সোমবার, ১৯ জানুয়ারি ২০২৬

সর্বশেষ

সৌদি আরবের ‘যত্নকেন্দ্র’: সংস্কারের প্রচারণার আড়ালে নারীর জন্য ‘নরক’

নিজস্ব প্রতিবেদক

কালো বোরকায় আপাদমস্তক ঢাকা এক নারী একটি বহুতল ভবনের দোতলার জানালার কার্নিশে বিপজ্জনকভাবে দাঁড়িয়ে আছেন। তার চোখেমুখে হয়তো মুক্তির হতাশা অথবা মৃত্যুর সংকল্প। দ্বিতীয় আরেকটি ছবিতে দেখা যায়, একটি বিশাল ক্রেনের সাহায্যে একদল পুরুষ ওই নারীকে নিচে নামিয়ে আনছেন, যেন তিনি কোনো বস্তু, কোনো মানুষ নন। সম্প্রতি সৌদি আরবে তোলা এই দুটি ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আলোড়ন তুলেছে এবং দেশটির নারীদের অধিকারের করুণ বাস্তবতা এবং সংস্কারের প্রচারণার আড়ালের অন্ধকার দিকটি আবারও বিশ্বের সামনে উন্মোচিত করেছে।

ওই নারীর পরিচয় জানা যায়নি, তবে তিনি খুব সম্ভবত সৌদি আরবের কুখ্যাত গোপন ‘কারাগার’-এ বন্দী থাকা শত শত বা হাজারো নারীর একজন। সরকারিভাবে এই কেন্দ্রগুলোকে ‘দার আল–রেয়া’ বা ‘পরিচর্যাকেন্দ্র’ বলা হয়। কর্মকর্তারা বলেন, যেসব নারী পরিবার বা স্বামীর ‘অবাধ্য’ হন, বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কে জড়ান, বাড়ি থেকে পালানোর চেষ্টা করেন বা পুরুষ অভিভাবকের শাসন মানতে চান না, তাদের এখানে এনে ‘পুনর্বাসিত’ করে পরে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু ছয় মাসের বেশি সময় ধরে দ্য গার্ডিয়ানের অনুসন্ধানে সাবেক বন্দী, অধিকারকর্মী এবং সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে যে চিত্র উঠে এসেছে, তা সরকারি বর্ণনার সম্পূর্ণ বিপরীত। এটি কোনো পরিচর্যাকেন্দ্র নয়, এটি নারীদের শাস্তি দেওয়া এবং তাদের ইচ্ছাকে ভেঙে ফেলার জন্য রাষ্ট্রযন্ত্রের এক কার্যকর হাতিয়ার।

‘যত্নকেন্দ্রের’ ভেতরের ভয়াবহ বাস্তবতা

সৌদি আরবে বড় হওয়া প্রতিটি মেয়েই ‘দার আল–রেয়া’র নাম শুনে ভয় পায়। নির্বাসনে থাকা ৩৮ বছর বয়সী অধিকারকর্মী সারাহ আল-ইয়াহিয়া বলেন, “এটি যেন এক নরক। আমার বয়স যখন ১৩ বছর, তখন আমার বাবা আমাকে যৌন নিপীড়ন করতেন। আমি তার কথা না মানলেই তিনি আমাকে দার আল-রেয়ায় পাঠিয়ে দেওয়ার হুমকি দিতেন।” এই কেন্দ্রগুলো এতটাই ভয়াবহ যে, ‘অবাধ্য’ মেয়েদের সামনে দুটি পথ খোলা থাকে—হয় বাড়িতে নিপীড়ন সহ্য করা, অথবা এই রাষ্ট্রীয় কারাগারে যাওয়া।

কেন্দ্রগুলোর ভেতরের পরিস্থিতি এতটাই অমানবিক যে, বেশ কয়েকজন নারী সেখানে আত্মহত্যা করেছেন বা আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক তরুণী জানান, যখন তিনি জানতে পারেন তাকে সেখানে পাঠানো হবে, তখন তিনি নিজের জীবন শেষ করে দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। তিনি বলেন, “আমি জানতাম সেখানে নারীদের সঙ্গে কী ঘটে। আমার মনে হয়েছিল, আমি এটা সহ্য করতে পারব না।”

