সোমবার, ১৯ জানুয়ারি ২০২৬

সর্বশেষ

উদ্বোধনের ১৯ মাসেও বেহাল দশা, চালু হয়নি অধিকাংশ সেবা, ক্ষুব্ধ যাত্রীরা

কক্সবাজার রেলস্টেশনে ‘সব থেকেও নেই কিছুই’: কেন এই বেহাল দশা?

নিজস্ব প্রতিবেদক

কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত থেকে প্রায় ছয় কিলোমিটার দূরে ঝিলংজা ইউনিয়নের চান্দের পাড়ায় ২৯ একর জমির ওপর প্রায় ২৩৬ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত দেশের একমাত্র ঝিনুক আকৃতির আইকনিক রেলস্টেশনটি উদ্বোধনের প্রায় এক বছর সাত মাস পেরিয়ে গেলেও অধিকাংশ যাত্রীসেবাই চালু হয়নি। অবকাঠামো তৈরি হয়ে পড়ে থাকায় বিদ্যুতের তার ও বাল্বসহ মূল্যবান সরঞ্জামাদি চুরির ঘটনা ঘটছে এবং পরিকল্পিত বাণিজ্যিক ব্যবহার শুরু না হওয়ায় সরকার বড় অঙ্কের রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এতে একদিকে যেমন যাত্রীরা চরম ভোগান্তি ও হতাশার শিকার হচ্ছেন, অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় সম্পদেরও অপচয় হচ্ছে।

২০২৩ সালের ১১ নভেম্বর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১০১ কিলোমিটার দীর্ঘ দোহাজারী-কক্সবাজার রেলপথের সঙ্গে এই দৃষ্টিনন্দন রেলস্টেশনটিও উদ্বোধন করেন। ১৮ হাজার ৩৪ কোটি টাকার এই রেল প্রকল্পটি সরকারের একটি অগ্রাধিকার (ফাস্ট ট্র্যাক) প্রকল্প ছিল। কিন্তু সরেজমিনে গত ২৮ মে রেলস্টেশন ঘুরে দেখা যায়, ছয়তলা বিশিষ্ট ১ লাখ ৮৭ হাজার বর্গফুটের শীতাতপনিয়ন্ত্রিত এই ভবনের অধিকাংশ সুযোগ-সুবিধাই অকার্যকর। নিচতলায় তথ্যকেন্দ্র, মসজিদ, শিশুদের বিনোদনের জায়গা, প্যাসেঞ্জার লাউঞ্জ ও পদচারী-সেতু; দ্বিতীয় তলায় শপিং মল, শিশুযত্ন কেন্দ্র ও রেস্তোরাঁ; তৃতীয় তলায় ৩৯ কক্ষবিশিষ্ট তারকা মানের হোটেল এবং চতুর্থ তলায় রেস্তোরাঁ, শিশুযত্ন কেন্দ্র, কনফারেন্স হল ও কর্মকর্তাদের কার্যালয় – এগুলোর একটিও এখন পর্যন্ত চালু করা হয়নি।

ভবনের সম্মুখভাগে ঝিনুক আকৃতির যে ফোয়ারাটি তৈরি করা হয়েছে এবং যা দিয়ে যাত্রীদের স্টেশনে প্রবেশ করার কথা, সেই প্রবেশপথটিও বন্ধ এবং ফোয়ারায় নেই কোনো পানির প্রবাহ। যাত্রীরা বর্তমানে ট্রেন থেকে নেমে পূর্ব পাশের একটি সরু প্ল্যাটফর্ম ও একটি মাত্র গেট ব্যবহার করে স্টেশনে প্রবেশ ও বাহির হচ্ছেন, যা দুটি ট্রেনের যাত্রীদের আগমনের সময় চরম ভিড় ও বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি করে।

টিকিট কালেক্টর শরীফুল ইসলাম জানান, এই অব্যবস্থাপনার কারণে যাত্রীদের সঙ্গে প্রায়শই তর্কাতর্কি হয়। প্ল্যাটফর্মে যাত্রীদের বসার বা নামাজের কোনো ব্যবস্থা নেই, নেই পর্যাপ্ত খাবারের দোকান বা শৌচাগার। অসুস্থ ও প্রতিবন্ধী যাত্রীদের জন্য নির্মিত চলন্ত সিঁড়িগুলোও বন্ধ পড়ে আছে।

