সোমবার, ১৯ জানুয়ারি ২০২৬

সর্বশেষ

পরীক্ষিত ক্লোনেই ভরসা বাগান মালিকদের, নতুন উদ্ভাবনে ধীরগতি

চায়ের ২৮টি জাতের ভিড়ে কেন মাত্র ৫টির কদর?

নিজস্ব প্রতিবেদক

বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিটিআরআই) এ পর্যন্ত ২৮টি বিভিন্ন জাতের চা উদ্ভাবন করলেও দেশের বাগানগুলোতে ব্যাপকহারে চাষ হচ্ছে মাত্র পাঁচটি। উচ্চফলন, গুণমান এবং পরিবর্তিত জলবায়ুর সঙ্গে খাপ খাইয়ে চলার সক্ষমতার কারণেই মূলত এই পাঁচটি জাতের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে দেশের শতবর্ষী চা শিল্প। তবে, এই সীমিত জাতের ওপর অধিক নির্ভরতা চা শিল্পের বহুমুখীকরণে ঘাটতি সৃষ্টি করছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা, যা ভবিষ্যতের জন্য উদ্বেগজনক।

এই বিশেষভাবে উদ্ভাবিত চায়ের জাতগুলোকে ‘চা ক্লোন’ হিসেবে অভিহিত করা হয়। প্রচলিত বীজের মাধ্যমে বংশবিস্তারের পরিবর্তে গ্রাফটিং বা কলম পদ্ধতির মাধ্যমে রোগপ্রতিরোধী ও উচ্চফলনশীল বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ণ রেখে এসব চারা উৎপাদন করা হয়।

বিটিআরআই-এর পরিচালক মো. ইসমাইল হোসেন জানান, “বিটি-ওয়ান (উদ্ভাবিত ১৯৬৬ সালে), বিটি-২ (১৯৭৫), বিটি-৪ (১৯৮১), বিটিএস-১ (১৯৮৫) এবং টিভি-১ (১৯৪৯) – এই পাঁচটি ক্লোন থেকে প্রতি হেক্টরে গড়ে তিন থেকে চার হাজার কেজি চা উৎপাদিত হয়।” এর মধ্যে খরা সহনশীলতা এবং বিশ্বখ্যাত দার্জিলিং চায়ের মতো স্বতন্ত্র স্বাদ ও সুগন্ধের কারণে বিটি-২ সর্বাধিক জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। তিনি বলেন, “বিটি-২ উন্নতমানের ব্ল্যাক টি এবং গ্রিন টি, উভয় প্রকার চা তৈরির জন্যই বিশেষভাবে উপযোগী।”

তবে, পরিচালক এও স্বীকার করেন, “দেশের চা শিল্পের বর্তমান আকার ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা বিবেচনায় এখন পর্যন্ত উদ্ভাবিত ক্লোনের সংখ্যা পর্যাপ্ত নয়। আমরা আরও নতুন এবং উন্নত বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন ক্লোন আবিষ্কারের জন্য গবেষণা অব্যাহত রেখেছি।” তিনি আরও যোগ করেন, “বাগান মালিকরা সাধারণত পুরোনো, পরীক্ষিত এবং প্রমাণিত জাতগুলোর ওপরই বেশি আস্থা রাখেন। চায়ের ক্ষেত্রেও এই প্রবণতা দেখা যায়। তারা বাণিজ্যিকভাবে ক্ষতির ঝুঁকি এড়াতে তিন থেকে পাঁচটি বাছাই করা ক্লোনের চা গাছ রোপণ করতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন।” একটি মানসম্পন্ন নতুন ক্লোন পরিপূর্ণভাবে উদ্ভাবন করতে প্রায় ১৩ বছর সময় লেগে যায়, যার বাণিজ্যিক উৎপাদন ক্ষমতা থাকে প্রায় ৫০ বছর পর্যন্ত।

বাগান সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই গৎবাঁধা প্রবণতার ফলে চা উৎপাদনে বহুমুখীকরণের অভাব প্রকট হয়ে উঠছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশের শীর্ষস্থানীয় একটি চা বাগানের এক কর্মকর্তা বলেন, “অধিক ফলন, উন্নত গুণমান, কীটপতঙ্গের আক্রমণ থেকে সুরক্ষা, খরা সহনশীলতা এবং গাছের কম মৃত্যুহারের কারণে আমাদের বাগানের প্রায় ৫০ শতাংশ জমিতেই বিটি-২ জাতের চা চাষ করা হয়েছে। পাশাপাশি টিভি-১ ক্লোনও রোপণ করা হয়েছে।” তবে তিনিও স্বীকার করেন, “পণ্যের বৈচিত্র্য আনতে এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় আরও উন্নত ও সহনশীল ক্লোন উদ্ভাবন করা জরুরি।”

সিটি গ্রুপের বিজনেস ডেভেলপমেন্ট ডিরেক্টর লুৎফুল কবির শাহীন জানান, তাদের বাগানগুলোতে জনপ্রিয় বিটি-১, বিটি-২ এবং টিভি-১ জাতের চা চাষ করা হয়। তিনি বলেন, “এই ক্লোনগুলো জলবায়ু-সহিষ্ণুতা, স্বতন্ত্র স্বাদ এবং মনোমুগ্ধকর সুগন্ধের কারণে অগ্রাধিকার পায়। বাজারেও এগুলোর চাহিদা ও গ্রহণযোগ্যতা বেশি।” উল্লেখ্য, জনপ্রিয় বেঙ্গল টি ব্র্যান্ড তাদের গ্রুপের মালিকানাধীন।

চা বাগান মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ টি অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান কামরান তানভীরুর রহমান দেশে উচ্চ ফলনশীল জাতের সংকট রয়েছে উল্লেখ করে বলেন, “আমাদের আরও খরা-সহনশীল ক্লোনের প্রয়োজন। কারণ, দেশে বছরের প্রায় পাঁচ থেকে ছয় মাস বৃষ্টিপাত খুবই কম হয়। সব বাগানে সেচ সুবিধা দেওয়া সম্ভব নয়, যা উৎপাদন খরচ বহুগুণে বাড়িয়ে দেয়।”

বাংলাদেশে চা শিল্পের যাত্রা শুরু হয়েছিল প্রায় ১৮৪ বছর আগে। বর্তমানে দেশে ১৭০টি নিবন্ধিত চা বাগান রয়েছে, যার বেশিরভাগই দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল অর্থাৎ বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলে অবস্থিত। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালে দেশে বার্ষিক আট কোটি ৫৯ লাখ কেজি অভ্যন্তরীণ চাহিদার বিপরীতে চা উৎপাদিত হয়েছিল নয় কোটি ৩০ লাখ ৪০ হাজার কেজি, যা চাহিদার তুলনায় কিছুটা বেশি।

বিশ্বব্যাপী চা একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় পানীয়। ন্যাশনাল টুডের তথ্য অনুযায়ী, প্রতি সেকেন্ডে বিশ্বজুড়ে মানুষ প্রায় ২৫ হাজার কাপ চা পান করেন, যার অর্থ দাঁড়ায় প্রতিদিন দুই বিলিয়ন কাপেরও বেশি চা পান করা হয়। এই বিশাল বাজার ধরতে হলে এবং দেশীয় শিল্পকে টেকসই করতে হলে মানসম্পন্ন ও বৈচিত্র্যপূর্ণ নতুন চা ক্লোন উদ্ভাবনের বিকল্প নেই বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। বিটিআরআই সেই লক্ষ্যেই কাজ করে যাচ্ছে বলে জানা গেছে।

পাঠকপ্রিয়