কোনো বিজ্ঞপ্তি নেই, নেই কোনো লিখিত বা মৌখিক পরীক্ষা। শুধু একটি শ্রমিক পদের নিয়োগপত্র হাতে নিয়েই চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনে (চসিক) রাতারাতি বনে গেছেন উপসহকারী প্রকৌশলী, কর আদায়কারী কিংবা সড়ক তদারককারী। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ দুই বছরে সাবেক মেয়র মো. রেজাউল করিম চৌধুরীর সময়ে নিয়োগ ও পদোন্নতির নামে হওয়া এই ভয়াবহ অনিয়মের চিত্র উঠে এসেছে চসিকের অভ্যন্তরীণ অনুসন্ধানে।
চসিকের একটি তালিকা অনুযায়ী, শেষ দুই বছরে নিয়োগ পাওয়া ১৮৮ জনের মধ্যে অন্তত ৬৪ জনকে শ্রমিক হিসেবে নিয়োগ দিয়ে বিজ্ঞপ্তি ও পরীক্ষা ছাড়াই উচ্চতর গ্রেডের বিভিন্ন পদে পদায়ন করা হয়েছে। ২০তম গ্রেডের শ্রমিক পদে যোগ দিয়েই অনেকে ১০ম গ্রেডের উপসহকারী প্রকৌশলী বা ১৬তম গ্রেডের কর আদায়কারী হয়ে গেছেন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, তৎকালীন মেয়র, কাউন্সিলর এবং প্রভাবশালী নেতাদের সুপারিশেই মূলত এই ‘ব্যাক ডোর’ নিয়োগ সম্পন্ন হয়েছে।
যোগদানের দিনেই ‘প্রকৌশলী’
এই নজিরবিহীন অনিয়মের একটি উদাহরণ হলেন মো. রোকনুজ্জামান। তিনি ২০২৩ সালের ১৮ জুন চসিকে শ্রমিক পদে যোগদান করেন। আশ্চর্যজনকভাবে, যোগদানের দিনেই তাকে সাগরিকা টেস্টিং ল্যাবের ল্যাব ইনচার্জ (উপসহকারী প্রকৌশলী) হিসেবে পদায়ন করা হয়। একইভাবে, রশিদ আহমেদ নামে আরেকজন শ্রমিক পদে যোগদানের মাত্র ১৯ দিনের মাথায় বিদ্যুৎ শাখায় উপসহকারী প্রকৌশলী হয়ে যান। এইচএসসি পাস করা জাহেদুল আহসান শ্রমিক পদে নিয়োগ পাওয়ার ১৭ দিন পর এবং এস এম রাফিউল হক মনিরী মাত্র ১৪ দিনের মাথায় উপসহকারী প্রকৌশলী পদে পদায়ন পান।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে রশিদ আহমেদ কোনো লিখিত বা মৌখিক পরীক্ষা ছাড়াই নিয়োগ পাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেন। আর রাফিউল হক মনিরী বলেন, কর্তৃপক্ষ যেভাবে নিয়োগ দিয়েছেন, সেভাবেই তিনি চাকরি করছেন।
অথচ চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন কর্মচারী বিধিমালা-২০১৯ অনুযায়ী, উপসহকারী প্রকৌশলী পদের ৮০ শতাংশ সরাসরি নিয়োগ এবং ২০ শতাংশ পদোন্নতির মাধ্যমে পূরণ করার কথা। পদোন্নতির জন্য সংশ্লিষ্ট পদে ন্যূনতম ১২ বছরের চাকরির অভিজ্ঞতা প্রয়োজন। কিন্তু এক্ষেত্রে কোনো নিয়মই মানা হয়নি।
আগ্রহের কেন্দ্রে রাজস্ব বিভাগ
চসিক কর্মকর্তাদের মতে, কর আদায়কারীসহ রাজস্ব সার্কেলের কিছু পদে কর্মরত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সবসময়ই ‘ঘুষ’ ও ‘অনিয়মের’ অভিযোগ থাকে। এসব পদে ‘বিশেষ সুযোগ’ থাকায় এখানে আসতে অনেকেই আগ্রহী থাকেন। শ্রমিক হিসেবে নিয়োগ পাওয়াদের মধ্যে অন্তত ২১ জন কর আদায়কারী এবং ৫ জন অনুমতিপত্র পরিদর্শক হয়েছেন, যারা এখন রাজস্ব সার্কেলে কর্মরত। এছাড়া প্রকৌশল বিভাগে সড়ক তদারককারী হয়েছেন ১৫ জন এবং আরও অনেকে বিভিন্ন দাপ্তরিক পদে আসীন হয়েছেন।
বর্তমান মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, “নিয়োগ-পদোন্নতির ক্ষেত্রে কোনো নিয়মই মানা হয়নি। অনেকে চাকরি নিয়ে কর্মক্ষেত্রে অনুপস্থিত থাকছেন। আমরা এখন সবকিছু নিয়মের মধ্যে আনার চেষ্টা করছি এবং অনুমতি ছাড়া অনুপস্থিত থাকলে চাকরিচ্যুতির মতো কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।”
চসিক সচিব মোহাম্মদ আশরাফুল আমিন জানান, “পুরোনো অনেক কাগজপত্রেরই হদিস মিলছে না। যেগুলো পাওয়া গেছে, তাতে বিধি ভঙ্গ করে পদায়ন করার প্রমাণ মিলেছে। এসব বিষয় এখন তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।”
সরকারি নিয়োগপ্রক্রিয়ার বিশেষজ্ঞ ও সাবেক অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ ফিরোজ মিয়া এই ঘটনাকে ‘মারাত্মক অনিয়ম’ ও ‘স্বজনপ্রীতি’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, “সিটি করপোরেশন পরিচালিত হয় জনগণের অর্থে। সেখানে নিয়োগে স্বচ্ছতা না থাকলে সাধারণ মানুষের চাকরির সুযোগ নষ্ট হয় এবং প্রতিষ্ঠানের প্রতি জনআস্থা কমে যায়।”
চসিকের অনুমোদিত পদসংখ্যা ৪ হাজার ২২৬ হলেও বর্তমানে সেখানে কর্মরত আছেন ৯ হাজার ২৮৯ জন, যা প্রতিষ্ঠানটির ওপর একটি বিশাল আর্থিক চাপ তৈরি করেছে। এই নজিরবিহীন নিয়োগ দুর্নীতির ফলে একদিকে যেমন যোগ্য প্রার্থীরা বঞ্চিত হয়েছেন, তেমনি প্রতিষ্ঠান হিসেবে চসিকের সেবার মান নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।