সোমবার, ১৯ জানুয়ারি ২০২৬

সর্বশেষ

জ্বালানিতে স্বস্তি: বিশ্ববাজারে দরপতনে বিপিসির ২৩ হাজার কোটি টাকা সাশ্রয়!

নিজস্ব প্রতিবেদক

বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসায় এবং আমদানিতে কৌশলগত দক্ষতা প্রদর্শনের ফলে চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) জ্বালানি তেল আমদানি বাবদ ২৩ হাজার কোটি টাকারও বেশি সাশ্রয় করতে যাচ্ছে। এর ফলে সংস্থাটির সংশোধিত বাজেটে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে, যেখানে আগে বিপুল ঘাটতির আশঙ্কা করা হয়েছিল, সেখানে এখন উল্লেখযোগ্য পরিমাণ মুনাফার প্রত্যাশা করা হচ্ছে।

অর্থ মন্ত্রণালয় সম্প্রতি বিপিসির চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেট অনুমোদন করেছে। এতে দেখা যায়, জ্বালানি তেল আমদানির জন্য মূল বাজেটে বরাদ্দকৃত ৯৯ হাজার ২৪৯ কোটি টাকা থেকে ২৩ হাজার ২৬৭ কোটি টাকা কমিয়ে সংশোধিত বরাদ্দ দাঁড়িয়েছে ৭৫ হাজার ৯৮২ কোটি টাকায়। মূল বাজেটে পরিশোধিত তেল আমদানিতে ৮২ হাজার ৬০৪ কোটি এবং অপরিশোধিত (ক্রুড অয়েল) তেল আমদানিতে ১৬ হাজার ৬৪৫ কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল। সংশোধিত বাজেটে তা কমে পরিশোধিত তেলের জন্য ৬১ হাজার ৭২৬ কোটি এবং অপরিশোধিত তেলের জন্য ১৪ হাজার ২৫৬ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।

দরপতন ও দক্ষ ব্যবস্থাপনা যেভাবে সাশ্রয় আনল

বিপিসির কর্মকর্তারা বলছেন, বাজেট প্রণয়নের সময় বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেশ চড়া ছিল, ফলে বাড়তি বরাদ্দ রাখতে হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে দাম কমে আসায় সংশোধিত বাজেটে বরাদ্দ হ্রাস পেয়েছে।

বিপিসির মহাব্যবস্থাপক (অর্থ) মুহাম্মদ মোরশেদ হোসাইন আজাদ বলেন, “প্রিমিয়াম যখন কমে তখন আনুপাতিক হারে আমদানি ব্যয়ও কমে আসে। প্রথমে প্রতি ব্যারেলে প্রিমিয়াম ধরা হয়েছিল ৭ দশমিক ১৭ ডলার, যা পরবর্তী সময়ে দরকষাকষির মাধ্যমে আমরা ৫ দশমিক ১৬ ডলারে নামিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছি। এতে চলতি অর্থবছরে জ্বালানি তেল আমদানি বাবদ উল্লেখযোগ্য পরিমাণে ব্যয় সাশ্রয় হবে।”

অয়েল প্রাইস ডটকমের তথ্যমতে, গত বছরের ৪ জুলাই আরব লাইট ক্রুড অয়েলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৮৮ দশমিক ৫০ ডলার থাকলেও সম্প্রতি তা ৬৬ দশমিক ৩০ ডলারে নেমে এসেছে। একইভাবে, মারবান ক্রুড অয়েলের দাম ৮৭ দশমিক ৪৪ ডলার থেকে কমে ৬৪ দশমিক ৮৮ ডলারে দাঁড়িয়েছে। পরিশোধিত জ্বালানি তেলের দামেও নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা গেছে।

বিপিসির চেয়ারম্যান আমিন উল আহসান এ প্রসঙ্গে বলেন, “মূলত বৈশ্বিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমে যাওয়াই আমাদের ব্যয় সাশ্রয়ের প্রধান কারণ। আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় রেখেই আমরা বাজেট করেছি। এছাড়া, জ্বালানি উপদেষ্টার পরামর্শে প্রতিযোগিতামূলক টেন্ডার এবং জিটুজির মাধ্যমে আমদানির ফলে পরিবহন খরচও উল্লেখযোগ্য হারে কমানো সম্ভব হয়েছে, যার ইতিবাচক প্রভাব বাজেটে পড়েছে।”

বিপিসির ঘুরে দাঁড়ানো

বছর পাঁচেক আগেও পুঞ্জীভূত লোকসানের ভারে জর্জরিত ছিল বিপিসি। তবে ২০২০ সাল থেকে দেশের বাজারে জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয়ের ফলে প্রতিষ্ঠানটি মুনাফার মুখ দেখতে শুরু করে। সর্বশেষ ২০২৩-২৪ অর্থবছর শেষে বিপিসির সংরক্ষিত আয় ৩১ হাজার ৮৬৭ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। জ্বালানি তেল আমদানি ব্যয় কমার সুবাদে চলতি অর্থবছরে বিপিসি প্রায় ২ হাজার ৭৬৭ কোটি টাকা উদ্বৃত্ত অর্জন করবে বলে সংশোধিত বাজেটে প্রাক্কলন করা হয়েছে, যেখানে মূল বাজেটে ৪ হাজার ৯৮৮ কোটি টাকা ঘাটতির আশঙ্কা ছিল। এর আগের ২০২৩-২৪ অর্থবছরে সংস্থাটির উদ্বৃত্ত ছিল ৫ হাজার ৪১১ কোটি টাকা।

আমদানি চিত্র ও বাণিজ্য তথ্য

দেশের মোট জ্বালানি তেলের চাহিদার মাত্র ৮ শতাংশ স্থানীয়ভাবে পূরণ হয়, বাকি ৯২ শতাংশই আমদানিনির্ভর। বিপিসি সৌদি আরবের সৌদি আরামকো এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের অ্যাডনকের কাছ থেকে অপরিশোধিত তেল আমদানি করে। এছাড়া আটটি দেশ থেকে জিটুজি চুক্তি ও আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমে পরিশোধিত তেল আমদানি করা হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে (জুলাই-মার্চ) জ্বালানি তেল আমদানি বাবদ ব্যয় আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় কমেছে। এ সময়ে ক্রুড অয়েল আমদানিতে ৫১ কোটি ৫৬ লাখ ডলার ব্যয় হয়েছে, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ৭২ কোটি ৫২ লাখ ডলার। পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানিতেও ব্যয় সামান্য কমে ৩৫৭ কোটি ২৬ লাখ ডলারে দাঁড়িয়েছে।

তবে ঋণপত্র (এলসি) খোলার ক্ষেত্রে মিশ্র প্রবণতা দেখা গেছে। জুলাই-মার্চ সময়ে অপরিশোধিত তেল আমদানির এলসি খোলা ৪২ শতাংশ বাড়লেও পরিশোধিত তেলের এলসি খোলা ৩২ শতাংশ কমেছে।

বিপিসির তথ্যমতে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৬৩ লাখ ৭১ হাজার টনের বেশি জ্বালানি তেল আমদানিতে ব্যয় হয়েছিল ৫৫ হাজার ৬৬৩ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের জন্য ৫৯ লাখ ১০ হাজার টন পরিশোধিত এবং ১৪ লাখ টন অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির পরিকল্পনা রয়েছে সংস্থাটির। বৈশ্বিক বাজারে দাম স্থিতিশীল থাকলে এবং দক্ষ ব্যবস্থাপনা অব্যাহত থাকলে বিপিসির এই সাশ্রয়ের ধারা বজায় থাকবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

পাঠকপ্রিয়