চট্টগ্রাম নগরী যেন সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী ‘কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্টের (কেএনএফ)’ ইউনিফর্ম তৈরির এক গোপন কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে! গত দুই সপ্তাহে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার অভিযানে তিন দফায় প্রায় ৪৭ হাজারেরও বেশি সন্দেহজনক সামরিক পোশাক জব্দের ঘটনায় তোলপাড় চলছে দেশজুড়ে। সর্বশেষ মঙ্গলবার (২৭ মে) রাতে নগরের পাহাড়তলী থানার একটি কারখানা থেকে আরও ১৫ হাজার পিস পোশাক জব্দ করে বায়েজিদ বোস্তামী থানার পুলিশ। একের পর এক এই বিপুল পরিমাণ ইউনিফর্ম উদ্ধারের ঘটনা পাহাড়ে কেএনএফের নতুন করে ব্যাপক মাত্রায় সংগঠিত হওয়া এবং বড় ধরনের কোনো সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার দিকেই ইঙ্গিত করছে বলে মনে করছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও গোয়েন্দা কর্মকর্তারা।
এই সর্বশেষ ইউনিফর্ম উদ্ধারের বিষয়ে পুলিশ কর্মকর্তারা আনুষ্ঠানিকভাবে মুখ খুলতে নারাজ। বিষয়টি অত্যন্ত স্পর্শকাতর হওয়ায় তাঁদের মধ্যে এক ধরনের মন্তব্যে অনীহা স্পষ্ট। তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে নগর পুলিশের একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা অভিযানের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। পাহাড়তলী থেকে ইউনিফর্ম জব্দের ঘটনায় থানায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং অভিযানে আটক কারখানার ব্যবস্থাপনা পরিচালক মতিউর রহমানকে সেই মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।
এর ঠিক আগের দিন, সোমবারও (২৬ মে) চট্টগ্রাম নগরের একটি গুদাম থেকে ১১ হাজার ৭৮৫টি ইউনিফর্ম জব্দ করা হয়েছিল। পুলিশের একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে, এসব ইউনিফর্মও পাহাড়ের সশস্ত্র সংগঠন কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্টের জন্যই তৈরি করা হচ্ছিল।
তবে, এই সিরিজের প্রথম এবং সবচেয়ে বড় চালানটি জব্দ হয়েছিল গত ১৭ মে (শনিবার)। সেদিন রাতে নগরের বায়েজিদ বোস্তামী থানার নয়ারহাট এলাকার ‘রিংভো অ্যাপারেলস’ নামক একটি কারখানা থেকে ২০ হাজার ৩০০টি সন্দেহজনক পোশাক জব্দ করে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। এ ঘটনায় দায়েরকৃত মামলার এজাহারে পুলিশ স্পষ্টভাবে উল্লেখ করে, ইউনিফর্মগুলো কেএনএফের জন্য তৈরি হচ্ছিল এবং এর জন্য দুই কোটি টাকার একটি চুক্তি হয়েছিল। এই ঘটনায় পোশাক কারখানাটির মালিক সাহেদুল ইসলাম এবং ফরমাশকারী হিসেবে গোলাম আজম ও নিয়াজ হায়দার নামে তিনজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। নগর গোয়েন্দা পুলিশের উপপরিদর্শক (এসআই) ইকবাল হোসেন বাদী হয়ে ১৮ মে বায়েজিদ বোস্তামী থানায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলাটি করেন। মামলায় গ্রেপ্তার তিনজন ছাড়াও রাঙামাটির কাপ্তাইয়ের মংহলাসিন মারমা (৩৭) নামে এক ব্যক্তিকে মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে আসামি করা হয়।
পরপর এই তিনটি বড় চালান জব্দের ঘটনায় পুলিশ, র্যাব, সেনাবাহিনীসহ সকল গোয়েন্দা সংস্থা নড়েচড়ে বসেছে। সশস্ত্র এই গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে শিগগিরই বড় ধরনের ‘সাঁড়াশি অভিযান’ পরিচালনার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। পাশাপাশি, ইউনিফর্ম প্রস্তুতকারী কারখানাগুলোর ব্যাংক হিসাবসহ যাবতীয় কার্যক্রম নিবিড়ভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর (অব.) এমদাদুল ইসলাম এই ঘটনাপ্রবাহকে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য একটি গুরুতর হুমকি হিসেবে দেখছেন। তিনি বলেন, “পাহাড় নিয়ে যেসব আশঙ্কার কথা বারবার আলোচিত হচ্ছিল, এই ইউনিফর্ম জব্দের ধারাবাহিক ঘটনা তারই সুস্পষ্ট আলামত। কেএনএফ-এর বিপুল পরিমাণ ইউনিফর্ম তৈরির ফরমাশ প্রমাণ করে তাদের পেছনে বড় ধরনের এবং সম্ভবত একাধিক আর্থিক মদদদাতা রয়েছে। খোদ শহরের ভেতরে ঢুকে এত বিপুল পরিমাণ পোশাক তৈরির বিষয়টি অত্যন্ত খারাপ ইঙ্গিত বহন করে। এখনই যদি কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া না হয়, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।”