ঢাকা থেকে আসা যাত্রী হাবিব রহমান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “এক বছর আগে রেলস্টেশনের যে বেহাল অবস্থা দেখেছিলাম, এখনও তাই। উদ্বোধনের সময় বলা হয়েছিল, পর্যটকেরা রাতের ট্রেনে এসে লকারে জিনিসপত্র রেখে সমুদ্রসৈকত ঘুরে আবার রাতের ট্রেনেই ফিরতে পারবেন, কিন্তু এসবের কিছুই বাস্তবায়ন হয়নি।” অসুস্থ মাকে নিয়ে আসা আরেক যাত্রী রমজানুল ইসলাম বলেন, “চলন্ত সিঁড়ি বন্ধ থাকায় হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী বা হাঁটতে অক্ষম যাত্রীদের অবর্ণনীয় দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।”

আইকনিক রেলস্টেশনের প্রধান কর্মকর্তা (স্টেশন ম্যানেজার) গোলাম রব্বানী জানান, যাত্রীসেবার কিছুই এখন পর্যন্ত চালু করা সম্ভব হয়নি। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান অবকাঠামো নির্মাণ করলেও তা গত ২৮ মে পর্যন্ত বাংলাদেশ রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করেনি। বর্তমানে দৈনিক দুই জোড়া ট্রেন কক্সবাজার-চট্টগ্রাম-ঢাকা রুটে চলাচল করলেও যাত্রীদের কাঙ্ক্ষিত সেবা দেওয়া যাচ্ছে না।

অন্যদিকে, রেলস্টেশনের ক্যারেজ ডিপোর উপসহকারী প্রকৌশলী (রেলযান পরীক্ষক) আব্দুল জলিল জানান, গত চার মাসে কয়েক দফা চুরির ঘটনায় প্রায় ছয় হাজার মিটার বিদ্যুতের তার ও অসংখ্য বাল্ব খোয়া গেছে। এর ফলে সন্ধ্যার পর ট্রেন ওয়াশ করা এবং ট্রেনের আন্ডার গিয়ার পরীক্ষা করতে সমস্যা হচ্ছে। এমনকি সম্প্রতি সেপটিক ট্যাংকের আটটি ঢাকনাও চুরি হয়ে গেছে। পর্যাপ্ত নিরাপত্তারক্ষীর অভাবেই এসব চুরির ঘটনা ঘটছে বলে তিনি মনে করেন।

ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ম্যাক্স ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেডের কর্মকর্তা ও আইকনিক রেলস্টেশনের প্রকৌশলী রাসেল মিয়া অবশ্য দাবি করেন, “আইকনিক রেলস্টেশনের সব কাজ ইতিমধ্যে শেষ হয়েছে। নির্মাণ পরবর্তী এক বছর রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের থাকে এবং আমরা অল্প জনবল দিয়ে সেই সময় পার করছি। ভবনের কোথাও সমস্যা দেখা দিলে তা ঠিক করে দেওয়া হচ্ছে। ছাদ দিয়ে আগে বৃষ্টির পানি পড়লেও এখন তা বন্ধ আছে। আগামী সেপ্টেম্বর মাসে আমরা রেলস্টেশনটি রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করব।”

কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি আবু মোর্শেদ চৌধুরী বলেন, “কক্সবাজারবাসী দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর এই আইকনিক রেলস্টেশন পেয়েছে। দৈনিক ১০ জোড়া ট্রেন চলাচলের উপযোগী এই স্টেশনে এখন মাত্র দুই জোড়া ট্রেন চলছে। মালবাহী ট্রেন চালু না হওয়ায় কক্সবাজারে উৎপাদিত লবণ, মাছ, পান-সুপারিসহ টেকনাফ স্থলবন্দরের আমদানি-রপ্তানি পণ্য পরিবহন করা যাচ্ছে না, ফলে সরকারও বিপুল রাজস্ব হারাচ্ছে। সার্বিক অব্যবস্থাপনা ও যাত্রীসেবার অভাবে যাত্রীরা ক্ষুব্ধ।”

পাঠকপ্রিয়