সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সর্বশেষ

হাজার কোটি টাকার পর্যটন ব্যবসা, তবু অরক্ষিত সৈকত, দায় কার?

👤
নিজস্ব প্রতিবেদক
0 Shares
f

ঈদের ছুটিতে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে বেড়াতে এসে মাত্র দুই দিনে পর্যটকসহ ছয়জনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। সৈকতের বিভিন্ন স্থানে ভাঙন ও নতুন করে ‘গুপ্তখাল’ বা চোরা স্রোত তৈরি হওয়ায় এবং পর্যটকদের জন্য পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ও উদ্ধার ব্যবস্থা না থাকায় এই দুর্ঘটনাগুলো ঘটছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বিপুল পর্যটকের সমাগম এবং পর্যটন খাত থেকে হাজার কোটি টাকা আয় সত্ত্বেও নিরাপদ গোসলের ব্যবস্থা না হওয়ায় পর্যটন সংশ্লিষ্ট এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশার সৃষ্টি হয়েছে।

টুরিস্ট পুলিশ ও হোটেল-মোটেল কর্তৃপক্ষের হিসাব অনুযায়ী, ঈদের ছুটির প্রথম দুই দিনে (রবি ও সোমবার) অন্তত আড়াই লাখ পর্যটক কক্সবাজারে এসেছেন এবং আগামী দুই দিনে আরও তিন লাখ পর্যটকের সমাগম হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ভ্রমণে আসা ৯০ শতাংশ পর্যটকই সাগরে গোসল করতে নামেন। কিন্তু ১২০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সৈকতের মাত্র ৫ কিলোমিটার (কলাতলী থেকে লাবণী পয়েন্ট) এলাকায় একটি বেসরকারি সংস্থার ২৬ জন লাইফগার্ড কর্মী উদ্ধার তৎপরতায় নিয়োজিত আছেন। বাকি ১১৫ কিলোমিটার সৈকত, বিশেষ করে টেকনাফ, বাহারছড়া, পাটোয়ারটেক, ইনানী ও হিমছড়ির মতো জনপ্রিয় স্থানগুলো পুরোপুরি অরক্ষিত।

পুলিশ ও লাইফগার্ড সূত্রে জানা যায়, সোমবার (৯ জুন) দুপুরে সৈকতের কলাতলী পয়েন্টে গোসলে নেমে রাজশাহীর পর্যটক শাহিনুর রহমান (৫৮) ও তার ছেলে সিফাত রহমান (২০) মারা যান। এর আগের দিন, রবিবার (৮ জুন) বিকেলে লাবণী পয়েন্টে নিখোঁজ হন চট্টগ্রামের দেওয়ানবাজার এলাকার বাসিন্দা ও গ্রাফিকস ডিজাইনার মো. রাজীব (৩০); প্রায় ৭ ঘণ্টা পর রাতে তার লাশ ভেসে আসে। একই দিনে শৈবাল পয়েন্টে নিখোঁজ হন শহরের বাহারছড়া এলাকার বাসিন্দা নুরুল ইসলাম এবং অজ্ঞাতপরিচয় আরেকজন পর্যটক। সোমবার দুপুরে সৈকতের নাজিরারটেক পয়েন্টে নুরুল ইসলামের এবং খুরুশকুলের আশ্রয়ণ প্রকল্প সংলগ্ন বাঁকখালীর মোহনা থেকে ওই অজ্ঞাত পর্যটকের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ নিয়ে গত দুই দিনে মোট ছয়জনের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।

কক্সবাজার সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ইলিয়াস খান বলেন, বৈরী আবহাওয়ায় সাগর উত্তাল রয়েছে এবং সাম্প্রতিক বৃষ্টিতে সৈকতের বিভিন্ন পয়েন্টে বেশ কয়েকটি গুপ্তখাল তৈরি হয়েছে। এসব ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে গোসলে নামতে নিষেধ করে লাল নিশানা ওড়ানো হলেও অনেক পর্যটক তা অমান্য করে বিপদে পড়ছেন।

সি-সেফ লাইফগার্ডের সুপারভাইজার সিফাত সাইফুল্লাহ জানান, পাহাড় থেকে নেমে আসা ঢলের পানিতে নতুন করে গুপ্তখাল তৈরি হওয়ায় পর্যটকদের ঝুঁকি বেড়েছে। তিনি বলেন, “দৈনিক এক লাখের বেশি পর্যটককে মাত্র ২৫ জন লাইফগার্ড, ২৫ জন বিচ কর্মী ও ৭০-৮০ জন টুরিস্ট পুলিশ দিয়ে সামাল দেওয়া অত্যন্ত কঠিন।” সি-সেফ প্রতিষ্ঠানের তথ্যমতে, গত বছরের আগস্ট ও সেপ্টেম্বরেই স্রোতের টানে ভেসে গিয়ে পাঁচজন পর্যটকের মৃত্যু হয়েছিল।

