সোমবার, ১৯ জানুয়ারি ২০২৬

সর্বশেষ

সেন্ট মার্টিনে ২০ শয্যার হাসপাতাল শুধু কাগজেই, রোগী দেখেন অফিস সহায়ক

কক্সবাজার প্রতিবেদক

দেশের গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন এলাকা এবং ১১ হাজারের বেশি মানুষের বসবাসস্থল সেন্ট মার্টিন দ্বীপের একমাত্র সরকারি হাসপাতালটি চরম জনবল সংকটে ধুঁকছে। প্রায় ছয় কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ২০ শয্যাবিশিষ্ট এই হাসপাতালটিতে চিকিৎসক, নার্স বা অন্য কোনো স্বাস্থ্যকর্মী নেই বললেই চলে। বর্তমানে কেবল একজন অফিস সহায়ক (এমএলএসএস) দিয়েই চলছে এর কার্যক্রম, যা দ্বীপবাসীর স্বাস্থ্যসেবাকে দুর্বিষহ করে তুলেছে।

সরেজমিনে সেন্ট মার্টিন ২০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালে গিয়ে দেখা গেছে এক করুণ চিত্র। পুরো হাসপাতাল ভবনটিতে কর্মরত আছেন কেবল একজন অফিস সহায়ক, যার নাম রমজান আলী। রোগী এলেও তিনি জরুরি কোনো স্বাস্থ্যসেবা দিতে পারেন না; কেবল বিনামূল্যে বিতরণের জন্য রাখা কিছু সাধারণ ওষুধ বিতরণ করেন। এর বাইরে দ্বীপের বাসিন্দারা এই হাসপাতাল থেকে কোনো স্বাস্থ্যসেবা পান না। আধুনিক সব সুবিধা থাকার পরও হাসপাতালটির বেশিরভাগ কক্ষ ফাঁকা পড়ে আছে। ২০ শয্যার হাসপাতালটি যেন কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ, বাস্তবে এর কার্যক্রম প্রায় শূন্য।

টেকনাফ উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, সেন্ট মার্টিন হাসপাতালের জন্য ১৫টি পদ অনুমোদিত। এর মধ্যে রয়েছে দুজন চিকিৎসক, চারজন নার্স, একজন ল্যাবরেটরি টেকনিশিয়ান, একজন ফার্মাসিস্টসহ ওয়ার্ড বয়, আয়া, পিয়ন, স্টোরকিপার, নিরাপত্তা প্রহরী ও ঝাড়ুদারের পদ। কিন্তু ১৫টি পদের মধ্যে একমাত্র এমএলএসএস পদেই রমজান আলী নামের ওই ব্যক্তি কর্মরত আছেন। বাকি ১৪টি পদই দীর্ঘদিন ধরে শূন্য পড়ে আছে।

হাসপাতালটির ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, ২০০২ সালে দ্বীপের পশ্চিম পাড়ায় প্রায় দেড় একর জমির উপর এটি নির্মিত হয়। নির্মাণে ব্যয় হয়েছিল প্রায় ছয় কোটি টাকা। প্রশাসনিক ভবন এবং চিকিৎসকদের আবাসিক ডরমিটরি তৈরি শেষে ২০০৮ সালে এটি উদ্বোধন করা হয়। শুরুতে ১০ শয্যা থাকলেও পরে এটি ২০ শয্যায় উন্নীত করা হয়। কিন্তু পরিতাপের বিষয়, উদ্বোধনের পর ২৩ বছর পেরিয়ে গেলেও হাসপাতালটিতে অন্তর্বিভাগ (ইনডোর) চিকিৎসাসেবা আজ পর্যন্ত চালু হয়নি।

জনবল সংকটের চিত্র নতুন নয়। ২০১৪ সালের ২৬ আগস্ট এখানে দস্তগীর হোসাইন নামে একজন চিকিৎসক নিয়োগ পেলেও যোগদানের কিছুদিন পরই তিনি কাউকে কিছু না জানিয়ে হাসপাতাল ছেড়ে চলে যান। এরপর ওই পদে আর কাউকে নিয়োগ দেওয়া হয়নি। ২০২০ সালের মার্চ মাসে একটি স্বাস্থ্য ও লিঙ্গসহায়তা প্রকল্পের অধীনে ১৬ জন এনজিও কর্মকর্তা-কর্মচারীর মাধ্যমে হাসপাতালটিতে কিছুটা স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া শুরু হয়েছিল। এই দলে দুজন মেডিকেল কর্মকর্তা, দুজন চিকিৎসা সহকারী, চারজন ধাত্রীসহ ল্যাব টেকনিশিয়ান, কমিউনিটি হেলথ ওয়ার্কার, গার্ড, রাঁধুনি ও পরিচ্ছন্নতাকর্মী ছিলেন। কিন্তু গত বছরের ৩০ জুন প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে এনজিও কর্মীরা চলে যান এবং আবারও স্বাস্থ্যসেবা বন্ধ হয়ে পড়ে।

