সোমবার, ১৯ জানুয়ারি ২০২৬

সর্বশেষ

বিপ্লব থেকে বিস্ময়কর উত্থান: যেভাবে স্থিতিশীলতার পথে হাঁটছে শ্রীলঙ্কা

নিজস্ব প্রতিবেদক

মাত্র কয়েক বছর আগেও যে শ্রীলঙ্কা ছিল অর্থনৈতিক দেউলিয়াত্ব, তীব্র গণ-অসন্তোষ আর রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার প্রতিচ্ছবি, সেই দ্বীপরাষ্ট্র আজ স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের এক অভাবনীয় পথে হাঁটছে। ২০২২ সালের প্রবল গণ-অভ্যুত্থানে প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপাকসের নাটকীয় পতন এবং দেশত্যাগের পর যে শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক পালাবদল বিশ্বকে অবাক করেছিল, তার সুফল এখন স্পষ্ট। বামপন্থী নেতা অনূঢ়া কুমারা দিশানায়েকের (একেডি) নেতৃত্বে শ্রীলঙ্কা এক নতুন সম্ভাবনার দিকে যাত্রা শুরু করেছে, যা দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের জন্যেও শিক্ষণীয় হয়ে উঠছে।

২০২২ সালের ১৩ জুলাইয়ের ভোর শ্রীলঙ্কার ইতিহাসে এক যুগান্তকারী মুহূর্ত। রাতের আঁধারে গোতাবায়া রাজাপাকসের দেশত্যাগের পর ক্ষমতায় আসেন রণিল বিক্রমাসিংহে। তবে তার সরকারও গণ-অসন্তোষ পুরোপুরি দূর করতে পারেনি। বিশ্ব অবাক হয়েছিল, চরম সংকট সত্ত্বেও শ্রীলঙ্কায় কোনো বড় ধরনের সহিংসতা বা সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়নি। ‘দ্য ডিপ্লোম্যাট’ ও ‘কারনেগি এনডাওমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিস’-এর মতো আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা এই শান্তিপূর্ণ অবস্থাকে দেশটির গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা ও আন্তর্জাতিক সহায়তা অর্জনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেছিলেন।

এই প্রেক্ষাপটেই ২০২৪ সালের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সেপ্টেম্বরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে এবং নভেম্বরের সংসদীয় নির্বাচনে অনূঢ়া কুমারা দিশানায়েকের নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল পিপলস পাওয়ার (এনপিপি) জোট ঐতিহাসিক বিজয় লাভ করে। প্রথমবারের মতো তৃতীয় কোনো শক্তি দেশটির রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়। একসময়ের সশস্ত্র বিপ্লবী দল জনতা বিমুক্তি পেরামুনা (জেভিপি)-র নেতা একেডি তার দলের অতীতের ভুলের জন্য ক্ষমা চেয়ে এবং সংখ্যালঘু তামিল ও মুসলিমদের আস্থা অর্জনে পদক্ষেপ নিয়ে এক নতুন রাজনৈতিক ধারার সূচনা করেন।

অর্থনীতিতে ‘একেডি ম্যাজিক’

ক্ষমতায় এসেই অনূঢ়া কুমারার সরকার সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয় লাগামহীন মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে। আর তাতে মিলেছে অভাবনীয় সাফল্য। চলতি বছরের এপ্রিলে দেশটির বার্ষিক মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে মাইনাস শূন্য দশমিক ৮ শতাংশে। ২০২৪ সালে শ্রীলঙ্কার অর্থনীতি ৫ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা ছিল পূর্বাভাসের চেয়েও বেশি। কেন্দ্রীয় ব্যাংক মুদ্রানীতি কঠোর রেখে এবং ভর্তুকি পুনর্বিন্যাস করে শুধুমাত্র নিম্নআয়ের মানুষের জন্য টার্গেটেড ক্যাশ ট্রান্সফার চালু করে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘সেন্ট্রাল অ্যান্টি-করাপশন ইউনিট’ গঠন করে রাষ্ট্রীয় অপচয় কমানো হয়েছে।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ), বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের সঙ্গে ঋণ পুনর্গঠনের আলোচনা চূড়ান্ত পর্যায়ে। ‘মেড ইন শ্রীলঙ্কা’ ব্র্যান্ডিংয়ের মাধ্যমে চা, রাবার ও প্রযুক্তি সেবার রফতানি বৃদ্ধি এবং কৃষিপণ্যের জন্য নতুন বাজার সৃষ্টির ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