পরিবেশবিষয়ক বেসরকারি সংগঠন ‘ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা)’-এর কক্সবাজার জেলা শাখার সভাপতি ফজলুল কাদের চৌধুরী বলেন, “সৈকতকে ঘিরে হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগে ছয় শতাধিক হোটেল-রিসোর্ট গড়ে উঠেছে, কিন্তু কয়েক লাখ টাকা খরচ করে সমুদ্রের পানিতে জাল দিয়ে নিরাপদ বেষ্টনী বা ‘সি-নেটিং’ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে কেউ আগ্রহী নয়। সৈকতের ছাতা-চেয়ার, বিচ বাইক, ঘোড়া ইত্যাদি থেকে বিচ ম্যানেজমেন্ট কমিটি প্রতিবছর মোটা অঙ্কের টাকা আয় করলেও পর্যটকদের নিরাপত্তায় তা ব্যয় হয় না।”

কক্সবাজার কলাতলী হোটেল রিসোর্ট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মুকিম খান বলেন, হোটেলে পর্যটকদের নিরাপত্তা ঝুঁকি সম্পর্কে অবহিত করা হলেও অনেকে নির্দেশনা না মেনে ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে গোসলে নামেন, যা হোটেল মালিকদেরও বিব্রত করে।

জেলা প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা জানান, এক যুগ আগে লাবণী পয়েন্টে জাল দিয়ে নিরাপদ গোসলের ব্যবস্থা করা হয়েছিল, কিন্তু ঢেউয়ের ধাক্কায় তা কয়েক মাসেই বিলীন হয়ে যায়। সম্প্রতি ভাঙন তীব্র হওয়ায় কোথায় নতুন করে নিরাপদ ব্যবস্থা গড়ে তোলা যায়, তা নিয়ে গবেষণা প্রয়োজন বলে তিনি মন্তব্য করেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

পাঠকপ্রিয়

যোগাযোগ: সুপ্রিম মার্কেট, ৩য় তলা , ৩২, এন এ চৌধুরী রোড,  আন্দরকিল্লা , চট্টগ্রাম।
ইমেইল : news@banglarpatrika.com
মোবাইল: ০১৭১১-৮৩০৮৭৩

হাজার কোটি টাকার পর্যটন ব্যবসা, তবু অরক্ষিত সৈকত, দায় কার?

নিজস্ব প্রতিবেদক
১১ জুন ২০২৫, ১৩:০৯

ঈদের ছুটিতে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে বেড়াতে এসে মাত্র দুই দিনে পর্যটকসহ ছয়জনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। সৈকতের বিভিন্ন স্থানে ভাঙন ও নতুন করে ‘গুপ্তখাল’ বা চোরা স্রোত তৈরি হওয়ায় এবং পর্যটকদের জন্য পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ও উদ্ধার ব্যবস্থা না থাকায় এই দুর্ঘটনাগুলো ঘটছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বিপুল পর্যটকের সমাগম এবং পর্যটন খাত থেকে হাজার কোটি টাকা আয় সত্ত্বেও নিরাপদ গোসলের ব্যবস্থা না হওয়ায় পর্যটন সংশ্লিষ্ট এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশার সৃষ্টি হয়েছে।

টুরিস্ট পুলিশ ও হোটেল-মোটেল কর্তৃপক্ষের হিসাব অনুযায়ী, ঈদের ছুটির প্রথম দুই দিনে (রবি ও সোমবার) অন্তত আড়াই লাখ পর্যটক কক্সবাজারে এসেছেন এবং আগামী দুই দিনে আরও তিন লাখ পর্যটকের সমাগম হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ভ্রমণে আসা ৯০ শতাংশ পর্যটকই সাগরে গোসল করতে নামেন। কিন্তু ১২০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সৈকতের মাত্র ৫ কিলোমিটার (কলাতলী থেকে লাবণী পয়েন্ট) এলাকায় একটি বেসরকারি সংস্থার ২৬ জন লাইফগার্ড কর্মী উদ্ধার তৎপরতায় নিয়োজিত আছেন। বাকি ১১৫ কিলোমিটার সৈকত, বিশেষ করে টেকনাফ, বাহারছড়া, পাটোয়ারটেক, ইনানী ও হিমছড়ির মতো জনপ্রিয় স্থানগুলো পুরোপুরি অরক্ষিত।

