চট্টগ্রাম বন্দরে প্রাইম মুভার শ্রমিকদের ঘন ঘন কর্মবিরতিতে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমে অচলাবস্থা দেখা দিয়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে আসন্ন ঈদে পোশাক শ্রমিকদের বেতন-ভাতা প্রাপ্তির ওপর। একদিকে সরকার ২৮ মের মধ্যে পোশাক শ্রমিকদের সব বকেয়া বেতন-ভাতা পরিশোধের জন্য মালিকদের প্রতি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছে, অন্যদিকে শিল্প মালিকরা বলছেন, বন্দর নিরবচ্ছিন্নভাবে চালু না থাকলে তারা শ্রমিকদের বেতনের দায়িত্ব নিতে পারবেন না। এই টানাপোড়েনে উদ্বেগ বাড়ছে সব মহলে।
চট্টগ্রাম বন্দর ও বেসরকারি অফডকগুলো থেকে কন্টেইনার পরিবহনের মূল চালিকাশক্তি প্রাইম মুভার শ্রমিকরা বিভিন্ন দাবিতে প্রায়শই কর্মবিরতিতে যাচ্ছেন। সম্প্রতি প্রাইম মুভার শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি সেলিম খান ও দুই সদস্যকে মারধরের প্রতিবাদে ১৫ মে সকাল থেকে লাগাতার কর্মবিরতি শুরু করে প্রাইম মুভার শ্রমিক ইউনিয়ন। এতে বন্দর ও বেসরকারি আইসিডি (ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপো) থেকে কন্টেইনার পরিবহন এবং অফডক কেন্দ্রিক সব ধরনের আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়।
এর আগেও বিভিন্ন ইস্যুতে কর্মবিরতির ঘটনা ঘটেছে। ভারটেক্স ডিপোর দুজন ড্রাইভারের অবসরকালীন পাওনা সংক্রান্ত ঘটনাকে কেন্দ্র করে ৩ মে থেকে ৯ মে পর্যন্ত আকস্মিক কর্মবিরতিতে মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয় বন্দরের কার্যক্রম। ওই ছয় দিনের ধর্মঘটে প্রায় ৪০০ রপ্তানি পণ্যবোঝাই কনটেইনার বন্দরে পৌঁছাতে পারেনি এবং শতাধিক আমদানি পণ্যবোঝাই কনটেইনার ও খালি কনটেইনার ডিপোতে স্থানান্তর করা সম্ভব হয়নি বলে আইসিডি মালিকরা জানান। তার আগে, চলতি বছরের ৪ ফেব্রুয়ারি পার্কিং ইস্যুতে শ্রমিকদের সঙ্গে বিতণ্ডার জেরে চট্টগ্রামে তিন দিন পণ্য পরিবহন বন্ধ ছিল, যার ফলে ১ হাজার ৭৫৬ টিইইউএস রপ্তানি ও খালি কনটেইনার ছাড়াই চারটি জাহাজ বন্দর ছেড়ে যায় এবং প্রায় পাঁচ হাজার আমদানি ও পাঁচ হাজার রপ্তানি কনটেইনারের শিডিউল ব্যাহত হয়।
বাংলাদেশ ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপোস অ্যাসোসিয়েশনের (বিকডা) সভাপতি নুরুল কাইয়ুম খান অভিযোগ করেন, “গত তিন বছর ধরে ডিপোগুলো প্রাইম মুভার শ্রমিকদের অন্যায্য দাবির শিকার হচ্ছে। তারা ইচ্ছাকৃতভাবে আইসিডি খাতকে টার্গেট করে আন্দোলন করছে। এক দাবি আদায় করে আবার নতুন দাবি তোলা হচ্ছে।” এ বিষয়ে ৮ মে চট্টগ্রাম বন্দরের চেয়ারম্যানকে চিঠি দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
