সোমবার, ১৯ জানুয়ারি ২০২৬

সর্বশেষ

ডেঙ্গু জ্বর হলেই আতঙ্ক নয়, সঠিক সময়ে চিকিৎসা নেওয়ার পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের

চট্টগ্রামে ডেঙ্গুর হানা: মে মাসেই আক্রান্ত দ্বিগুণ, বর্ষায় শঙ্কা বাড়ছে

নিজস্ব প্রতিবেদক

বর্ষা মৌসুমের আগমন ধ্বনির সাথে সাথেই চট্টগ্রামে বাড়ছে ডেঙ্গুর প্রকোপ। গত কয়েক বছরের ধারাবাহিকতায় এবারও থেমে থেমে বৃষ্টি আর ভ্যাপসা গরম এডিস মশার বংশবিস্তারের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করেছে। এর মধ্যেই চট্টগ্রামে বৃষ্টিপাত শুরু হওয়ায় ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে।

চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মে মাস শেষ না হতেই গত এপ্রিল মাসের তুলনায় ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা দ্বিগুণ ছাড়িয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ৪ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন, যাদের সকলেই পুরুষ। বর্তমানে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে ৩ জন এবং উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১ জন চিকিৎসাধীন। চলতি বছরে চট্টগ্রামে এখন পর্যন্ত মোট ২৩০ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন, যার মধ্যে নগরীতে ১০৭ জন এবং বিভিন্ন উপজেলায় ১২৩ জন। দুঃখজনকভাবে, এ বছর ডেঙ্গুতে দুজনের মৃত্যুও হয়েছে। যেখানে গত এপ্রিলে চট্টগ্রামে মোট ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ৩৩, সেখানে চলতি মে মাসের গতকাল পর্যন্ত এই সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭৭ জনে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এডিস মশার বংশবিস্তার রোধ করতে না পারলে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা কমানো কঠিন। বাসা-বাড়ির ছাদ, ফুলের টব, ডাবের খোসা, পরিত্যক্ত টায়ার এবং ফ্রিজের নিচের ট্রে-তে জমে থাকা পরিষ্কার ও বদ্ধ পানিই এডিস মশার প্রধান প্রজনন ক্ষেত্র। তাই এসব স্থানে তিন দিনের বেশি পানি জমতে না দেওয়ার ব্যাপারে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বনের আহ্বান জানিয়েছেন তারা। নিজ নিজ উদ্যোগে ঘরবাড়ি ও আশপাশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখাটাকেই ডেঙ্গু প্রতিরোধের অন্যতম উপায় হিসেবে দেখছেন তারা।

তবে ডেঙ্গু হলেই আতঙ্কিত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার প্রয়োজন নেই বলে জানাচ্ছেন চিকিৎসকেরা। ডেঙ্গু পরীক্ষার (এনএসওয়ান) রিপোর্ট পজিটিভ এলেই হাসপাতালে ভিড় না করে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী বাড়িতে থেকেই চিকিৎসা নেওয়া সম্ভব। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্লাটিলেট কাউন্ট ১০ হাজারের নিচে নেমে গেলে এবং শরীরে অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণের লক্ষণ দেখা দিলে তবেই জরুরি চিকিৎসা বা নিবিড় পর্যবেক্ষণের জন্য হাসপাতালে ভর্তি হওয়া উচিত। সাধারণত জ্বর কমে যাওয়ার পর প্লাটিলেট কমতে শুরু করে এবং সে সময় শারীরিক দুর্বলতা দেখা দেয়। তখন প্রয়োজনে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া যেতে পারে। তারা আরও আশ্বস্ত করেছেন যে, প্লাটিলেট একবার বাড়তে শুরু করলে তা দ্রুতই স্বাভাবিক মাত্রায় চলে আসে।

চট্টগ্রাম জেলার সিভিল সার্জন ডা. মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন, “গত মাসের তুলনায় ডেঙ্গু আক্রান্তের হার বাড়লেও পরিস্থিতি এখনও আতঙ্কের পর্যায়ে যায়নি। প্রতিদিন ২ থেকে ৪ জন করে আক্রান্ত হচ্ছেন। সামনে বর্ষা মৌসুম, তাই নাগরিকদের আরও সতর্ক থাকতে হবে। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন তাদের মশক নিধন কার্যক্রম পরিচালনা করছে। আমাদের ডেঙ্গু ব্যবস্থাপনার পূর্ব অভিজ্ঞতা থাকায়, আক্রান্তের হার কিছুটা বাড়লেও আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। প্রতি বছরের মতো এ বছরও আমরা পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নিয়েছি।”

উল্লেখ্য, গত বছর (২০২৪ সাল) চট্টগ্রামে মোট ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছিলেন ৪ হাজার ৩২৩ জন এবং মারা যান ৪৫ জন। এর আগের বছর, ২০২৩ সালে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ১৪ হাজার ৮৭ জন এবং মৃতের সংখ্যা ছিল ১০৭ জন। ২০২২ সালে ৫ হাজার ৪৪৫ জন আক্রান্তের মধ্যে ৪১ জন এবং ২০২১ সালে ২২১ জন আক্রান্তের মধ্যে ৫ জনের মৃত্যু হয়েছিল। এই পরিসংখ্যান ডেঙ্গুর ভয়াবহতা এবং প্রতিরোধে আরও বেশি মনোযোগ দেওয়ার প্রয়োজনীয়তাকেই তুলে ধরে।

পাঠকপ্রিয়