সাবেক বন্দীদের ভাষ্যমতে, কেন্দ্রে প্রবেশের সময়ই তাদের নগ্ন করে তল্লাশি এবং অপমানজনক ‘কৌমার্য পরীক্ষার’ মুখে পড়তে হয়। তাদের বাইরের জগতের সঙ্গে সমস্ত যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়। পরিবারের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ থাকলেও তা থাকে কঠোর নজরদারিতে। কেন্দ্রের নিবাসীদের পরস্পরকে নাম ধরে ডাকার অনুমতি নেই, তাদের ডাকা হয় নম্বর দিয়ে। সারাহ আল-ইয়াহিয়া বলেন, “তারা পরস্পরকে ডাকে, ‘নম্বর ৩৫, এখানে আসো’। এটি পরিচর্যাকেন্দ্র নয়, এটি কারাগার।”

বন্দীদের নিয়মিত মারধর করা হয় এবং জোর করে নৈতিক ও ধর্মীয় আচরণগত শিক্ষা দেওয়া হয়। সামান্য ত্রুটিবিচ্যুতিতেও নেমে আসে কঠোর শাস্তি। এক সাবেক বন্দী সারাহকে জানিয়েছেন, একটি কেন্দ্রে একবার একটি মেয়ে তার পারিবারিক নাম প্রকাশ করায় তাকে শাস্তি হিসেবে বেত্রাঘাত করা হয়। ধর্মীয় অনুশাসন, যেমন—সময়মতো নামাজ না পড়লেও নেমে আসে একই শাস্তি। আর যদি অন্য আরেকটি মেয়ের সঙ্গে কাউকে একা পাওয়া যায়, তখনো তাদের ‘সমকামী’ আখ্যা দিয়ে বেত্রাঘাত করা হয়। এই বেত্রাঘাতের সময় কেন্দ্রের নারী নিরাপত্তাকর্মীরা (পাহারাদার) তা পর্যবেক্ষণ করেন। বন্দীদের শান্ত রাখতে বা ঘুম পাড়িয়ে রাখতে নিয়মিত বিভিন্ন ধরনের ওষুধ দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।

মুক্তির পথ: বিয়ে অথবা মৃত্যু

এই কেন্দ্রগুলো থেকে বের হওয়ার পথ প্রায় রুদ্ধ। লন্ডনভিত্তিক অধিকারকর্মী মরিয়ম আলদোসারি বলেন, “একজন তরুণী বা নারী যত দিন পর্যন্ত কর্তৃপক্ষের চাপিয়ে দেওয়া নিয়মকানুন মেনে চলার কথা স্বীকার না করবেন এবং অনুগত থাকার প্রতিশ্রুতি না দেবেন, তত দিন তাকে সেখানেই থাকতে হবে।”

কেন্দ্র থেকে বের হওয়ার একমাত্র উপায় তিনটি—একজন পুরুষ অভিভাবকের (বাবা, ভাই বা স্বামী) লিখিত অনুমতি, বিয়ে করা, অথবা ভবনের জানালা থেকে লাফিয়ে পড়া। অনেক সময় বয়স্ক পুরুষ বা অপরাধী হিসেবে সাজা ভোগ করা ব্যক্তিরা, যাদের সহজে কেউ বিয়ে করতে চায় না, তারা এসব কেন্দ্রে এসে নিজেদের জন্য পাত্রী খোঁজেন। কিছু মেয়ে এই ‘নরক’ থেকে মুক্তির একমাত্র পথ হিসেবে তাদের বিয়ে করতে রাজিও হয়ে যান।

সংস্কারের মুখোশের আড়ালে দমন-পীড়ন

এই ভয়াবহ বাস্তবতা এমন এক সময়ে ঘটছে, যখন সৌদি আরব ২০৩৪ সালের পুরুষদের বিশ্বকাপ ফুটবলের আয়োজক দেশ হিসেবে নিজেদের একটি আধুনিক, সহনশীল ও সংস্কারমুখী রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বের সামনে তুলে ধরতে চাইছে। ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানের নেতৃত্বে নারীদের গাড়ি চালানো, কনসার্টের আয়োজন এবং পর্যটনে উদারীকরণের মতো পদক্ষেপগুলো বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত হয়েছে।