ভারসাম্যের কূটনীতি ও প্রশাসনিক সংস্কার

পররাষ্ট্রনীতিতেও অনূঢ়া দেখিয়েছেন পরিপক্কতা। চীন ও ভারত উভয়ের সঙ্গেই বিনিয়োগ সহযোগিতা অব্যাহত রেখেও তিনি জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছেন। হাম্বানটোটা বন্দরের মতো প্রকল্পগুলোর চুক্তি পুনর্বিবেচনা এবং নতুন অর্থনৈতিক অঞ্চলের ক্ষেত্রে ‘রিটার্ন অন ইনভেস্টমেন্ট’ নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। খ্যাতিমান বিশ্লেষক নীল দেবোত্তার মতে, “অনূঢ়া কুমারার সরকার চীন ও ভারত উভয় থেকেই বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে চেয়েছে, তবে তাদের মূল লক্ষ্য ছিল এই বিনিয়োগ শ্রীলঙ্কার অর্থনীতির জন্য কতটা উপকারী হবে, রাজাপাকসে আমলের মতো ‘সাদা হাতি’ প্রকল্প এড়ানো।”

প্রশাসনিক দুর্নীতি কমাতে ভূমি নিবন্ধন, ব্যবসায়িক লাইসেন্স এবং কর পরিশোধ ব্যবস্থা একীভূত অনলাইন প্ল্যাটফর্মে আনা হয়েছে। ‘ইউনিফায়েড সিটিজেন প্রোফাইল’ চালুর মাধ্যমে সামাজিক সুরক্ষা সুবিধা প্রাপ্তি সহজ করা হয়েছে।

অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতি ও সামাজিক পরিবর্তন

সংসদ নির্বাচনে প্রায় দ্বিগুণ নারী সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্বও বেড়েছে, যা শ্রীলঙ্কার রাজনীতিতে বিরল। তামিল ও মুসলিমদের জন্য পৃথক উন্নয়ন বাজেট এবং তামিলপ্রধান জেলাগুলোতে ভাষা, শিক্ষা ও অবকাঠামোতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা হয়েছে। তরুণদের জন্য কারিগরি শিক্ষা, স্টার্টআপ ফান্ড এবং কর্মসংস্থানমুখী প্রশিক্ষণে জোর দেওয়া হচ্ছে।

চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা

অবশ্য অনূঢ়া কুমারার সরকারের পথচলা এখনও পুরোপুরি নিষ্কণ্টক নয়। বিপুল বৈদেশিক ঋণের বোঝা, বিশ্ববাজারে শ্রীলঙ্কান পণ্যের প্রতিযোগিতা, কিছু প্রভাবশালী গোষ্ঠীর চাপ এবং অভ্যন্তরীণ চরমপন্থী গোষ্ঠীর তৎপরতা এখনও বড় চ্যালেঞ্জ।

তথাপি, মাত্র এক বছরের কিছু বেশি সময়ে অনূঢ়া কুমারার নেতৃত্বে শ্রীলঙ্কা যে অভাবনীয় স্থিতিশীলতা অর্জন করেছে, তা দেশটির ইতিহাসে এক নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, ২০২২ সালের বিপ্লব-পরবর্তী অর্থনীতি পুনর্গঠন এবং রাজনীতি ও প্রশাসনে স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠার যে চেষ্টা অনূঢ়া করছেন, তা সফল হলে শ্রীলঙ্কা দক্ষিণ এশিয়ার গণতান্ত্রিক পুনর্জাগরণের এক উজ্জ্বল উদাহরণ হয়ে থাকবে। নীল দেবোত্তার ভাষায়, এই শান্তিপূর্ণ রূপান্তর রাজাপাকসে পরিবারের রাজনীতির অবসান ঘটিয়ে এক নতুন গণতান্ত্রিক যুগের সূচনা করেছে।

পাঠকপ্রিয়