সুদহার বাজারভিত্তিক করার পর থেকে দেশের ব্যাংক খাতে আমানত ও ঋণের সুদের হারের ব্যবধান (স্প্রেড) ক্রমান্বয়ে বেড়ে গত এক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চে পৌঁছেছে। চলতি বছরের মার্চে গড় স্প্রেড দাঁড়িয়েছে ৫ দশমিক ৮৭ শতাংশে, যা বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্ধারিত ৪ শতাংশের সীমার অনেক উপরে। কিছু ব্যাংকের ক্ষেত্রে এই স্প্রেড ১০ শতাংশও ছাড়িয়েছে। এতে ব্যাংকগুলোর মুনাফার সম্ভাবনা বাড়লেও সাধারণ আমানতকারী ও ঋণগ্রহীতারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের মার্চেও ব্যাংক খাতের গড় স্প্রেড ছিল ২ দশমিক ৯৬ শতাংশ। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে ২০২৩ সালের জুলাইয়ে ঋণের সুদহারের সীমা তুলে দিয়ে ‘স্মার্ট’ সুদহার করিডোর চালু করা হয় এবং পরবর্তীতে ২০২৪ সালের ৮ মে সুদহার পুরোপুরি বাজারের ওপর ছেড়ে দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এরপর থেকেই স্প্রেড লাফিয়ে বাড়তে থাকে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত দেড় দশকে ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে দেশের প্রায় দুই ডজন ব্যাংক দুর্বল হয়ে পড়েছে। এসব ব্যাংক ১২-১৪ শতাংশ সুদের প্রস্তাব দিয়েও আমানত পাচ্ছে না, উল্টো গ্রাহকরা সেখান থেকে টাকা তুলে নিয়ে অপেক্ষাকৃত ভালো ব্যাংকে ৪-৬ শতাংশ সুদেও জমা রাখছেন। এর ফলে ব্যাংক খাতে এক ধরনের ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়েছে, যেখানে ভালো ব্যাংকগুলো উচ্চ স্প্রেডের সুবিধা পাচ্ছে, আর দুর্বল ব্যাংকগুলো লোকসানে পড়ছে। উচ্চ সুদের চাপে ভালো উদ্যোক্তারাও ঋণখেলাপি হচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, “স্প্রেড নিয়ে ব্যাংকগুলোকে নিয়মিত দিকনির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে। কোনো ব্যাংকের স্প্রেড ৪ শতাংশের বেশি হলেই নোটিস করা হয়। কিছু ব্যাংক সুনামের সুফল পাচ্ছে, আর কিছু ব্যাংক ভাবমূর্তি সংকটের খেসারত দিচ্ছে। বেশি সুদ দেয়ার প্রস্তাব সত্ত্বেও গ্রাহকরা দুর্বল ব্যাংকে আমানত রাখতে রাজি হচ্ছেন না, কম সুদে ভালো ব্যাংকে টাকা রাখছেন। আবার ভালো ব্যাংক থেকে বেশি সুদেও ঋণ নিচ্ছেন। বিষয়টি বাংলাদেশ ব্যাংক নজরে রাখছে।”
চলতি বছরের মার্চে দেশের ব্যাংকগুলোর আমানতের গড় সুদহার ছিল ৬ দশমিক ১৭ শতাংশ, আর ঋণের গড় সুদহার ছিল ১২ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ। এর মধ্যে বিদেশি ব্যাংকগুলোর গড় স্প্রেড ছিল সর্বোচ্চ ৮ দশমিক ৯৫ শতাংশ, রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ৬ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ এবং বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলোর ৫ দশমিক ৬০ শতাংশ।
উদাহরণস্বরূপ, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের আমানতের গড় সুদহার ছিল মাত্র দশমিক ৬৩ শতাংশ, কিন্তু ঋণের সুদহার ছিল ১০ দশমিক ৩২ শতাংশ, ফলে তাদের স্প্রেড দাঁড়ায় ৯ দশমিক ৬৯ শতাংশ। ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের স্প্রেড ৯ দশমিক ৭৩ শতাংশ (আমানতে সুদ ২.৩৬%, ঋণে ১২%-এর বেশি)। শাহ্জালাল ইসলামী ব্যাংক ও প্রাইম ব্যাংকের স্প্রেড যথাক্রমে ৭ দশমিক ১৪ ও ৫ দশমিক ৮২ শতাংশ।
তবে মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের (এমটিবি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান মনে করেন, স্প্রেড হিসাবায়নে কোনো ভুল হতে পারে, কারণ তার ব্যাংকের প্রকৃত স্প্রেড ৩ শতাংশের কাছাকাছি হলেও বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে তা ৫ দশমিক ৪৭ শতাংশ দেখানো হচ্ছে। তিনি জানান, তারল্য সংকটের কারণে ব্যাংকগুলো মেয়াদি আমানতে ১১-সাড়ে ১১ শতাংশ পর্যন্ত সুদ দিচ্ছে, আর ঋণ দিচ্ছে সাড়ে ১২-১৩ শতাংশে, ফলে মুনাফার মার্জিন কম।
উচ্চ সুদহারের প্রভাবে খেলাপি ঋণও বাড়ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, গত ডিসেম্বর শেষে ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৪৫ হাজার ৭৬৪ কোটি টাকা, যা বিতরণকৃত ঋণের ২০ দশমিক ২০ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর খেলাপি ঋণ ৩০ শতাংশ ছাড়ানোর আশঙ্কার কথা বলেছিলেন।
এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি মীর নাসির হোসেন বলেন, “আগে ৭-৮ শতাংশ সুদে ঋণ পেলেও এখন ১৪ শতাংশ সুদেও মিলছে না। বাড়তি সুদের চাপে ভালো ব্যবসায়ীরাও খেলাপি হচ্ছেন। ডলারের বিনিময় হার বৃদ্ধিতে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে, কিন্তু কারখানা সচল রাখার জন্য প্রয়োজনীয় গ্যাস ও বিদ্যুৎ মিলছে না। এভাবে চলতে পারে না।”
এই পরিস্থিতি দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি ও বিনিয়োগ পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।