সোমবার, ১৯ জানুয়ারি ২০২৬

সর্বশেষ

আরাকান আর্মির বন্দিশালা থেকে ফেরা জেলেদের লোমহর্ষক বর্ণনা

নাফ নদে মূর্তিমান আতঙ্ক আরাকান আর্মি, ৭ মাসে ২২০ জেলে অপহরণ

নিজস্ব প্রতিবেদক

বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের নাফ নদী ও সংলগ্ন বঙ্গোপসাগরীয় এলাকা এখন মিয়ানমারের সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মির (এএ) অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। গত সাত মাসে এখান থেকে অন্তত ২২০ জন বাংলাদেশি জেলেকে অপহরণ করেছে এই গোষ্ঠী। এর মধ্যে শুধুমাত্র চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসেই অপহরণের শিকার হয়েছেন ১৫১ জন। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) মধ্যস্থতায় কয়েক দফায় বেশ কিছু জেলেকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হলেও, অনেক পরিবারের সদস্যরা এখনও তাদের প্রিয়জনের ফেরার অপেক্ষায় বিনিদ্র রজনী কাটাচ্ছেন। জেলেদের অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায়, গুলি চালানো এবং অমানবিক নির্যাতনের অভিযোগ উঠছে আরাকান আর্মির বিরুদ্ধে।

সবশেষ গত ১২ মে নাফ নদে মাছ ধরার সময় আরাকান আর্মির অতর্কিত হামলায় দুই বাংলাদেশি জেলে গুলিবিদ্ধ হন এবং অপর তিনজন অপহরণের শিকার হন। এর আগে, ৮ এপ্রিল চারটি মাছ ধরার ট্রলারসহ ২৩ জেলেকে ধরে নিয়ে যায় এই সশস্ত্র গোষ্ঠী।

আরাকান আর্মির জিম্মিদশা থেকে সম্প্রতি ফিরে আসা টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপের বাসিন্দা মো. আইয়ুব সেদিনের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন। তিনি জানান, গত ৬ এপ্রিল সকালে সেন্টমার্টিনের কাছ থেকে দুই থেকে আড়াই লাখ টাকার মাছসহ তাদের ট্রলারটি টেকনাফের জেটিঘাটে ফেরার পথে আরাকান আর্মির সদস্যরা অস্ত্রের মুখে তাদের ৯ জেলেকে জিম্মি করে। চোখ ও হাত বেঁধে তাদের মিয়ানমারের মংডুতে নিয়ে যাওয়া হয়।

আইয়ুব বলেন, “সেখানে একটি বদ্ধ ঘরে আমাদের ৩১ জন বাংলাদেশিসহ প্রায় ২০০-২৫০ জনকে বন্দি করে রাখা হয়েছিল। দিনে দুই বেলা কলাপাতায় করে লবণ, হলুদ, মরিচ ছাড়া শুধু কাঁঠালের এঁচোড় দিয়ে ভাত দিত। লবণ চাইলে নির্মমভাবে মারধর করত।” আইয়ুব আরও জানান, আরাকান আর্মির সদস্যরা বলত, বাংলাদেশ থেকে চাল, ডাল, হলুদ, মরিচ, লবণ, পেঁয়াজসহ খাবার পাঠালে তবেই বাংলাদেশিদের ছাড়া হবে। রাতের বেলায় কক্ষে কোনো আলোর ব্যবস্থা ছিল না, ঘুটঘুটে অন্ধকারেই তাদের ৪১টি বিভীষিকাময় দিন কাটাতে হয়েছে।

অপহৃতদের পরিবারগুলো জানায়, আরাকান আর্মি জেলেদের ধরার পরই তাদের নাম-ঠিকানা লিখে নেয় এবং পরবর্তীতে কোনোভাবে বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে খবর দেয়। এরপর পরিবারের সদস্যরা পুলিশ ও বিজিবির কাছে ধর্না দিয়ে তাদের ছাড়িয়ে আনার আকুতি জানায়। অনেক ক্ষেত্রে মোটা অঙ্কের মুক্তিপণ দিয়েই অপহৃতদের ছাড়িয়ে আনতে বাধ্য হয় ট্রলার মালিকপক্ষ। যেমনটি ঘটেছিল গত রমজান মাসে, যখন চারটি ট্রলারসহ জেলেদের ধরে নিয়ে যাওয়ার পর প্রতি ট্রলারের জন্য ২ লাখ টাকা মুক্তিপণ দিতে হয়েছিল।