দ্বীপের বাসিন্দাদের জন্য এটি এক বড় সংকট। গলাচিপার বাসিন্দা জামালিদা বেগম জানান, জরুরি মুহূর্তে, বিশেষ করে বর্ষাকালে যখন সাগর উত্তাল থাকে, তখন চাইলেই টেকনাফ সদরের হাসপাতালে যাওয়া সম্ভব হয় না। প্রসবের সময় যাদের অস্ত্রোপচার প্রয়োজন হয়, সেইসব নারীদের নিয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয় পরিবারগুলোকে।

সেন্ট মার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক সদস্য হাবিব উল্লাহ খান হতাশা ব্যক্ত করে বলেন, সেন্ট মার্টিনের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন এলাকা এবং ইউনিয়ন হওয়া সত্ত্বেও এখানে জরুরি স্বাস্থ্যসেবা নেই। কোটি কোটি টাকা খরচ করে অত্যাধুনিক ভবন তৈরি করা হলেও তা কোনো কাজে আসছে না। ২০ শয্যার হাসপাতালটি কেবল কাগজেই আছে, বাস্তবে এর কোনো অস্তিত্ব নেই।

পূর্বপাড়া গ্রামের বাসিন্দা ও সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান ফিরোজ আহমদ জানান, পর্যটন মৌসুমে যখন পর্যটকের আনাগোনা থাকে, তখন হয়তো সীমিত পরিসরে কিছুটা চিকিৎসাসেবা পাওয়া যায়। কিন্তু বর্ষার দিনগুলোতে হাসপাতালের পরিবেশ ভুতুড়ে হয়ে যায়। উত্তাল সাগরে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সব সময় টেকনাফ যাওয়া সম্ভব নয়। তাই দ্বীপের মানুষের জন্য অন্তর্বিভাগ চালু করা অত্যন্ত জরুরি।

সেন্ট মার্টিন ইউপির আরেক সাবেক চেয়ারম্যান নুর আহমদ বলেন, প্রায় ৩৪ কিলোমিটার দূরের টেকনাফ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়ে চিকিৎসা নেওয়া দ্বীপের মানুষের জন্য এমনিতেই খুব কঠিন। বর্ষা মৌসুমে তো অনেক সময় টেকনাফের সঙ্গে যোগাযোগই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এই সময় নৌ অ্যাম্বুলেন্সেরও কোনো ব্যবস্থা না থাকায় মানুষকে অনেকটা বিনা চিকিৎসাতেই থাকতে হয়। অনেক চেষ্টা তদবির করেও হাসপাতালটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করা সম্ভব হচ্ছে না।

দ্বীপবাসীর পক্ষে সেন্ট মার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ফয়েজুর রহমান বলেন, তাদের প্রধান দাবি হলো ২০ শয্যার হাসপাতালটি প্রয়োজনীয় প্যাথলজি পরীক্ষা, অন্তর্বিভাগ সেবাসহ পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম শুরু করুক। সেই সঙ্গে দ্বীপের জন্য একটি সি-অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থাও রাখা হোক, যা জরুরি অবস্থায় মুমূর্ষু রোগীদের টেকনাফ বা চট্টগ্রামে নিতে পারবে।

টেকনাফ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা চিকিৎসক প্রণয় রুদ্র জানান, এনজিওর কর্মকর্তা-কর্মচারীরা চলে যাওয়ার পর হাসপাতালটি প্রায় শূন্য হয়ে গেছে। তারপরও তারা যতটুকু সম্ভব সেবা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। হাসপাতালে প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগের জন্য বিভিন্নভাবে চেষ্টা চালানো হচ্ছে। তিনি বলেন, বর্তমানে কয়েক মাস ধরে টেকনাফ থেকে একজন চিকিৎসককে মাসে দুইবার বা তিনবার করে কিছুদিনের জন্য সেন্ট মার্টিন হাসপাতালে পাঠানো হয় রোগী দেখার জন্য। সর্বশেষ গত সপ্তাহে তিনি সেন্ট মার্টিনে রোগী দেখে এসেছেন বলেও জানান।

তবে দ্বীপবাসীর অভিযোগ, এই বিক্ষিপ্ত সেবা তাদের জরুরি প্রয়োজন মেটাতে যথেষ্ট নয়। কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত একটি সরকারি হাসপাতাল যখন কেবল এক অফিস সহায়কের ভরসায় চলে, তখন দ্বীপের হাজার হাজার মানুষের স্বাস্থ্য নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।

পাঠকপ্রিয়