পুলিশ ও লাইফগার্ড সূত্রে জানা যায়, সোমবার (৯ জুন) দুপুরে সৈকতের কলাতলী পয়েন্টে গোসলে নেমে রাজশাহীর পর্যটক শাহিনুর রহমান (৫৮) ও তার ছেলে সিফাত রহমান (২০) মারা যান। এর আগের দিন, রবিবার (৮ জুন) বিকেলে লাবণী পয়েন্টে নিখোঁজ হন চট্টগ্রামের দেওয়ানবাজার এলাকার বাসিন্দা ও গ্রাফিকস ডিজাইনার মো. রাজীব (৩০); প্রায় ৭ ঘণ্টা পর রাতে তার লাশ ভেসে আসে। একই দিনে শৈবাল পয়েন্টে নিখোঁজ হন শহরের বাহারছড়া এলাকার বাসিন্দা নুরুল ইসলাম এবং অজ্ঞাতপরিচয় আরেকজন পর্যটক। সোমবার দুপুরে সৈকতের নাজিরারটেক পয়েন্টে নুরুল ইসলামের এবং খুরুশকুলের আশ্রয়ণ প্রকল্প সংলগ্ন বাঁকখালীর মোহনা থেকে ওই অজ্ঞাত পর্যটকের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ নিয়ে গত দুই দিনে মোট ছয়জনের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।

কক্সবাজার সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ইলিয়াস খান বলেন, বৈরী আবহাওয়ায় সাগর উত্তাল রয়েছে এবং সাম্প্রতিক বৃষ্টিতে সৈকতের বিভিন্ন পয়েন্টে বেশ কয়েকটি গুপ্তখাল তৈরি হয়েছে। এসব ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে গোসলে নামতে নিষেধ করে লাল নিশানা ওড়ানো হলেও অনেক পর্যটক তা অমান্য করে বিপদে পড়ছেন।

সি-সেফ লাইফগার্ডের সুপারভাইজার সিফাত সাইফুল্লাহ জানান, পাহাড় থেকে নেমে আসা ঢলের পানিতে নতুন করে গুপ্তখাল তৈরি হওয়ায় পর্যটকদের ঝুঁকি বেড়েছে। তিনি বলেন, “দৈনিক এক লাখের বেশি পর্যটককে মাত্র ২৫ জন লাইফগার্ড, ২৫ জন বিচ কর্মী ও ৭০-৮০ জন টুরিস্ট পুলিশ দিয়ে সামাল দেওয়া অত্যন্ত কঠিন।” সি-সেফ প্রতিষ্ঠানের তথ্যমতে, গত বছরের আগস্ট ও সেপ্টেম্বরেই স্রোতের টানে ভেসে গিয়ে পাঁচজন পর্যটকের মৃত্যু হয়েছিল।

পরিবেশবিষয়ক বেসরকারি সংগঠন ‘ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা)’-এর কক্সবাজার জেলা শাখার সভাপতি ফজলুল কাদের চৌধুরী বলেন, “সৈকতকে ঘিরে হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগে ছয় শতাধিক হোটেল-রিসোর্ট গড়ে উঠেছে, কিন্তু কয়েক লাখ টাকা খরচ করে সমুদ্রের পানিতে জাল দিয়ে নিরাপদ বেষ্টনী বা ‘সি-নেটিং’ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে কেউ আগ্রহী নয়। সৈকতের ছাতা-চেয়ার, বিচ বাইক, ঘোড়া ইত্যাদি থেকে বিচ ম্যানেজমেন্ট কমিটি প্রতিবছর মোটা অঙ্কের টাকা আয় করলেও পর্যটকদের নিরাপত্তায় তা ব্যয় হয় না।”

কক্সবাজার কলাতলী হোটেল রিসোর্ট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মুকিম খান বলেন, হোটেলে পর্যটকদের নিরাপত্তা ঝুঁকি সম্পর্কে অবহিত করা হলেও অনেকে নির্দেশনা না মেনে ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে গোসলে নামেন, যা হোটেল মালিকদেরও বিব্রত করে।

জেলা প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা জানান, এক যুগ আগে লাবণী পয়েন্টে জাল দিয়ে নিরাপদ গোসলের ব্যবস্থা করা হয়েছিল, কিন্তু ঢেউয়ের ধাক্কায় তা কয়েক মাসেই বিলীন হয়ে যায়। সম্প্রতি ভাঙন তীব্র হওয়ায় কোথায় নতুন করে নিরাপদ ব্যবস্থা গড়ে তোলা যায়, তা নিয়ে গবেষণা প্রয়োজন বলে তিনি মন্তব্য করেন।