আরাকান আর্মির নৃশংসতা থেকে রেহাই পাচ্ছেন না নিরীহ জেলেরা। গত ১২ মে গুলিবিদ্ধ হেদায়েত উল্লাহ (১৮) জানান, “আমরা পাঁচজন নাফ নদে বড়শি দিয়ে মাছ ধরছিলাম। হঠাৎ মিয়ানমারের দিক থেকে আরাকান আর্মির সীমান্ত চৌকি থেকে আমাদের লক্ষ্য করে গুলি ছোড়া হয়। কোনো কারণ ছাড়াই তারা গুলি করেছে। এখন ভয়ে নাফ নদে মাছ শিকারে যেতে পারছি না।”

উল্লেখ্য, মাদকের বিস্তার ও রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ রোধে প্রায় আট বছর নাফ নদের বাংলাদেশ অংশে মাছ ধরা বন্ধ ছিল। উচ্চ আদালতের নির্দেশে চলতি বছরের ১৪ ফেব্রুয়ারি সেই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়, কিন্তু এরপর থেকেই আরাকান আর্মির উপদ্রব চরম আকার ধারণ করেছে।

বিজিবির তথ্য ও স্থানীয় সূত্রমতে, গত বছরের (২০২৪) অক্টোবর থেকে চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে অপহৃত অনেক জেলেকে ফেরত আনা হয়েছে। তবে, চলতি বছরের জানুয়ারিতে টেকনাফের হ্নীলা থেকে অপহৃত আব্দুর শুক্কুরসহ তিন জেলের সন্ধান এখনও মেলেনি। আব্দুর শুক্কুরের স্ত্রী সাজেদা বেগম চার সন্তান নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন। তিনি বলেন, “তিন মাস হয়ে গেলেও স্বামীর কোনো খোঁজ পাইনি। সরকারি বিভিন্ন দপ্তরে আবেদন করেও কোনো সাড়া মেলেনি।”

ফিরে আসা জেলেরা বলছেন, আরাকান আর্মি মাছ ধরতে গেলেই বিনা উসকানিতে গুলি চালায়। তাদের ধারণা, খাবার সংগ্রহের পাশাপাশি বাংলাদেশের সঙ্গে এক ধরনের সম্পর্ক তৈরির চেষ্টা করছে এই সশস্ত্র গোষ্ঠী।

সীমান্ত পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণকারী কর্মকর্তারা জানান, গত বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের প্রায় ৯০ শতাংশ এলাকা আরাকান আর্মি নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে এবং বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের ওপারের অংশে তাদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। এরপর থেকেই তারা নাফ নদে মাছ শিকারে নিষেধাজ্ঞা জারিসহ নানা তৎপরতা চালাচ্ছে, যার সরাসরি ভুক্তভোগী হচ্ছেন এপারের নিরীহ জেলেরা। এমনকি টেকনাফ স্থলবন্দরের কার্যক্রমেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।

এ বিষয়ে বিজিবির রামু সেক্টর কমান্ডার কর্নেল মহিউদ্দিন আহমেদ জানান, “জলসীমা লঙ্ঘন করলে জেলেরা আরাকান আর্মির হাতে আটক হয়। আমরা ইনফরমাল যোগাযোগের মাধ্যমে তাদের ছাড়িয়ে আনার চেষ্টা করি। আরাকান আর্মি ওপার থেকে খাবার প্রত্যাশা করে বলে শোনা গেলেও, তাদের খাবার সরবরাহ করার কোনো সুযোগ নেই।” তিনি আরও বলেন, নাফ নদে মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞা উঠে যাওয়ার পর অনেকেই ছোট ছোট ককশিটে ভেসে মাছ ধরে এবং ভুলবশত মিয়ানমারের জলসীমায় চলে গেলে আরাকান আর্মি সেই সুযোগটি নেয়।

এই পরিস্থিতিতে নাফ নদী ও সংলগ্ন সাগরে বাংলাদেশি জেলেদের জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

পাঠকপ্রিয়