবহার। পারমাণবিক শক্তিধর দেশগুলো এনপিটি-র প্রতি তাদের অঙ্গীকারের কথা বললেও, নিরস্ত্রীকরণের ক্ষেত্রে তাদের অগ্রগতি অত্যন্ত মন্থর ও হতাশাজনক।

টিপিএনডব্লিউ সমর্থক দেশ ও সংস্থাগুলো মনে করে, এই চুক্তি পারমাণবিক অস্ত্রের অমানবিকতা ও অবৈধতার ওপর একটি শক্তিশালী নৈতিক ও আইনি ভিত্তি তৈরি করেছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই চুক্তি পারমাণবিক অস্ত্রধারী দেশগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি করবে এবং তাদের নীতি পরিবর্তনে বাধ্য করবে বলে তারা আশাবাদী।

বহুমুখী ঝুঁকি ও ভবিষ্যতের ভাবনা

পারমাণবিক অস্ত্রের অস্তিত্ব মানবজাতির জন্য এক বহুমুখী ঝুঁকি তৈরি করেছে। ইচ্ছাকৃত যুদ্ধের পাশাপাশি দুর্ঘটনা, ভুল গণনা, সাইবার হামলা বা সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর হাতে পারমাণবিক অস্ত্র চলে যাওয়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। আধুনিক পারমাণবিক অস্ত্রগুলো এতটাই বিধ্বংসী যে, সীমিত পরিসরের একটি পারমাণবিক সংঘাতও বৈশ্বিক জলবায়ুতে ভয়াবহ পরিবর্তন আনতে পারে, যা ‘নিউক্লিয়ার উইন্টার’ বা পারমাণবিক শীতকাল নামে পরিচিত। এর ফলে বিশ্বজুড়ে খাদ্য সংকট, দুর্ভিক্ষ ও ব্যাপক প্রাণহানি ঘটতে পারে।

এই প্রেক্ষাপটে, পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণের দাবি আরও জোরালো হচ্ছে। সাধারণ মানুষ, সুশীল সমাজ এবং শান্তিকামী রাষ্ট্রগুলোর সম্মিলিত প্রচেষ্টা হয়তো একদিন পারমাণবিক শক্তিধর দেশগুলোকে তাদের ধ্বংসাত্মক নীতি থেকে সরে আসতে বাধ্য করবে। শিক্ষা, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং পারমাণবিক অস্ত্রের অমানবিক পরিণতির কথা বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরার মাধ্যমে একটি শক্তিশালী জনমত গড়ে তোলা সম্ভব।

পারমাণবিক অস্ত্রের পেছনে যে বিপুল অর্থ ব্যয় হচ্ছে, তা যদি মানবকল্যাণে, যেমন – দারিদ্র্য বিমোচন, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা বা জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় খরচ করা হতো, তাহলে পৃথিবী হয়তো আরও সুন্দর ও নিরাপদ বাসযোগ্য স্থানে পরিণত হতো।

মানবতার দায়

পারমাণবিক অস্ত্রের কালো ছায়া থেকে পৃথিবীকে মুক্ত করা একবিংশ শতকের মানবজাতির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ব্যর্থ হলে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক বিভীষিকাময় পৃথিবী রেখে যেতে হবে। হিরোশিমা ও নাগাসাকির ভয়াবহ স্মৃতি আমাদের প্রতিনিয়ত স্মরণ করিয়ে দেয়, এই মারণাস্ত্রের সঙ্গে কোনো আপস চলে না। আইক্যানের মতো সংস্থাগুলো সেই লক্ষ্যেই কাজ করে যাচ্ছে, যেন একদিন ‘পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত বিশ্ব’ শুধু স্বপ্ন না থেকে বাস্তবতায় পরিণত হয়। সেই দিনের অপেক্ষায়, প্রতিটি বিবেকবান মানুষের কণ্ঠ সোচ্চার হোক পারমাণবিক অস্ত্রের বিরুদ্ধে, শান্তির পক্ষে, মানবতার পক্ষে। কারণ, এই পৃথিবীটা ধ্বংস করার জন্য নয়, একে আরও সুন্দর করে গড়ে তোলার জন্যই আমাদের জন্ম।

পাঠকপ্রিয়