সোমবার, ১৯ জানুয়ারি ২০২৬

সর্বশেষ

প্রযুক্তি মেলায় ৪৫ উদ্ভাবনী প্রকল্পে মুগ্ধ দর্শনার্থী

কক্সবাজারের খুদে বিজ্ঞানীরা দেখাচ্ছে স্মার্ট সীমান্ত সুরক্ষার পথ

কক্সবাজার প্রতিবেদক

মিয়ানমারের সঙ্গে কক্সবাজার-বান্দরবানের ২৭১ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত অনেকটাই অরক্ষিত। প্রযুক্তিগত সুরক্ষার অভাবে এই সীমান্ত দিয়ে মাদক, অস্ত্র, চোরাই পণ্য পাচার এবং রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই গুরুতর সংকটের সমাধানে এবার এগিয়ে এসেছে কক্সবাজার সিটি কলেজের একাদশ শ্রেণির একদল উদ্যমী শিক্ষার্থী। তারা থার্মাল ক্যামেরার (তাপ সংবেদনশীল) সাহায্যে একটি ‘স্মার্ট বর্ডার সিকিউরিটি সিস্টেম’ তৈরির প্রস্তাবনা দিয়েছে, যা সীমান্ত সুরক্ষায় যুগান্তকারী ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

এই খুদে বিজ্ঞানীদের মতোই জেলার ৪৫টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা তাদের উদ্ভাবনী চিন্তা তুলে ধরেছে জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সপ্তাহ উপলক্ষে আয়োজিত বিজ্ঞান মেলায়। শহরের বায়তুশ শরফ জব্বারিয়া একাডেমি স্কুল অ্যান্ড কলেজ প্রাঙ্গণে গত বুধবার থেকে শুরু হওয়া তিন দিনব্যাপী ৪৬তম এই মেলায় জলবায়ু পরিবর্তন, ভূমিকম্প ঝুঁকি, পানি ও বিদ্যুৎ সংকট নিরসনে প্রযুক্তিনির্ভর ৪৫টি প্রকল্প উপস্থাপন করা হয়েছে। জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সালাহউদ্দিন মেলার উদ্বোধন করেন।

মেলায় প্রতিটি প্রকল্পই ছিল কক্সবাজারের স্থানীয় সমস্যা কেন্দ্রিক। বায়তুশ শরফ জব্বারিয়া একাডেমি স্কুল অ্যান্ড কলেজের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা উপস্থাপন করেছে ‘ভূগর্ভস্থ পানির সংকট ও পরিবেশ দূষণ প্রতিরোধ প্রকল্প’। দলনেতা রনভির দেবনাথ জানায়, কক্সবাজার শহরে আগে যেখানে ২০-৩০ ফুট গভীরে সুপেয় পানি পাওয়া যেত, এখন সেখানে ২০০-৩০০ ফুট নিচেও পানি মিলছে না। তাদের প্রকল্প এই সমস্যা সমাধানে ভূগর্ভস্থ পানির বিকল্প ব্যবস্থার পথ দেখাচ্ছে।

অন্যদিকে, উখিয়া বহুমুখী সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সৌর ও জলশক্তি ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং বর্জ্য থেকে বায়োগ্যাস ও জৈবসার তৈরির প্রকল্প নিয়ে এসেছে। দলনেতা ফয়েজ মিয়ার মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা কক্সবাজারে প্রতিবছর ৫০-৬০ লাখ পর্যটকের আগমন ঘটে, এতে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ছে এবং প্রতিদিন ৮০ মেট্রিক টনের বেশি বর্জ্য তৈরি হচ্ছে। তাদের প্রকল্প এই দ্বিমুখী সংকট নিরসনে সহায়ক হবে। এছাড়া, কক্সবাজার ডিসি কলেজের ছাত্রীরা চালকবিহীন ‘স্বয়ংক্রিয় ও নিরাপদ যানবাহন প্রকল্প’ উপস্থাপন করে, যা দুর্ঘটনা হ্রাস, স্বল্প খরচ ও জ্বালানি সাশ্রয়ের প্রতিশ্রুতি দেয়।

বায়তুশ শরফ জব্বারিয়া একাডেমি স্কুল অ্যান্ড কলেজ পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও প্রবীণ শিক্ষক এম এম সিরাজুল ইসলাম মেলায় উপস্থাপিত প্রকল্পগুলো দেখে মুগ্ধ হলেও জেলার বিজ্ঞান শিক্ষার বর্তমান অবস্থা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি জানান, জেলার নয়টি উপজেলায় তিন শতাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিজ্ঞান শিক্ষার্থীর সংখ্যা মাত্র ১ হাজার ৩০০ জনের মতো। ল্যাব ও শিক্ষকের সংকটে এই সংখ্যা দিন দিন কমছে। তবে তিনি আশাবাদী যে, এই ধরনের বিজ্ঞান মেলা শিক্ষার্থীদের বিজ্ঞান শিক্ষায় উৎসাহিত করবে।

জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সালাহউদ্দিন শিক্ষার্থীদের নিয়মিত বিজ্ঞানচর্চার ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, “মেধার বিকাশ ঘটাতে বিজ্ঞানের বিকল্প নেই। তথ্যপ্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে বিজ্ঞানের নতুন নতুন উদ্ভাবন সৃষ্টির লক্ষ্যেই সরকারের এই প্রযুক্তি ও বিজ্ঞান মেলার আয়োজন।”

জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি জাদুঘরের তত্ত্বাবধানে এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের পৃষ্ঠপোষকতায় জেলা প্রশাসন আয়োজিত এই মেলা আজ শুক্রবার শেষ হবে। খুদে বিজ্ঞানীদের এই উদ্ভাবনী প্রচেষ্টা কক্সবাজারের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে বলে আশা করছেন আয়োজক ও দর্শনার্থীরা।

পাঠকপ্রিয়