কিন্তু অধিকারকর্মীরা বলছেন, এই সংস্কার মূলত একটি লোকদেখানো প্রদর্শনী। এর আড়ালে নারীদের অধিকার নিয়ে কথা বলার কণ্ঠস্বরকে কঠোরভাবে দমন করা হচ্ছে। কোনো নারী প্রকাশ্যে আরও অধিকার ও স্বাধীনতার দাবি তুললে তাকে গৃহবন্দী, কারাবন্দী বা নির্বাসনের মুখে পড়তে হচ্ছে। সৌদি আরবে এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে, যেখানে নির্যাতনের শিকার কোনো নারীকে সহায়তা করাটাও অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়। সারাহ বলেন, “আমি একজন নারীকে চিনি, তিনি সহিংসতার শিকার আরেক নারীকে সহায়তা করেছিলেন। আর সে কারণেই তার ছয় মাসের কারাদণ্ড হয়।”

মানবাধিকার গোষ্ঠী ‘এএলকিউএসটি’ বলেছে, “সৌদি আরবে লিঙ্গভিত্তিক নিয়ম চাপিয়ে দিতে দার আল-রেয়া রাষ্ট্রযন্ত্রের একটি কুখ্যাত হাতিয়ার, যা সরকারের নারীর ক্ষমতায়ন নিয়ে দেওয়া বর্ণনার সঙ্গে পুরোপুরি বিরোধপূর্ণ।”

সরকারি অস্বীকার এবং বাস্তবতা

এইসব অভিযোগের বিষয়ে সৌদি সরকারের একজন মুখপাত্র দ্য গার্ডিয়ানকে বলেছেন, দেশের বিভিন্ন স্থানে থাকা বিশেষায়িত পরিচর্যাকেন্দ্রগুলো পারিবারিক সহিংসতার শিকার নারী ও শিশুদের মতো দুর্বল জনগোষ্ঠীকে সহায়তা করে। তিনি জোরপূর্বক বন্দী রাখা, নির্যাতন বা কোনো কাজে বাধ্য করার অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “এগুলো কারাগার নয় এবং কোনো ধরনের নির্যাতনের অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া হয় এবং গভীরভাবে তদন্ত করা হয়।”

মুখপাত্র আরও দাবি করেন, “নারীরা যেকোনো সময় এখান থেকে বের হতে পারেন—স্কুল, কর্মক্ষেত্র বা ব্যক্তিগত যেকোনো কাজেও যেতে পারেন। পরিবার বা অভিভাবকের অনুমোদন ছাড়াই যেকোনো সময় স্থায়ীভাবে সেখান থেকে বেরিয়ে যাওয়ারও অধিকার তাদের রয়েছে।”

এই বক্তব্য কেন্দ্র থেকে পালিয়ে আসা নারীদের অভিজ্ঞতার সঙ্গে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক। তারা বলছেন, এই কেন্দ্রগুলো থেকে মুক্তি পাওয়া প্রায় অসম্ভব। বছরের পর বছর ধরে তারা পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকেন। তাদের শুভাকাঙ্ক্ষী বলতে কেউ থাকে না।

মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলোর মতে, সৌদি সরকার যদি সত্যিই নারীর অধিকারকে গুরুত্ব দিত, তবে তারা এসব ‘শাস্তিকেন্দ্র’ সংস্কার করত এবং নির্যাতনের শিকার নারীদের জন্য যথাযথ ও নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র গড়ে তুলত। কিন্তু তার বদলে, তারা বিশ্বকাপ ফুটবলের মতো বৃহৎ আয়োজনের মাধ্যমে নিজেদের অন্ধকার দিকটি ঢাকার চেষ্টা করছে। জানালার কার্নিশে দাঁড়িয়ে থাকা ওই নারীর ছবিটি হয়তো একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা, কিন্তু এটি সৌদি আরবের হাজারো নারীর নীরব কান্না ও মুক্তির আকুতির এক শক্তিশালী প্রতীক, যা সংস্কারের ঝলমলে আলোর আড়ালে ঢাকা পড়ে আছে।

পাঠকপ্রিয়