এই বিষয়ে গত ৩০ মে সেনানিবাসে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে (প্রথম ইউনিফর্ম চালান জব্দের পর) সেনাবাহিনীর মিলিটারি অপারেশন্সের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. নাজিম-উল-দৌলা সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেছিলেন, “চট্টগ্রামের একটি কারখানায় ২০ হাজার ৩০০ ইউনিফর্ম উদ্ধারের ঘটনাটি নিঃসন্দেহে উদ্বেগের। এই পোশাক কাদের জন্য এবং কী উদ্দেশ্যে তৈরি করা হচ্ছিল, তা আমরা খুঁজে বের করার চেষ্টা করছি। এটি দেশের নিরাপত্তার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত, তাই বিষয়টিকে আমরা অত্যন্ত গুরুত্বসহকারে নিয়েছি।” নতুন করে আরও দুটি চালান জব্দের পর সেনাবাহিনীর উদ্বেগ যে আরও বেড়েছে, তা সহজেই অনুমেয়।
এদিকে, বিপুল সংখ্যক ইউনিফর্ম জব্দের ঘটনা কেএনএফের প্রকৃত সদস্য সংখ্যা এবং তাদের সাংগঠনিক শক্তি নিয়ে নতুন করে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। যদিও সরকারি আদমশুমারিতে বম জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ১২ থেকে ১৫ হাজারের মধ্যে উল্লেখ করা হয়, কেএনএফ সংশ্লিষ্ট সূত্র ও তাদের সমর্থক বিশ্লেষকদের দাবি, এই সংখ্যাটি সঠিক নয়।
সি.এ. রামলিয়ান বম নামে মিয়ানমারভিত্তিক একজন রাজনৈতিক বিশ্লেষক, (যিনি কেএনএফের বক্তব্য তুলে ধরেন বলে পরিচিত), জানান, অতীতে দুর্গমতার কারণে বম-কুকি জনগোষ্ঠীর সঠিক গণনা সম্ভব হয়নি। তার দাবি, বাংলাদেশে বম জনগোষ্ঠীর সংখ্যা প্রায় ২০ হাজার এবং ভারত ও মিয়ানমারসহ এই জনগোষ্ঠীর মোট সংখ্যা লক্ষাধিক হতে পারে।
তিনি আরও দাবি করেন, কেএনএফ শুধু বম জনগোষ্ঠী নয়, বরং কুকি-চিন জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত ম্রো, খুমি, পাংখুয়া, লুসাই, খিয়াংসহ পার্বত্য চট্টগ্রামের সকল অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রাম করছে এবং এসব জনগোষ্ঠী থেকেও তাদের সদস্য রয়েছে। এই হিসেবে, পার্বত্য চট্টগ্রামে কুকি-চিন জনগোষ্ঠীর মোট সংখ্যা প্রায় দেড় লক্ষের কাছাকাছি বলে তারা দাবি করে।
কেএনএফের পক্ষ থেকে আরও বলা হয়, “বম পার্টি” আখ্যাটি তাদের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করার উদ্দেশ্যে প্রতিপক্ষ আঞ্চলিক রাজনৈতিক সংগঠন (পিসিজেএসএস) ও রাষ্ট্রীয় কিছু মহল কর্তৃক প্রচারিত, যা তারা দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করে। তাদের ভাষ্যমতে, কেএনএফ একটি স্বশাসিত অঞ্চল প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সংগ্রামরত এবং তাদের দাবীর প্রতি রাষ্ট্র কর্ণপাত না করলে তারা তাদের সশস্ত্র তৎপরতা আরও জোরদার করবে, প্রয়োজনে তাদের সদস্যদের কাচিন ও কারেন প্রদেশে উন্নত প্রশিক্ষণের জন্য পাঠানোর পরিকল্পনাও তাদের রয়েছে।
মামলার তদন্তকারী পুলিশ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গ্রেপ্তারকৃতদের জিজ্ঞাসাবাদে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মিলেছে। অর্থের জোগানদাতাদের এবং এই বিস্তৃত নেটওয়ার্কের পেছনের হোতাদের শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে। একইসঙ্গে, কেএনএফ কেন একবারে এত বিপুল সংখ্যক ইউনিফর্ম তৈরি করছিল, তাদের সামরিক শাখার প্রকৃত সদস্য সংখ্যা কত এবং তাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য কী – এসব প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধানেও নানামুখী তদন্ত চলছে।
উল্লেখ্য, প্রায় তিন বছর আগে ফেসবুকে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়ে আত্মপ্রকাশ করে কেএনএফ। তারা রাঙামাটি ও বান্দরবানের ৯টি উপজেলা নিয়ে ‘স্বশাসিত’ রাজ্যের দাবি তোলে। পরবর্তীতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সশস্ত্র সংঘাত, অর্থের বিনিময়ে জঙ্গি প্রশিক্ষণ প্রদান এবং গত বছরের (২০২৪) এপ্রিলে ব্যাংক ডাকাতির মতো ভয়াবহ ঘটনার জন্ম দেয় তারা। তীব্র অভিযানের মুখে তাদের অনেক সদস্য সীমান্ত পেরিয়ে পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে পালিয়ে গেলেও, চট্টগ্রামে এই বিপুল পরিমাণ ইউনিফর্ম জব্দের ঘটনা প্রমাণ করে তারা আবারও সংগঠিত হওয়ার এবং সম্ভবত বড় ধরনের কোনো নাশকতার প্রস্তুতি নিচ্ছে। পাহাড়ে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে এবং সমন্বিত অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে জানা গেছে।