চট্টগ্রামের বৃহৎ আইসিডি সামিট অ্যালায়েন্স পোর্ট লিমিটেডের (এসএপিএল) চিফ অপারেটিং অফিসার ক্যাপ্টেন কামরুল ইসলাম মজুমদার বলেন, “শ্রমিকেরা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ডিপোগুলোকে টার্গেট করে কর্মসূচি দেয়। তারা শ্রম আইনের শিফট নিয়ম না মেনে টানা ২৪ ঘণ্টা কাজ করতে চায় এবং ইচ্ছেমতো মজুরি ও ভাতা দাবি করে।” তিনি জানান, চলতি বছরের জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি ও এপ্রিলে সামিট ডিপোতে পরিবহন শ্রমিকেরা মোট ছয়টি কর্মবিরতি পালন করে, যার ফলে মোট ২৩৬ ঘণ্টা কার্যক্রম স্থগিত ছিল।
তবে চট্টগ্রাম জেলা প্রাইম মুভার, ট্রেইলার, কনক্রিট মিক্সচার, ফ্ল্যাট-বেড, ড্রামট্রাক শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক আবুল খায়ের শ্রমিকদের দাবির পক্ষে যুক্তি দেখিয়ে বলেন, “নিয়োগপত্র ও মজুরি নিয়ে মালিকেরা টালবাহানা করেন। মালিকপক্ষ বারবার বৈঠকের আহ্বান উপেক্ষা করায় আমরা বাধ্য হয়ে ধর্মঘট ও কর্মবিরতির পথে যাই।”
এদিকে, পোশাক খাতের শ্রমিকদের বেতন-ভাতা পরিশোধ নিয়ে সরকারের তৎপরতা বেড়েছে। গত ২১ মে এক অনুষ্ঠানে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন হুঁশিয়ার করে বলেছেন, ২৮ মের মধ্যে গার্মেন্টস শ্রমিকদের সব বকেয়া বেতন-ভাতা পরিশোধ করতে হবে, অন্যথায় সংশ্লিষ্ট গার্মেন্টস মালিকদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে, এমনকি তাদের জেলেও যেতে হতে পারে।
তবে বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি কাজী মনিরুজ্জামান ২১ মে রাজধানীর ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে এক অনুষ্ঠানে ভিন্ন সুরে কথা বলেছেন। তিনি বলেন, “২৪ ঘণ্টা বন্দর চালু না থাকলে পোশাকশ্রমিকের বেতন-ভাতার দায়িত্ব মালিকেরা নেবেন না। ঈদ আসছে, কিন্তু চট্টগ্রাম বন্দরে কাজ হচ্ছে না। আমাদের আমদানি-রপ্তানি ব্যাহত হচ্ছে। চীন থেকে ১৪ দিনে চট্টগ্রাম বন্দরে কাঁচামাল আসছে, কিন্তু ঢাকায় পণ্য আসতে লাগছে ১৮ দিন। এভাবে আমরা কীভাবে ব্যবসা করব?”
তিনি সরকারের উদ্দেশে বলেন, “আপনাদের অনেক ইস্যু আছে, সংস্কার করুন, কিন্তু আমাদের কবর দিয়ে নয়, শিল্প ধ্বংস করে নয়। ২৪ ঘণ্টা চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যক্রম চালু রাখতে হবে। তা না হলে ঈদের আগে পোশাকশ্রমিকদের বেতন-ভাতা দেওয়ার দায়িত্ব শিল্পের মালিকেরা নিতে পারবেন না।”
সরকার ও বিজিএমইএর এই বিপরীতমুখী অবস্থানে তৈরি হয়েছে নতুন ঝুঁকি। এই ঝুঁকির মূলে রয়েছে প্রাইম মুভার শ্রমিকদের ঘন ঘন কর্মবিরতি, যা বন্দরের কার্যক্রমকে ব্যাহত করছে। এর ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছেন পোশাক শ্রমিকরা, কারণ বিজিএমইএর সতর্কবার্তা অনুযায়ী, বন্দর সচল না থাকলে তাদের বেতন আটকে যেতে পারে।
এসব বিষয়ে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব ওমর ফারুক বলেন, “বন্দরের উৎপাদনশীলতা যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সে জন্য আমরা সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোকে নিয়মিত সভায় সতর্ক করছি। চলমান বিষয়টিও আমাদের নজরে আছে।”